ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে (ডানে) এবং জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেন।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে (ডানে) এবং জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেন।

মতামত

ভারতে মাঠ দখলের পরীক্ষায় পাশ করবে কি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?

গত মাসে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই একটি প্রশ্ন ঘুরছে—তারা কি শুধু অনলাইন ব্যঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবে মাঠে নামবে? তারা কি নেপালের জেনজি তরুণদের মতো কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে? এই সপ্তাহে তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন, তিনজন মুখপাত্র নিয়োগ, এবং আজ যন্তর মন্তরে বড় ধরনের বিক্ষোভের পরিকল্পনা—এসবের মাধ্যমে সিজেপি আর শুধু মজা করছে না।

এখন দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরেছেন এবং তিনি ফেরার পথে তাঁর অনুসারীদের (যাঁদের তিনি ‘ককরোচ’ বলেন) মার্ভেল সিনেমার মতো ‘একত্রিত হও’ বলে আহ্বান জানিয়েছেন।

বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সম্প্রতি মাস্টার্স শেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে শুক্রবার এক্সে (টুইটার) পোস্ট করে তিনি জানান, তিনি দেশে ফিরছেন। তিনি লেখেন, ‘আমি আমার ভাগ্য সংবিধানের হাতে ছেড়ে দিলাম’, সঙ্গে হ্যাশট্যাগ দেন ‘জয় ভীম’।

সম্ভবত এটাই প্রথমবার, মহারাষ্ট্রের দলিত পটভূমি থেকে আসা দিপকে ‘জয় ভীম’ স্লোগানটি ব্যবহার করলেন। এই স্লোগানটি ড. বি আর আম্বেদকরকে সম্মান জানাতে বলা হয়ে থাকে।

এর আগে সিজেপি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের বেশি, যা সরকারি বিজেপি হ্যান্ডেলকেও ছাড়িয়ে গেছে। এক্সে তাদের প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার অনুসারী রয়েছে।

এই দলটি হয়তো শুধু ব্যঙ্গ হিসেবেই থেকে যেত। কারণ, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কিছু বেকার যুবককে ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলেছিলেন। তার প্রতিক্রিয়াতেই এই উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। তবে ব্যাপক সমর্থন ও বিরোধিতার কারণে বিষয়টি বড় আকার নেয়।

২১ মে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ৬৯এ ধারা অনুযায়ী সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়। অন্যদিকে বিরোধী নেতারা (যেমন মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ, ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং মনীশ সিসোদিয়া) দলটির পক্ষে কথা বলেন।

এখন অনেক ক্ষুব্ধ তরুণ নিজেদের ‘ককরোচ’ পরিচয়ে পরিচিত করছে। এমনকি পরিচিত ব্যক্তিরাও (যেমন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক এবং অভিনেতা প্রকাশ রাজ) এই নাম ব্যবহার করছেন।

ককরোচ জনতা পার্টির দাবি ও সমথৃকদের প্রতি সংগঠনের নির্দেশনা।

গত সপ্তাহে যখন তারা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভের ঘোষণা দেয়, তখন আন্দোলনটি বড় পদক্ষেপে রুপ নেয়। প্রশ্নফাঁসসহ বিভিন্ন পরীক্ষাসংক্রান্ত বিতর্কের কারণে এই দাবি এসেছে। এই কারণেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এই সপ্তাহের আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

শুক্রবার দিল্লি হাইকোর্ট ‘সেভ ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সংগঠনের আবেদন শুনতে অস্বীকৃতি জানায়। ওই আবেদনে সিজেপির বিক্ষোভ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।

এখন মনে হচ্ছে, অনলাইনে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সত্যিই রাস্তায় নামতে যাচ্ছে। সিজেপি তাদের সমর্থকদের জন্য বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে।

জাতীয় পতাকা ও একটি বই সঙ্গে রাখতে, পুলিশকে ফুল দিতে এবং শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে সিজেপি সমর্থকদের নির্দেশনা দিয়েছে। তারা মজার ছলে আরও বলেছে, ‘বিপ্লবের জন্য সকালের নাশতা দরকার।’

একটি উদ্দেশ্যের খোঁজে

১৯ মে দ্য প্রিন্টকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ দিপকে বলেন, সিজেপি গঠনের বিষয়টি ছিল ‘সম্পূর্ণ তাৎক্ষণিক’। তিনি বলেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতির মন্তব্যটা পড়েছিলাম; সেখানে তিনি বলেছিলেন, সবাই নাকি ককরোচ—তারপর আমি আমার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে একটি টুইট করি।’ তিনি এক্সে লিখেছিলেন, ‘এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা হলো—বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকতে হবে।’

নতুন দলে যোগ দিতে আগ্রহীদের জন্য তিনি একটি গুগল ফর্মের লিংকও যুক্ত করেন।

প্রধান বিচারপতি ১৫ মে এক আদালত শুনানিতে এই মন্তব্য করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে তিনি বলেন, গণমাধ্যম তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছে। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ছড়িয়ে গেছে। হাজার হাজার তরুণ ইতিমধ্যেই সিজেপিতে যোগ দিতে শুরু করেছে।

আন্দোলনটি গতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিপকের ব্যক্তিগত পটভূমি, রাজনৈতিক মতাদর্শ, এবং জাতপাত ও সংরক্ষণ (রিজার্ভেশন) নিয়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে।

২১ মে দিপকে এক্সে লেখেন, ‘আমি নিজেও একজন দলিত। আশা করি, এতে আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।’

এই তথ্যটি অনেকের জন্য গর্বের বিষয় ছিল। একজন দলিত নেতা এমন একটি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা জাতীয় পর্যায়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে এর পরপরই জাতপাতবিদ্বেষী মন্তব্যের ঢেউ ওঠে।

মুম্বাইয়ের লেখক-পরিচালক অনুরাধা তিওয়ারি লেখেন, ‘তাহলে এই স্বঘোষিত জেনজি নেতা মেধার বিরুদ্ধে।’ ‘স্যাসি সোল’ নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট মন্তব্য করে, ‘এই তো এসে গেল দলিত কার্ড।’

প্রায় ২০ হাজার অনুসারী থাকা ‘আইএমহাইড্রো’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট একটি ছবি পোস্ট করেছে এবং সেখানে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে দিপকে এসব অনলাইন আক্রমণের জবাব দেননি। তিনি যেন আগেই এমন প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া এবং ইনস্টাগ্রাম পেজ হ্যাক হওয়ার অভিযোগের মধ্যেও তিনি ভিডিওর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট দাবি হলো—নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং সিবিএসইসহ অন্যান্য পরীক্ষায় অনিয়মের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই বিষয়টি তাঁর সমর্থকদের মধ্যে প্রবল সাড়া ফেলে।

দিপকে বলেন, দ্য প্রিন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের সময়ও অনেক তরুণ তাঁকে বার্তা দিয়ে বলেছে, ‘পিছু হটবেন না।’

সিজেপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এই দলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ২০ হাজার সদস্য নিবন্ধিত হয়েছে। আর দিপকের দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তাদের অনলাইন পিটিশনে ৬ লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছে।

এটি কি নেপাল-স্টাইলের প্রতিবাদ হবে?

বিপুল সংখ্যক কিশোর ও বিশের কোঠার তরুণ-তরুণী সিজেপির মূল শক্তি হওয়ায়, এই আন্দোলনকে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী অঞ্চলের সাম্প্রতিক যুব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

গত বছর নেপালে এক বিশাল ছাত্র আন্দোলনের ফলে কে পি শর্মা ওলির সরকার পতন হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এক যুব-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার শাসনও ক্ষমতাচ্যুত হয়। তবে অভিজিৎ দিপকে এসব তুলনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

দিপকে এক্সে লিখেছেন, ‘ভারতের জেনজিকে এ ধরনের তুলনার মাধ্যমে অপমান বা খাটো করবেন না। তারা তাদের সাংবিধানিক অধিকার বোঝে এবং শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের প্রতিবাদ প্রকাশ করবে।’ তবে এই বক্তব্য সবাই ভালোভাবে নেননি।

সিজেপির প্রথম মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির আগের দিন, শুক্রবার দিপকে একটি ভিডিও বার্তায় জানান, দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে আসার যে বিশাল সাড়া পাওয়া গেছে, তা ‘আমাদের কল্পনারও বাইরে’। তিনি সমর্থকদের বিমানবন্দরে না আসার অনুরোধ করেন।

একজন মন্তব্যকারী লিখেছেন, ‘নেপালের জেনজি আন্দোলনকে খাটো করে দেখবেন না।’ আরেকজন এক্স ব্যবহারকারী দীর্ঘ পোস্টে লেখেন, ‘নেপালে জেনজি আন্দোলনের সময় ৭৭ জন তরুণ নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। তাঁরা মানুষ ছিলেন, ছাত্র ছিলেন, নাগরিক ছিলেন, প্রতিবাদকারী ছিলেন। তাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন, কারণ তাঁরা বোকা ছিলেন না।’

সিজেপির প্রথম মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির আগের দিন, শুক্রবার দিপকে একটি ভিডিও বার্তায় জানান, দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে আসার যে বিশাল সাড়া পাওয়া গেছে, তা ‘আমাদের কল্পনারও বাইরে’। তিনি সমর্থকদের বিমানবন্দরে না আসার অনুরোধ করেন।

এর পরিবর্তে তিনি জানান, তিনি সরাসরি পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যাবেন এবং যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতির জন্য আবেদন করবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক এবং আমাদের দায়িত্বশীলভাবে আচরণ করতে হবে। তাই দয়া করে এমন কিছু করবেন না যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।’

এদিকে দিপকের ভাইরাল ‘জয় ভীম’ পোস্ট ইতিমধ্যে ৭,০০০-এর বেশি মন্তব্য পেয়েছে। সেখানে অনেকেই তাঁকে ‘নায়ক’ বলছেন, আবার অনেকে তাঁর গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা সময়ই বলে দেবে।

মনীষা মণ্ডল দ্য প্রিন্ট-এর সিনিয়র মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক।
দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া।
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ