যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ হামলার পর জ্বলছে টুইন টাওয়ার। এই হামলায় নিহত হয় প্রায় তিন হাজার মানুষ
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ হামলার পর জ্বলছে টুইন টাওয়ার। এই হামলায় নিহত হয় প্রায় তিন হাজার মানুষ

মতামত

৯/১১–এর ২৫ বছর: বাংলাদেশ থেকে গিয়ে যেসব প্রশ্নের মুখে পড়েছিলাম

আজ আমরা যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী স্মরণ করছি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সংঘটিত এই হামলা মূলত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ৯/১১-এর অন্যতম বড় প্রভাব হলো মানুষের মধ্যে চলমান অবিশ্বাস এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ক্রমাগত অবক্ষয়।

বিশেষ করে, পশ্চিম ও পূর্বের মধ্যে আন্তর্জাতিক ও আন্তসাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং পশ্চিমা সমাজে ইসলাম ও মুসলিম জনগোষ্ঠী বা সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা ৯/১১-এর বর্বর সন্ত্রাসী হামলার পর নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আমি যখনই বিমানে ভ্রমণ করি এবং অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তখন ৯/১১-এর জন্য দায়ী সেই মানুষগুলোর প্রতি আমার ঘৃণা আরও তীব্র হয়—যারা সেদিন প্রায় তিন হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছিল।

একজন তরুণ মুসলিম হিসেবে আমি বেড়ে উঠেছি এবং ৯/১১-এর পরপরই আমার সাংবাদিকতা পেশার বিকাশ ঘটেছে। আমি এখনো সেই দিনটির কথা মনে করতে পারি।

তখন আমি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) আন্তর্জাতিক ডেস্কে একজন তরুণ সাব-এডিটর হিসেবে কাজ করছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে, টেলিভিশনের সংবাদে নিউইয়র্ক সিটির টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসীদের বিমান আঘাত হানার দৃশ্য দেখেছিলাম।

প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, এটি হয়তো নিছক একটি দুর্ঘটনা। এ ঘটনা যে বিশ্বরাজনীতিকে আমূল পরিবর্তন করে দেবে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। আমরা এটাও বুঝতে পারিনি যে মুসলিম সম্প্রদায় ও ইসলাম সম্পর্কে অবিশ্বাস এবং ভুল ধারণার কারণে সারা বিশ্বের মুসলমানদের একটি নরকসম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। মুসলমানদের সবাইকে সন্ত্রাসী মনে করার মতো গতানুগতিক ও নেতিবাচক ধারণার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমদের ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনাগুলোও গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল।

আমি নিজেও এ ধরনের ঘৃণার সরাসরি শিকার হয়েছি। ২০০৮ সালে, ৯/১১ হামলার সাত বছর পর, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের কারবনডেলে একজন গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী হিসেবে আসার কিছুদিন পরের ঘটনা। একদিন আমি একটি ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে ওয়ালমার্টে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন ব্যক্তি আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার ব্যাগে কোনো বিস্ফোরক আছে কি না।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা চালানো হয়

৯/১১-এর প্রায় দুই দশক পরও আলাবামা অঙ্গরাজ্যের একজন শিক্ষার্থী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার জন্মভূমি বাংলাদেশে বসবাসকারী মানুষেরা সিরিয়ার আইএস সদস্যদের মতো কি না। এটি কোনো নির্দোষ প্রশ্ন ছিল না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমার আরবি নামের কারণে আমার শিক্ষার্থী আমার উদ্দেশে এই প্রশ্নটি করেছিল। যদিও সে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আদর্শ সম্পর্কে কিছুই জানত না।

যখন আমাকে আমার আগের প্রথম নাম ‘মোহাম্মদ’ বলে ডাকতে হতো, তখন অনেক সময় মানুষ আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাত। এ ধরনের অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতির পর শেষ পর্যন্ত আমি আমার মধ্য নামকে প্রথম নাম হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিই এবং আমার প্রথম নামের বানান ‘Delaware’ করি, যাতে নামটি কিছুটা বেশি আমেরিকান শোনায়।

আমেরিকার রক্ষণশীল দক্ষিণ অঞ্চলে এক দশক কাজ করার সুবাদে আমার অনেক রক্ষণশীল বন্ধু রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমান প্রশাসনে বেশ প্রভাবশালী। সাংবাদিকতার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি রক্ষণশীল গণমাধ্যমও নিয়মিত অনুসরণ করি। ৯/১১-এর প্রায় দুই দশক পরও এসব গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যে মুসলিম জনগোষ্ঠী ও ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর বিদ্বেষ দেখতে পাই।

আমি মনে করি না যে সব মুসলমান নিখুঁত। মুসলিম সমাজেও খারাপ মানুষ রয়েছে, যেমন সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার সদস্যরা। তবে সারা বিশ্বের মুসলমানদের সম্পর্কে গৎবাঁধা ও প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা ন্যায্য নয়। ইসলাম ধর্ম বা মুসলিমদের নিয়ে এ নেতিবাচক মনোভাব এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত মুসলিম দেশ ও সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে কাজ করে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করা এবং এর মাধ্যমে একটি সুন্দর বিশ্ব গড়ে তোলা।

আমরা সবাই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানি। যদি এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে অন্যান্য মুসলিম দেশের সঙ্গেও কেন আমরা একই ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করব না?

বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সাবেক আইএস নেতা আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার সরকারের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে এবং সিরিয়ার ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে—এটি একটি ভালো উদ্যোগ।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা কিংবা বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার সঙ্গে কাজ করার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। একজন সাধারণ আমেরিকান হিসেবে, সেতু পুড়িয়ে ফেলার পরিবর্তে আরও বেশি সেতু নির্মাণের জন্য বর্তমান প্রশাসনের এই প্রচেষ্টাকে আমি অত্যন্ত প্রশংসা করি।

এ ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপের পাশাপাশি রক্ষণশীল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতে মুসলিম জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তাদের বক্তব্য ও বয়ান পরিবর্তন করা এবং ইসলাম সম্পর্কে গৎবাঁধা ধারণা প্রচার বন্ধ করা প্রয়োজন। এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা সমাজে মুসলমানদের সম্পর্কে আস্থা, সম্পর্ক এবং জনসাধারণের ধারণা পুনর্গঠনে সহায়তা করবে।

  • ড. দিলওয়ার আরিফ নিউইয়র্কের ক্যানিসিয়াস ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতার ডিরেক্টর। ই–মেইল: delawarearif@gmail.com
    মতামত লেখকের নিজস্ব