
নিউইয়র্ক শহরটা আমার বরাবরই খুব প্রিয়। ওখানে গেলেই আমি স্বভাবতই পুরোনো বুকস্টোরগুলোর দিকে চলে যাই। বার্নস অ্যান্ড নোবেলের ঝকঝকে স্টোরগুলো থেকে ওই পুরোনো তাক, ধুলা জমা বই, মানুষের হাতের আঁকিবুঁকি লেখা মার্জিন নোট আমাকে বেশি টানে। কোনো বইয়ের পাতায় কফির দাগ, কোনো কোনো পাতায় কারও জীবনের এক লাইনের আলাপ। মনে হয়, এই শহর শুধু মানুষে নয়, চিন্তায়ও ভরা। অনেক কনসার্ট দেখেছি এই শহরে, আমার পছন্দের হাজারো মুভিগুলোর সেট কিন্তু এ শহরেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, এ শহরে আমার অনেক বন্ধু থাকে।
এ শহরেরই নতুন মেয়র জোহরান মামদানি নিয়ে যখন আলাপ শুরু হলো, তখন আমি বুঝলাম, লোকটাকে হালকাভাবে দেখা যাবে না। গত ছয় মাস ধরে আমি তাঁর কথা, তাঁর পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড, তাঁর কাজগুলো খুব মন দিয়ে লক্ষ করছিলাম। কারণ একটাই—আমাদের দেশেও ঠিক এই ধরনের একটা পরিবর্তন দরকার।
আমাদের দেশের মানুষ প্রতিদিন সিস্টেমের মাধ্যমেই নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছে। আর তাই বড় বড় স্লোগান দিয়ে নয়, চটকদারি শব্দ দিয়ে নয়, একেবারে মৌলিক জিনিসে পরিবর্তন দরকার। মানুষের জীবন কতটা সাশ্রয়ী হচ্ছে, সরকারি ব্যবস্থা কতটা দক্ষ হচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
চাল, ডাল, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত—এই জিনিসগুলো যখন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাহলে উন্নয়ন শুধু বক্তৃতায় থাকে, মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে না। আমাদের দেশে এখন সেটাই হচ্ছে। মানুষের জনযাত্রার খরচ দিন দিন বাড়ছে। ট্যাক্সের চাপ বাড়ছে, কিন্তু সেই ট্যাক্সের বদলে মানুষ কী পাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুব পরিষ্কার নয়। একটা রাষ্ট্রের আসল কাজ হওয়া উচিত জনগণের সুবিধার দেখভাল করা। সিস্টেম বা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ ব্যবস্থার জন্য না, ব্যবস্থা মানুষের জন্য কাজ করবে।
আমাদের দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্টটা লুকিয়ে আছে ব্যবস্থার ভেতরে। এটা এমন এক ধরনের নিপীড়ন, যেটা একটু একটু করে মানুষকে ব্যবস্থা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য করে। ওপর মহলে কে কত টাকা দেশ থেকে পাচার করল, সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কিন্তু তার থেকেও বড় বাস্তবতা হচ্ছে—একজন সাধারণ মানুষ বৈধ কাজ করতে গিয়েও কত রকম হয়রানির ভেতর দিয়ে যায়। একটা কাগজ তুলতে, একটা সেবা পেতে, একটা অনুমতি নিতে কত ধাপ, কত দেরি, কত অদ্ভুত নিয়ম তাদের পার করতে হয়। অনেক সময় নিয়মের বাইরে পয়সা না দিলে কাজই হয় না। এই নিপীড়নটা খুবই নীরব, কিন্তু গভীরভাবে প্রোথিত। আমি সরকারের ভেতরে থেকে প্রায় ৩০ বছর এটা দেখেছি। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, ভেতরে থাকলে বোঝা যায় আরও ভালো।
সিস্টেম বা ব্যবস্থা ঠিক থাকলে মানুষকে দরজায় দরজায় ঘুরতে হয় না। কাউকে ধরে রাখতে হয় না। পয়সা দিয়ে ‘একটু দেখেন’ বলার দরকার পড়ে না। মানুষ তখন নিজের আসল কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে, নিজের পরিবার নিয়ে ভাবতে পারে। রাষ্ট্র তখন আর ভয়ের জায়গা থাকে না, ধীরে ধীরে ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমি জোহরান মামদানির নিউইয়র্কের প্রথম মেয়র হিসেবে বক্তৃতাটা শুনেছি। পুরো ২৮ মিনিট। এক নিশ্বাসে। বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে, লোকটা শুধু স্ক্রিপ্ট ছাড়া কথা বলছেন না, হোমওয়ার্কও করে এসেছেন। তাঁর কথার কেন্দ্রে ছিল মানুষের জীবন সহজ করা। বাসাভাড়া কমানো, হেলথ কেয়ারকে সাশ্রয়ী করা, গণপরিবহনকে মানুষের উপযোগী করা। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, শহরটা ধনীদের জন্য নয়, শহরটা সবার জন্য। যাঁরা কাজ করেন, যাঁরা ভাড়া দেন, যাঁরা ট্যাক্স দেন, তাঁদের জীবন যেন শুধু টিকে থাকার লড়াই না হয়ে যায়। যেন সন্তান নিতে গিয়ে মানুষকে হাজারবার হিসাব করতে না হয়। আমি অনেকটাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম।
এই কথাগুলো শুনতে শুনতে বারবার বাংলাদেশের কথাই মনে পড়ছিল। আমাদেরও দরকার এমন নেতৃত্ব, যাঁরা বড় বড় কথা কম বলবেন, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন কষ্টগুলো বুঝবেন। যাঁরা বুঝবেন, উন্নয়ন মানে শুধু ব্রিজ আর ফ্লাইওভার নয়। উন্নয়ন মানে একজন মানুষ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছেন কি না, মাসের শেষে তাঁর হিসাব মিলছে কি না। তাঁর বাচ্চার স্কুল ফি দিতে গিয়ে যেন মাথাব্যথার কারণ না হয়। হাসপাতালে গেলে যেন আগে টাকা নয়, আগে চিকিৎসা পান। রাষ্ট্রকে মানবিক করার অনেক ব্লুপ্রিন্ট পাচ্ছিলাম তাঁর কথা থেকে।
এখন পৃথিবীর সবকিছুর কেন্দ্রে প্রযুক্তি। অফিস, ব্যাংক, হাসপাতাল, শিক্ষা—সবখানেই কোনো না কোনো সিস্টেম বসে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রযুক্তি কার জন্য কাজ করছে? মানুষের জন্য, নাকি মানুষকেই প্রযুক্তির জন্য ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে করে দিচ্ছে? প্রযুক্তি যদি মানুষের জীবন সহজ না করে, যদি একটা কাজ করতে গিয়ে মানুষকে আরও বেশি ফরম পূরণ, আরও বেশি লগ ইন, আরও বেশি কাউন্টারের সামনে দাঁড় করায়, তাহলে সেই প্রযুক্তি আসলে নতুন মোড়কে পুরোনো কষ্ট।
এখানেই ‘টেকনোলজিক্যাল জাস্টিস’-এর কথা আসে। খুব সোজা কথা—যন্ত্র মানুষ চিনবে না, ক্ষমতা চিনবে না, পরিচয় চিনবে না। যন্ত্র শুধু কাজ চিনবে। আপনি মন্ত্রী হোন বা সাধারণ নাগরিক, ডিজিটাল লাইনে দাঁড়ানোর নিয়ম একটাই হবে। আবেদন করলে একই সময়ে প্রসেস হবে। সিদ্ধান্ত হবে ডেটা আর লজিকের ওপর ভিত্তি করে, ফোন কল আর সুপারিশের ওপর নয়। যখন যন্ত্র ঠিকভাবে ডিজাইন করা হয়, তখন বৈষম্যের অনেক দরজা নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যায়।
ধরুন, একটা সার্ভিস নিতে আগে পাঁচটা অফিসে যেতে হতো। একেক জায়গায় একেকজনের মন ভালো না থাকলে কাজ আটকে যেত। এখন যদি সেই সার্ভিসটা অনলাইনে, একটা সাধারণ সিস্টেমে পাওয়া যায়, তাহলে কেউ আপনাকে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে না। আপনার ফাইল কারও টেবিলের নিচে চাপা পড়ে থাকবে না। আপনি জানবেন, আজ আবেদন করলেন, তিন দিনের মধ্যে উত্তর পাবেন। না হলে কেন পাবেন না, সেটাও লিখিত থাকবে। এই স্বচ্ছতাই মানুষকে সিস্টেমের ওপর ভরসা করতে শেখায়।
সিস্টেম বা ব্যবস্থা ঠিক থাকলে মানুষকে দরজায় দরজায় ঘুরতে হয় না। কাউকে ধরে রাখতে হয় না। পয়সা দিয়ে ‘একটু দেখেন’ বলার দরকার পড়ে না। মানুষ তখন নিজের আসল কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে, নিজের পরিবার নিয়ে ভাবতে পারে। রাষ্ট্র তখন আর ভয়ের জায়গা থাকে না, ধীরে ধীরে ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে।
সত্যি বলতে, এই ধরনের সিস্টেম, এই ধরনের চিন্তা নিয়েই আমি কয়েকটা বই লিখেছি, টেড টক দিয়েছি। কারণ, আমি নিজের চোখে দেখেছি—সিস্টেম ঠিক থাকলে মানুষ কেমন বদলে যায়। লোকেরা তখন নিয়ম মানেন, ট্যাক্স দেন, রাষ্ট্রকে আপন মনে করেন। আমি বিশ্বাস করি, পরিবর্তন আসবে। হয়তো ধীরে আসবে, কিন্তু আসবে মানুষের জীবনকে কেন্দ্রে রেখে। কারণ, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, প্রযুক্তি, সিস্টেম—সবকিছুর মানে একটাই: মানুষ যেন একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারে।
রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক