
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। একসময় দেশের গ্রামাঞ্চলে কৃষি, মৎস্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান প্রাণশক্তি ছিল অসংখ্য খাল। এই খালগুলো সেচের পানি সরবরাহ করত, মাছ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করত এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জলপথ যোগাযোগও বজায় রাখত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের হাজার হাজার খাল ভরাট হয়ে গেছে, অনেকগুলো দখল হয়ে গেছে, কিংবা নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে কৃষি উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ জীবিকার ওপর এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার অঙ্গীকার অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ এই বাস্তবতার মধ্যেই একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু খাল পুনঃখনন করা নয়; বরং দেশের ঐতিহ্যবাহী পানিব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করে তাকে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি উন্নয়ন, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং গ্রামীণ জীবিকার শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করা।
এই উদ্যোগটি একই সঙ্গে বহন করছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের ঐতিহ্য। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে গৃহীত নানা উদ্যোগ বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমান খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচি সেই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন বাস্তবতায়, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, পুষ্টিনিরাপত্তা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
গত এক বছরে তারেক রহমানের উদ্যোগে প্রকৌশলী, পানিসম্পদ–বিশেষজ্ঞ, কৃষিবিজ্ঞানী এবং উন্নয়ন পেশাজীবীদের একটি দল দেশের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় খাল পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করে আসছে। মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা, স্যাটেলাইট মানচিত্র বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও ছোট নদী চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো পুনঃখনন বা পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পিত মানচিত্রায়ণ দেশের জন্য একটি সমন্বিত পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করছে।
পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হলে এই কর্মসূচি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ উন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, যা শুধু খালই পুনরুজ্জীবিত করবে না, বরং পুনরুজ্জীবিত করবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনমান।
বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবু পুষ্টি পরিস্থিতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। দেশে এখনো প্রায় ১১-১২ শতাংশ ৫ বছরের কম বয়সী শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং এই বয়সের শিশুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ খর্বাকৃতির (stunted)। এর অর্থ হলো দীর্ঘদিনের পুষ্টির ঘাটতি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলছে। শিক্ষা গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে অনেক পরিবার এখনো পর্যাপ্ত খাদ্যবৈচিত্র্য পায় না, বিশেষ করে শাকসবজি, ফলমূল এবং প্রাণিজ খাদ্যের ক্ষেত্রে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়ন। খাল পুনরুজ্জীবন কর্মসূচি সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খাল পুনঃখননের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুফলগুলোর একটি হলো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি। খালগুলো পুনরুজ্জীবিত হলে সেখানে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে কৃষকেরা বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। ধানের পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, তেলবীজসহ নানা ধরনের পুষ্টিকর ফসল চাষের সুযোগ বাড়বে। অনেক এলাকায় সেচের সুবিধা থাকলে কৃষকেরা শুধু ধান নয়, বরং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হন।
এই কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মৎস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি। পুনরুদ্ধার করা খালগুলো ছোট পরিসরে মাছ চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ছোট মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস, যা প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’, ক্যালসিয়াম ও আয়রনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে খালভিত্তিক মৎস্য উৎপাদন গ্রামীণ খাদ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এই কর্মসূচি গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামে নারীরা হোমস্টেড বাগান, হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র পশুপালন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খালের পাড়ে ফল এবং ঔষধি গাছ লাগানো হলে নারীরা সেখানে সবজি চাষ, ফল উৎপাদন, নার্সারি পরিচালনা কিংবা ছোটখাটো উদ্যোক্তা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবেন। নারীদের আয় বাড়লে তা সাধারণত পরিবারের খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ হয়, যা সরাসরি পুষ্টি উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
খাল পুনঃখনন কর্মসূচি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতেও সহায়তা করবে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের কৃষি সেচব্যবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়ে গেছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার হলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং সেচের জন্য পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়বে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং পানি ব্যবস্থাপনা আরও টেকসই হবে।
এ ছাড়া খাল পুনরুজ্জীবন মাটির উর্বরতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য উন্নত করতে পারে। খালে পানি থাকলে আশপাশের জমির মাটিতে আর্দ্রতা বজায় থাকে, ফলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ে। খালের পাড়ে ফল, কাঠ ও ঔষধি গাছ লাগানো হলে মাটির ক্ষয় কমে, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় পরিবেশ আরও স্থিতিশীল হয়।
খাল পুনরুজ্জীবনের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন এটিকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর উৎস দেশের বাইরে। বিশেষ করে গঙ্গা নদীর ওপর ভারতের নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদীপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে অনেক নদী ভরাট হয়ে গেছে, পৃষ্ঠস্থ পানির প্রাপ্যতা কমেছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তারও বেড়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বাস্তবতায় দেশের অভ্যন্তরীণ খাল নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু অভিযোজন কৌশল। পুনঃখনন করা খালগুলো বর্ষার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে এবং তা কৃষিজমিতে বিতরণ করা সম্ভব হবে। এতে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি মোকাবিলা করা সহজ হবে। একই সঙ্গে খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ কার্বন শোষণ বাড়াবে, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করবে এবং স্থানীয় জলবায়ু পরিবেশ উন্নত করবে।
খাল পুনরুজ্জীবন বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতীতে এই খালগুলো শুধু সেচ নয়, বরং গ্রামকে বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবেও কাজ করত। এই নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধার হলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত হবে।
সবশেষে বলা যায়, খাল পুনঃখনন কর্মসূচি কেবল একটি পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষিব্যবস্থা এবং পরিবেশ পুনরুজ্জীবনের একটি জাতীয় উদ্যোগ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্য উন্নয়ন, মাটির স্বাস্থ্য, নারীর জীবিকা এবং জলবায়ু–সহনশীলতা—এই সব ক্ষেত্রকে একসঙ্গে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এ কর্মসূচি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের একটি নতুন ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হলে এই কর্মসূচি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ উন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, যা শুধু খালই পুনরুজ্জীবিত করবে না, বরং পুনরুজ্জীবিত করবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনমান।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার উপদেষ্টা, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি। সাবেক সিনিয়র হেলথ ও নিউট্রিশন স্পেশালিস্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ