ইরানে বিক্ষোভ
ইরানে বিক্ষোভ

মতামত

ইরানে আন্দোলন নিয়ে বামপন্থীরা নীরব কেন

অনেকে আশঙ্কা করছেন, ইরানে চলমান আন্দোলন খুবই খারাপ পরিণতির দিকে যেতে পারে। নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর সিদ্ধান্তে কয়েক হাজার মানুষ পর্যন্ত নিহত হতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ক্ষমতা অসুস্থ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হাত থেকে বিপ্লবী গার্ডের হাতে চলে যেতে পারে।

এতে হয়তো নারীদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল হবে, কিন্তু জনগণের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে। এমনকি গণতন্ত্রে রূপান্তর ঘটলেও তার ফল দীর্ঘস্থায়ী না–ও হতে পারে। মিসর থেকে তিউনিসিয়া পর্যন্ত ব্যর্থ গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতাগুলো তেমনই বলে।

তবু যাঁরা স্বাধীনতা, সাম্য ও নারীর মৌলিক অধিকারে বিশ্বাস করেন, তাঁদের সহানুভূতি থাকা উচিত ইরানের কোটি কোটি সাহসী মানুষের প্রতি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে এই ঐতিহাসিক আন্দোলন নিয়ে একধরনের নীরবতা দেখা গেছে। এই নীরবতা স্পষ্ট ছিল মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে।

ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন থেকে ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠানই এ মুহূর্তের গুরুত্ব বুঝতে অস্বাভাবিক রকম ঢিলেমি করেছে। আরও খারাপ বিষয় হলো, যখন তারা ঘটনাগুলো কাভার করেছে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবাদের গুরুত্ব খাটো করে দেখিয়েছে। কিছু ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে এমন মনোভাবও দেখা গেছে, যেন তারা দেশের নির্মম শাসনব্যবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল।

প্রতিবাদের শুরুর দিকেই দ্য গার্ডিয়ান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির একটি মতামতধর্মী লেখা প্রকাশ করেছিল। বিশ্বের বামপন্থী সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলোতে এই নীরবতা আরও বেশি চোখে পড়েছে। শনিবার সকালে আমি যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী ধারার প্রধান প্রকাশনাগুলোতে ইরান বিষয়ে কিছু উল্লেখ আছে কি না, খুঁজে দেখেছি। দ্য নেশন, দ্য নিউ রিপাবলিক, জ্যাকোবিন, স্লেট, এমনকি ডিসেন্টের ওয়েবসাইটেও কিছুই ছিল না।

গত এক সপ্তাহে এমন কিছু উদ্ভট বামপন্থীকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল না, যারা ইরানের প্রতিবাদকারীদের সাম্রাজ্যবাদের অসহায় হাতিয়ার বলে আখ্যা দেয়। এদের কেউ কেউ আবার নিকোলা মাদুরো যে স্বৈরশাসক, সেটা স্বীকার করতে চায় না। তারা খামেনি বা মাদুরোর প্রশংসা না করলেও তাদের শাসনব্যবস্থার পতনও চায় না।

অন্য অনেক বিষয় কেন বেশি মনোযোগ পাচ্ছে, তার কিছু সরল ব্যাখ্যা আছে। ভেনেজুয়েলায় কী ঘটছে, মিনেসোটায় কী হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে হোয়াইট হাউস থেকে প্রতিদিন যে নানা ধরনের অগ্রহণযোগ্য ঘটনা ঘটছে, সেগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের মনোযোগ দেওয়া যুক্তিসংগত। পাশাপাশি এমন একটি দেশ নিয়ে প্রতিবেদন করা সত্যিই কঠিন, যেখানে বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয় এবং যেখানে সারা দেশেই এখন ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি এত কঠিন ছিল কোনো স্টাফ লেখক দিয়ে ইরানে কী ঘটছে তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখা? কিংবা প্রবাসে থাকা কোনো ইরানির কাছ থেকে তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মতামতধর্মী লেখা সংগ্রহ করা?

এই নীরবতা মোটেও কাকতালীয় নয়। এটি একটি সচেতন বা অচেতন সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি না এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সচেতনভাবে নেওয়া হয়েছে। তবু এর শিকড় গিয়ে মেলে একেবারে সহজ একটি হিসাবের কাছে, যা জর্জ অরওয়েলের সময় থেকেই বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পিছু ছাড়েনি।

অনেকসংখ্যক প্রগতিশীল ও বামপন্থীর কাছে তাদের মূল অঙ্গীকার কোনো নীতি বা পৃথিবীকে বদলানোর স্বপ্ন নয়, বরং তাদের বিশ্বাস হলো, নিজেদের দেশ ও সমাজই গভীর অকল্যাণের মূল উৎস। এতে তাদের মনে একধরনের সহজ শত্রু-মিত্রের ধারণা তৈরি হয়। অরওয়েল তাঁর সময়ের কিছু বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে যেমন বলেছিলেন, ‘তাদের প্রকৃত কিন্তু অস্বীকৃত প্রেরণা ছিল পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা ও স্বৈরতন্ত্রের প্রতি মোহ।’

গত এক সপ্তাহে এমন কিছু উদ্ভট বামপন্থীকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল না, যারা ইরানের প্রতিবাদকারীদের সাম্রাজ্যবাদের অসহায় হাতিয়ার বলে আখ্যা দেয়। এদের কেউ কেউ আবার নিকোলা মাদুরো যে স্বৈরশাসক, সেটা স্বীকার করতে চায় না। তারা খামেনি বা মাদুরোর প্রশংসা না করলেও তাদের শাসনব্যবস্থার পতনও চায় না।

আমি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়ার পর থেকেই নিজেকে বামপন্থী মনে করি। ১৩ বছর বয়সে আমি জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দিয়েছিলাম। তখন যেসব আদর্শে বিশ্বাস করতাম, আজও তার অনেকগুলোতেই বিশ্বাস করি।

আন্তর্জাতিক সংহতিতে বিশ্বাস করি, উদার কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করি, বর্ণবিদ্বেষ, জাতিগত নিধন ও যুদ্ধকে সর্বোচ্চ অশুভ বলে মনে করি। আমি আবারও এমন একটি গণ-আন্দোলনের অংশ হতে চাই, যা নীতিনিষ্ঠভাবে এই মূল্যবোধগুলোর পক্ষে দাঁড়ায়। কিন্তু যে বামপন্থা তেহরান ও ইরানের অন্যান্য শহরের রাস্তায় নামা সাহসী নারী ও পুরুষদের প্রতি সমর্থন জানাতে অক্ষম, তার সঙ্গে আমার মিল খুবই কম।

  • ইয়াশা মাউঙ্ক ইংরেজি সাময়িকী পারসুয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
    পারসুয়েশন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তারে অনূদিত