অতীতে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য এমন সুযোগ খুব কমই এসেছে।
অতীতে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য এমন সুযোগ খুব কমই এসেছে।

ইলিরা দেওয়ানের কলাম

রেইনবো নেশনের সত্তায় আদিবাসীদের রাঙিয়ে তোলা হোক

গত শতকের শেষ দিকে ‘রেইনবো নেশন’-এর ধারণাটি নেলসন ম্যান্ডেলার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বেশ পরিচিতি লাভ করেছিল। আমরা জানি, নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের অধিকাংশ সময় কতটা নিপীড়ন আর বর্ণবৈষম্যের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। সেই বৈষম্য ও অবিচারের অভিজ্ঞতা থেকে ম্যান্ডেলা এ উপলব্ধি করেছিলেন, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, সমতা ও সহাবস্থানের অপরিহার্যতা কতটুকু জরুরি। কেননা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতাই হলো একটি রাষ্ট্রের সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার একটি রূপরেখা দেশের জনগণের সামনে তুলে ধরেছিল। রূপরেখাটি আকারে ছোট হলেও এর দফাগুলোর মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে একটি মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন।

একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য যেসব মৌলিক প্রশ্ন ও সংস্কার জরুরি, তার অনেকগুলোই এ রূপরেখায় দেখা যায়। তবে এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি তাদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দেয়। এ প্রশ্নের জবাব সময়ই বলে দেবে।

বিএনপির রূপরেখার দ্বিতীয় দফাতে রেইনবো নেশন বা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরা হয়েছে, যেটি দীর্ঘদিন ধরে এ শের মানুষ প্রত্যাশা করে আসছিল। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা জাতিগত পরিচয়ের ভিন্নতা—কোনো নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদার অন্তরায় হবে না এমন দেশই চেয়েছিলাম আমরা। পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহাবস্থানের ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেটি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরে দেশ যে এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন হয়ে উঠতে পারেনি তার উদাহরণও আমাদের সামনে যথেষ্ট রয়েছে।

ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের জীবনধারা নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই তাদের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও জীবনচর্চা, প্রকৃতি সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শত শত বছরের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা আদিবাসীদের লোকায়ত এ জ্ঞান বর্তমান সময়ের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

তবু আমরা আশা জিইয়ে রাখতে চাই। বর্তমান সরকারপ্রধান তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনের কথা বলছেন। সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী প্রতিনিধিদের একটি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, উদ্বেগ ও দাবি সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। নতুন সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সরকারপ্রধানের সঙ্গে এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

অতীতে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য এমন সুযোগ খুব কমই এসেছে। তাই এ উদ্যোগকে সরকার ও আদিবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ সংলাপ ও সরকারের অঙ্গীকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনায় উত্থাপিত বিষয়গুলো কতটা কার্যকরভাবে নীতি ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়, তার ওপর।

একটি দেশকে সত্যিকার অর্থে রংধনুর রঙে রাঙাতে হলে উন্নয়নের মূলধারায় দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সমান ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কোনো জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কখনোই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রতিটি জাতিসত্তার রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, প্রথাগত ব্যবস্থা ও বিশ্বাস, যা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐশ্বর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এ বহুত্ববাদই বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি এবং জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিও।

এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্যে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ধাত্রীবিদ্যার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ধাত্রীবিদ্যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহুকাল ধরে লালিত একটি প্রাচীন পেশাগত দক্ষতা। বংশপরম্পরায় অর্জিত এ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিরাপদ প্রসব সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

বর্তমান সময়ে প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলেই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অথচ অতীতে আদিবাসী ধাত্রীরা কোনো আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বা প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়াই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা অসংখ্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন করতেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ, আধুনিক ও উন্নত যন্ত্রপাতি ছাড়াই কুপিবাতির ক্ষীণ আলোয় শুধু তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আন্তরিক সেবার মাধ্যমে মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষা করার নজির সত্যিই বিস্ময়কর।

ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের জীবনধারা নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই তাদের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও জীবনচর্চা, প্রকৃতি সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শত শত বছরের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা আদিবাসীদের লোকায়ত এ জ্ঞান বর্তমান সময়ের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

তাই আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ধাত্রীবিদ্যাসহ অন্যান্য জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা যেমন  জরুরি, তেমনি গবেষণার মাধ্যমে সেসব জ্ঞানকে আরও কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়, সে বিষয়েও সরকারের দৃষ্টি দেওয়া দরকার। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত এ ধাত্রীবিদ্যা সমন্বয় করা গেলে পাহাড়সহ সমতলের প্রত্যন্ত এলাকা যেমন হাওর, চা-বাগান এসব অঞ্চলের মাতৃস্বাস্থ্য ও সেবা সুরক্ষা করা অনেকখানি সহজ হবে।

একই সঙ্গে আদিবাসীদের পরিবেশবিষয়ক লোকায়ত জ্ঞানগুলো সংরক্ষণ করলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও টেকসই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে বলে অনেকে মনে করেন। একই সঙ্গে আদিবাসীদের সমৃদ্ধ এ জ্ঞান ও ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

  • ইলিরা দেওয়ান লেখক ও মানবাধিকারকর্মী
    মতামত লেখকের নিজস্ব