হাইকোর্টের রায়ের আলোকেই গত অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এবং ডিসেম্বরে সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর তা থমকে যায়।
হাইকোর্টের রায়ের আলোকেই গত অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এবং ডিসেম্বরে সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর তা থমকে যায়।

মতামত

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে চিরচেনা রাজনৈতিক দ্বিচারিতা

একটি স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। রাজনৈতিক দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সর্বদাই ক্ষমতার পৃথক্‌করণের কথা বলে আসছেন।

নাগরিকের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার সুস্পষ্ট বিভাজন থাকতে হবে এবং বিচার বিভাগকে আইন ও নির্বাহী বিভাগের থাবা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে।

বৈশ্বিক ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বারবার প্রমাণ করেছে, যেখানেই বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা হয়েছে, সেখানেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

বিপরীতে, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সব সময়ই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই দর্শন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধারণ করা হয়েছিল।

যদিও ওই সংবিধানেরই ৭০ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীকে এমনই একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যে তাঁর কাছে কেবল দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য থাকলেই ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই সংবিধান সংশোধন করে, এমনকি বাকশালও (চতুর্থ সংশোধনী) কায়েম করা যায়।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ক্ষমতার মসনদে যখনই যে দল বসেছে, তারা মুখে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্লোগান দিলেও কার্যত একে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ–সংক্রান্ত আইনি ও রাজনৈতিক নাটকীয়তা এই নির্মম সত্যকে আবারও দেশের জনগণের সামনে উন্মোচন করেছে। আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আদালতেরই হাত-পা বেঁধে ফেলার সেই চিরচেনা রাজনৈতিক খেলা যেমন পরিহাসের, তেমনি গভীর উদ্বেগের।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর, যখন সাত আইনজীবীর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। এই রায়ে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে বাতিল ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।

মূল সংবিধানে অধস্তন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধানের পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল সুপ্রিম কোর্টের ওপর। পরবর্তীকালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়, যা বিচার বিভাগের টুঁটি চেপে ধরার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়।

যদিও পঞ্চদশ সংশোধনীতে ‘সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে’ কথাটি যুক্ত করা হয়, তা সত্ত্বেও কার্যত তা নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থেকে যায়। হাইকোর্ট এই প্রশাসনিক চাবিকাঠি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি স্বাধীন ও পৃথক ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার জন্য তিন মাসের সময় বেঁধে দেন।

হাইকোর্টের রায়ের আলোকেই গত বছরের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এবং ডিসেম্বরে সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হয়। কিন্তু শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের এই সুবর্ণ সুযোগ থমকে যায় রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পরপরই এক অদ্ভুত ও বৈপরীত্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করে। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিরোধী দলসমূহের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করা হয়।

এর মাধ্যমে সদ্য প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সচিবালয়টি কেবল বিলুপ্তই করা হয়নি, বরং এর বাজেট, চলমান প্রকল্প ও জনবল আবার আইন মন্ত্রণালয়ের, অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগের অধীন ন্যস্ত করা হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে যে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা রয়েছে, তা সত্যিই স্তম্ভিত করার মতো। ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষরের সময় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বিএনপি কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দেয়নি।

বহুল আলোচিত ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ কর্মসূচির ১০ নম্বর দফাতেও স্পষ্টভাবে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। এমনকি দলটির নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহারে এই সচিবালয়কে আরও ‘শক্তিশালী’ করার অঙ্গীকারও করা হয়েছিল! অথচ ক্ষমতায় বসার পরপরই তারা সেই অঙ্গীকার ধূলিসাৎ করে অধ্যাদেশ বাতিলের বিল পাস করে বিএনপি।

এখানেই শেষ নয়, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল করা হয় এবং গত ৯ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই যুগান্তকারী রায়টি স্থগিত করে ১৬ জুন পূর্ণাঙ্গ শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

ক্ষমতার এ খেলায় সবচেয়ে বড় আইরনি বা পরিহাসের জায়গাটি এখানেই। যে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অপরিহার্য, নির্বাহী বিভাগের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টেরই আপিল বিভাগ সেই সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রায় স্থগিত করেছেন।

আইন অঙ্গনে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে, ‘কোর্টের কাঁধে বন্দুক রেখে স্বার্থ হাসিল করা।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। নির্বাহী বিভাগ নিজে সরাসরি সংস্কার অগ্রাহ্য না করে, আদালতেরই একটি স্থগিতাদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

সেই রায়ের ১২ দফা নির্দেশনার অন্যতম প্রধান শর্তই ছিল বিচারকদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো, পৃথক চেইন অব কমান্ড এবং একটি স্বাধীন সচিবালয়। অথচ দীর্ঘ দুই যুগ ধরে প্রতিটি শাসক দল এই রায়ের মূল স্পিরিটকে পাশ কাটিয়ে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করেছে।

এখন ‘বিষয়টি সাবজুডিস’ বা আদালতের বিচারাধীন—এই চমৎকার আইনি বচনের আড়ালে মূল সংস্কারটিকে এক প্রাতিষ্ঠানিক গোলকধাঁধায় আটকে রাখার এবং অন্তহীন সময়ক্ষেপণের একটি মোক্ষম সুযোগ তৈরি হলো।

এই স্থগিতাদেশের ফলে বিচার বিভাগের বহুল প্রত্যাশিত সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক মারাত্মক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

একটি কার্যকর ও স্বাধীন সচিবালয়হীন সুপ্রিম কোর্ট আসলে এক চাকা ছাড়া রাজকীয় গাড়ির মতো, যা বাহ্যিকভাবে চমৎকার দেখালেও চলার জন্য তাকে চিরকাল নির্বাহী বিভাগের (আইন মন্ত্রণালয়) ইঞ্জিনের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৯৯ সালের ‘মাসদার হোসেন মামলা’ মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ‘মারবারি বনাম ম্যাডিসন’-এর মতো এক অনন্য মাইলফলক।

সেই রায়ের ১২ দফা নির্দেশনার অন্যতম প্রধান শর্তই ছিল বিচারকদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো, পৃথক চেইন অব কমান্ড এবং একটি স্বাধীন সচিবালয়। অথচ দীর্ঘ দুই যুগ ধরে প্রতিটি শাসক দল এই রায়ের মূল স্পিরিটকে পাশ কাটিয়ে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করেছে।

বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে, ক্ষমতার চরিত্র সব জমানায় একই রকম থাকে। বিরোধী দলে থাকতে যে সংস্কারকে ‘রাষ্ট্র মেরামত’ বলা হয়, ক্ষমতায় গিয়ে তা ‘ক্ষমতা সংহতকরণের’ পথে বাধা মনে হয়।

একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রথম শর্তই হলো আইনের শাসন। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলকে তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে এবং যেকোনো মূল্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।

ক্ষমতার চাবিকাঠি কুক্ষিগত করার এই আত্মঘাতী সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বারবার এমন প্রাতিষ্ঠানিক মারপ্যাঁচের আবর্তেই ঘুরপাক খেতে থাকবে।

  • ফরিদুল হক, যুগ্ম সদস্যসচিব, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)

    মতামত লেখকের নিজস্ব।