চার বছরের ডিপ্লোমা শেষ করে একজন তরুণ কারখানায় চাকরি নিতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, যে যন্ত্রে তাঁকে কাজ করতে হবে, সেটি তিনি প্রতিষ্ঠানে কখনো চোখেই দেখেননি। চাকরিদাতা বললেন, আগে তিন থেকে ছয় মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে আসুন। ঢাকায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি কারিগরি চাকরি মেলায় শিক্ষার্থী ও নিয়োগকর্তাদের মুখে এমন অভিজ্ঞতার কথাই উঠে এসেছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়, আমাদের কারিগরি শিক্ষার সামগ্রিক চিত্রেরই প্রতিফলন।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। সরকারও তা জানে। বাজেটে দক্ষতা যাচাইয়ের স্মার্ট স্কিল ব্যাংক, হাজারো প্রশিক্ষক নিয়োগ আর শত শত নতুন কারিগরি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ঘোষণা এসেছে। কিন্তু ঘোষণা আর ভবন দিয়ে দক্ষতা তৈরি হয় না। প্রশ্ন হলো, আমাদের কারিগরি শিক্ষা কোথায় আটকে আছে?
সংকট কোথায়
প্রথম সংকট শ্রেণিকক্ষ ও কর্মশালায়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক ও অধ্যক্ষের প্রায় অর্ধেক পদ শূন্য; শিক্ষামন্ত্রীও শিক্ষকসংকটের কথা স্বীকার করেছেন। যন্ত্রপাতির বড় অংশ পুরোনো প্রযুক্তির, অথচ শিল্পকারখানা এগিয়ে গেছে সিএনসির মতো আধুনিক যন্ত্রে। সমস্যা শুধু সংখ্যায় নয়, সক্ষমতায়ও। অনেক প্রশিক্ষকের তাত্ত্বিক জ্ঞান আছে, কিন্তু কারখানায় হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতা সীমিত। যিনি নিজে যন্ত্র চালাতে দক্ষ নন, তিনি শিক্ষার্থীকে দক্ষ করবেন কীভাবে?
দ্বিতীয় সংকট মূল্যায়নের। দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণে মূল্যায়নকারী বা অ্যাসেসরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অধিকাংশ অ্যাসেসর কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত প্রশিক্ষক। বিভিন্ন প্রকল্পে মূল্যায়নের চাহিদা বাড়ায় তাঁরা ঘন ঘন অন্য প্রতিষ্ঠানে যান, আর নিজ প্রতিষ্ঠানের ক্লাস ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ব্যাহত হয়। মাত্র এক মাসের কোর্সে অ্যাসেসর সনদ পাওয়ার সুযোগও মূল্যায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তৃতীয় সংকট ডিপ্লোমাধারীদের মর্যাদা ও সুযোগের। এসএসসির পর চার বছরের ডিপ্লোমা শেষ করেও উচ্চশিক্ষায় গেলে তাঁদের কার্যত এইচএসসি পাসের মতোই গণ্য করা হয়; ডিপ্লোমায় পড়া বিষয়গুলোর যথাযথ ক্রেডিট ছাড় মেলে না, ফলে একই বিষয় আবার পড়তে হয়। চাকরির বাজারেও পদমর্যাদা ও বেতন তাঁদের চার বছরের প্রশিক্ষণের তুলনায় কম। যে পথে এগোনোর সুযোগ সীমিত, সে পথে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আসবেন কেন? কারিগরি শিক্ষা যে এখনো অনেক পরিবারের কাছে ‘শেষ বিকল্প’, তার একটি বড় কারণ এখানেই।
চতুর্থ সংকট সমন্বয়ের। দক্ষতা খাতে দুই ডজনের মতো মন্ত্রণালয় ও সংস্থা যুক্ত। সমন্বয়ের জন্য জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) গঠিত হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে এর এখতিয়ারের দ্বৈততা এখনো কাটেনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, সমন্বয়ের অভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ ও সনদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এনএসডিএর জনবলের বড় অংশের কারিগরি শিক্ষা বা শিল্প অভিজ্ঞতা না থাকায় সংস্থাটি চলছে অনেকটা আমলাতান্ত্রিক ধাঁচে।
পঞ্চম সংকট জবাবদিহির। কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর কত অংশ পড়ে, সে বিষয়েও ১৪, ১৬ ও ২০ শতাংশের মতো ভিন্ন ভিন্ন হিসাব মেলে। বিদেশি ঋণে একের পর এক বড় প্রকল্প হয়েছে, প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু কতজন টেকসই কাজ পেয়েছেন, তার স্বাধীন হিসাব নেই।
এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বড় দক্ষতা প্রকল্পে সরকারি মূল্যায়নে যে চাকরির হার দেখানো হয়েছিল, প্রকৃত হার সম্ভবত তার চেয়ে অনেক কম। জাল সনদ চক্র আর প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে। টানা তিন বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না করায় সম্প্রতি ৮৬টি পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
এসবের ফল দেখা যায় প্রবাসী শ্রমবাজারে। গত বছর বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আধা দক্ষ বা অদক্ষ। ফলে একই কাজ করেও আমাদের কর্মীরা প্রতিবেশী দেশের কর্মীদের তুলনায় কম আয় করেন, আর শ্রমবাজারও আটকে থাকে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে।
সম্ভাবনাও কম নয়
এত সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনার দরজা খোলা। জাপান, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে কেয়ারগিভিং, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা লাখো মানুষের দক্ষতা আছে, কিন্তু সনদ নেই। পূর্বাভিজ্ঞতার স্বীকৃতি বা আরপিএল কর্মসূচিতে সনদ পাওয়া কর্মীদের আয় বেড়েছে বলে মূল্যায়নে দেখা গেছে। অপ্রচলিত পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোরও বড় সুযোগ রয়েছে। স্মার্ট স্কিল ব্যাংক ও ডিজিটাল সনদ ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদেশি নিয়োগকর্তারা সরাসরি যাচাই করা দক্ষ কর্মী নিতে পারবেন।
তবে সময় সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের পর থেকে তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য কমতে শুরু করবে। এ সুযোগ হাতছাড়া হলে আর ফিরে আসবে না।
কী করা দরকার
প্রথমত, প্রশিক্ষকদের হাতে-কলমে দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত শিল্পকারখানায় সংযুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সেই দক্ষতাকে পদোন্নতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষক পদ ও যন্ত্রপাতির জন্য প্রকল্পের ওপর নির্ভর না করে রাজস্ব বাজেটে স্থায়ী বরাদ্দ রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মূল্যায়নকে পাঠদান থেকে আলাদা করতে হবে। পেশাদার অ্যাসেসরদের একটি জাতীয় পুল গড়ে তুলতে হবে, আর কর্মরত প্রশিক্ষকদের বাইরে মূল্যায়নে যাওয়ার সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষায় পঠিত বিষয়ের ক্রেডিট ছাড় ও সরাসরি উচ্চতর বর্ষে ভর্তির সুযোগ দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে তাঁদের দক্ষতার সঙ্গে মানানসই পদমর্যাদা ও বেতনকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, এনএসডিএকে কারিগরি ও শিল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনবল দিয়ে সাজাতে হবে। এর কর্মকর্তাদের স্বয়ংক্রিয় জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, যেমন অ্যাক্রেডিটেশন পরিদর্শনের প্রতিবেদন অনলাইনে প্রকাশ ও দৈবচয়নের ভিত্তিতে পুনর্যাচাই। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে দ্বৈততা দূর করতে সময় বেঁধে আইন সংশোধন করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রকল্পের সাফল্য মাপতে হবে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা দিয়ে নয়, কর্মসংস্থান ও আয় দিয়ে। প্রতিটি প্রকল্পের ফলাফল স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দিয়ে যাচাই করে প্রকাশ করতে হবে, আর অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
ষষ্ঠত, শিল্পকে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও প্রশিক্ষণের অংশীদার করতে হবে এবং উদীয়মান খাতে আন্তর্জাতিক মানের সনদ নিশ্চিত করতে হবে।
কারিগরি শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে তখনই, যখন সনদের পেছনে সত্যিকারের দক্ষতা থাকবে, আর সেই দক্ষতা তরুণকে দেবে ভালো চাকরি, সম্মানজনক আয় ও উচ্চশিক্ষার খোলা পথ। দেশের জন্য দরকার সনদের পাহাড় নয়, দক্ষ হাতের সারি।
এনায়েত এইচ জাকারিয়া উন্নয়নকর্মী ও জননীতি বিশ্লেষক। তিনি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। ই-মেইল: mehjakaria@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. The Business Standard, “Old tech in technical education widens gap with industry needs,” ২০ মে ২০২৬ — https://www.tbsnews.net/bangladesh/education/old-tech-technical-education-widens-gap-industry-needs-1443931
২. বাসস, “Govt to launch skill verification programme, expand migrant welfare services,” ১১ জুন ২০২৬ — https://www.bssnews.net/national-budget-2026-2027/394773
৩. বিজনেস জার্নাল, “উন্নত বাংলাদেশ গড়তে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার অপরিহার্য: শিক্ষামন্ত্রী,” ১৫ জুন ২০২৬ — https://businessjournal24.com/উন্নত-বাংলাদেশ-গড়তে-কার/
৪. দৈনিক যুগান্তর, “কারিগরি শিক্ষায় সংকট বাড়ছে,” ১৭ জুন ২০২৬ — https://www.jugantor.com/tp-city/954582
৫. দৈনিক নয়া দিগন্ত, “কারিগরি শিক্ষার ল্যাব আধুনিকায়ন ও শিক্ষক সঙ্কট সমাধান করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী,” ৩১ আগস্ট ২০২৬ — https://dailynayadiganta.com/bangladesh/education-campus/qFW4LfVTfjIS
৬. PENIT Technical Training Institute, “Trainer & Assessor - NSDA - Level 4,” ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — https://penit.edu.bd/course/trainer-assessor-nsda-level-4/
৭. ILO, Skills 21 প্রকল্পের স্বাধীন মধ্যবর্তী মূল্যায়ন — https://webapps.ilo.org/ievaldiscovery/files/file/241270
৮. বাসস, “NSDA EC directs immediate legal reform to eliminate NSDA-BTEB duality,” ২৭ এপ্রিল ২০২৬ — https://www.bssnews.net/news/382071
৯. প্রথম আলো ইংরেজি, “PM for unified training system to make youth suitable for global job market,” ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — https://en.prothomalo.com/bangladesh/n7n7bqpk7k
১০. Bangladesh Post, “Technical education: The missing link in our development strategy” (ভর্তি প্রায় ১৪%) — https://bangladeshpost.net/posts/technical-education-the-missing-link-in-our-development-strategy-171973
১১. দৈনিক ইত্তেফাক, “সংকটে কারিগরি শিক্ষা,” ৩০ নভেম্বর ২০২৪ (ভর্তি ১৬%) — https://www.ittefaq.com.bd/708996/
১২. Journal of Development Studies, “Skills Training, Corruption and Organisational Capabilities: An Analysis of Bangladesh's Garment Industry,” ২০২৫ — https://www.tandfonline.com/doi/full/10.1080/00220388.2025.2521491
১৩. Bangladesh Post, “BTEB boss removed in certificate scam,” ২২ এপ্রিল ২০২৪ — https://bangladeshpost.net/posts/bteb-boss-removed-in-certificate-scam-136045
১৪. দৈনিক ভোরের সময়, “হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বহুমাত্রিক হরিলুট,” ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — https://share.google/t5zAM5ipwQUAGbYyZ
১৫. কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নোটিশ, ৮৬টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ — https://students.bd/en/notice/bteb-notice-show-cause-86-inactive-polytechnic-institutes-2026
১৬. Daily Sun, “Bangladesh struggles to expand labour markets amid skill gap,” ৭ মার্চ ২০২৬ — https://www.daily-sun.com/bangladesh/861868/bangladesh-struggles-to-expand-labour-markets-amid-skill-gap
১৭. The Business Standard, “Half of Bangladeshi migrant workers still unskilled,” ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ — https://www.tbsnews.net/bangladesh/migration/half-bangladeshi-migrant-workers-still-unskilled-345190
১৮. World Bank IEG, ICR Review: Bangladesh Skills and Training Enhancement Project, ২০২০ (আরপিএল) — https://documents1.worldbank.org/curated/en/502521591979939514/txt/Bangladesh-BD-Skills-and-Trg-Enhancement-Project.txt
১৯. ILO, “দক্ষতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা হোক সবার জন্য,” ২২ জুন ২০২৬ — https://www.ilo.org/about/newsroom/technical-skills-should-be-everyone?lang=bn
২০. The Financial Express, “Youth unemployment in Bangladesh: What holds us back,” ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ — https://thefinancialexpress.com.bd/youth-and-entrepreneurship/youth-unemployment-in-bangladesh-what-holds-us-back