মতামত

প্রাথমিক শিক্ষায় ভালো মানের শিক্ষক কেন আসবে

প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলে একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। সম্প্রতি সংবাদপত্রে এক শিক্ষকের লেখা পড়েছিলাম, যেখানে বলা হয়েছিল যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী রিডিং করতে পারে না। যদিও এটি সম্পূর্ণ সত্য নাও হতে পারে, তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এটি সঠিক মনে হয়। যদি আমরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য কার্যক্রম মূল্যায়ন করি, তবে এই বক্তব্যের সত্যতা বোঝা যাবে।

অটো পাস, পরীক্ষার মাধ্যমে জিপিএ–৫ পাওয়া, শতভাগ পাস, কিছু ক্ষেত্রেই পরীক্ষাপদ্ধতি বাতিল—এই সবকিছুই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। সমাজে এই বিষয়গুলো নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, এবং এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর রয়েছে। যদিও সব সেক্টরে ব্যর্থতা রয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার এখনই অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এই দায়িত্ব শুধু কর্তৃপক্ষের নয়, শিক্ষকদেরও রয়েছে।

সরকারি নীতি নির্ধারণে বার্ষিক পরিকল্পনা দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়নি, এবং আমরা শিক্ষকেরা বাহ্যিকভাবে কোনো পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখি না অনেক ক্ষেত্রে। তাই শিক্ষার মূলে সংস্কারের দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যত বেশি শক্তিশালী ভিত্তি হবে, তত বেশি উন্নতি ঘটবে উচ্চশিক্ষায়, যা আমাদের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শিক্ষকতা ঐতিহাসিকভাবে একটি মহান পেশা হিসেবে বিবেচিত। সমাজ ও রাষ্ট্র শিক্ষকদের জন্য সম্মান প্রদর্শন করলেও, বাস্তবে তাঁরা কতটা সম্মানিত হচ্ছেন, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের শিক্ষকদের আর্থিক এবং অন্যান্য সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকেরা মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেও ১৩ নম্বর গ্রেডে বেতন পান। অথচ অন্য ক্ষেত্রের কর্মীরা, যাঁরা একই শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেন, তাঁরা ১০ নম্বর গ্রেডে বেশি বেতন পান।

ভারতের প্রতিবেশী দেশে প্রাথমিক শিক্ষকেরা ২৯,০০০ টাকা মাসিক বেতন পান, কিন্তু আমাদের দেশে তা ১৬,২৫০ টাকা। এর ফলে কীভাবে প্রাথমিক শিক্ষকদের মেধাবী হিসেবে নিয়োগ করা সম্ভব? আর শিক্ষার্থীরা কি ভালো মানের শিক্ষক পাচ্ছে? তাই, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

যদি শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকে, তবে তাঁরা কীভাবে শ্রেণিকক্ষে মেধা এবং শক্তি দিয়ে পাঠদান করবেন? তাঁদের সমস্যা সমাধানের সময় এখন এসেছে। এ জন্য সরকারকে শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রাথমিক শিক্ষকদের বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ, আপনি নিজেও শিক্ষক নিয়ে ভাবেন এবং সরকারপ্রধান, তাই আপনি শিক্ষকদের পরিস্থিতি ভালোভাবে বুঝতে পারেন।

শিক্ষকদের শুধু সম্মান জানানোই যথেষ্ট নয়, তাঁদের আর্থিক বিষয়গুলোও গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, শিক্ষার মান উন্নয়নের সঙ্গে আর্থিক বিষয়টি অত্যন্ত সম্পর্কিত। ভালো শিক্ষকদের নিয়োগ ও তাঁদের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে, যাতে তাঁরা শিক্ষার মান উন্নত করতে আগ্রহী হন।

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এখানে কোনো দুর্বলতা থাকে, তাহলে তা পুরো শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলবে। যেমন একটি বিল্ডিংয়ের স্থায়িত্ব তার ভিত্তির ওপর নির্ভর করে, তেমনি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও প্রাথমিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে যোগ্য শিক্ষকের নিয়োগ অপরিহার্য।

এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অভিযোগ রয়েছে, যা শিগগিরই দূর করতে হবে। যেহেতু শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি তদারক করতে হবে।

ভারতের প্রতিবেশী দেশে প্রাথমিক শিক্ষকেরা ২৯,০০০ টাকা মাসিক বেতন পান, কিন্তু আমাদের দেশে তা ১৬,২৫০ টাকা। এর ফলে কীভাবে প্রাথমিক শিক্ষকদের মেধাবী হিসেবে নিয়োগ করা সম্ভব? আর শিক্ষার্থীরা কি ভালো মানের শিক্ষক পাচ্ছে? তাই, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

অপর্যাপ্ত বেতন এবং সুযোগ-সুবিধার কারণে, শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য তাঁদের গ্রেড ও পদোন্নতি ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। প্রধান শিক্ষক বা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদে উন্নীত হতে শিক্ষকদের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অতএব, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বেতনবৈষম্য দূর করা। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, তা হবে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হবে।

  • মো. শফিকুল ইসলাম সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ