
বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে, সে নির্বাচনে নিজ হাতে গড়া দলটি (বিএনপির পত্তন জিয়াউর রহমানের হাতে হলেও এই একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠেছে খালেদা জিয়ার হাত ধরেই) দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় গেছে এবং সেই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন খালেদা জিয়া—এমন একটা দৃশ্য না দেখার আফসোস সম্ভবত থেকে যাবে আমাদের। সত্যি বলতে, এটা দেখে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অধিকার ছিল তাঁরই।
শেখ হাসিনাবিরোধী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় নামটি খালেদা জিয়া। প্রথম আলোতে আগে একটি কলামে লিখেছিলাম, শেখ হাসিনা কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের মতো করে আরও অনেক বেশি সময় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি কারণ, তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভেঙে ফেলতে পারেননি (যেটা পেরেছিলেন হুন সেন)।
এ ঘটনা ঘটতে পেরেছে একদিকে বিদেশে থেকেও দলকে চমৎকারভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারেক রহমান, অপর দিকে দেশে থেকেও কোনো চাপ বা সুবিধাপ্রাপ্তির বিনিময়ে দেশত্যাগ না করা আপসহীন খালেদা জিয়ার লড়াই।
খালেদা জিয়ার রাজনীতি এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের নানা দিক নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। তাঁর চরিত্রের একটি দিক আমাদের দেশের অনাগত সময়ে খুবই জরুরি।
পরিবার ও নিজের গড়া রাজনৈতিক দলের ওপরে তো বটেই, ব্যক্তিগতভাবেও এমন কোনো নিগ্রহ নেই, যেটার শিকার তিনি শেখ হাসিনার দ্বারা হননি। শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়া যদি শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর যৌক্তিক ক্ষোভ প্রকাশ করতেন, সেটাকে মানুষ খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করতেন। কিন্তু ইতিহাসে লেখা থাকবে, ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত একটিবারের জন্যও তিনি এমনকি মৃদু ভাষায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেননি।
শুধু এই সময়েই নয়, তিনি জেলে যাওয়ার আগেও শেখ হাসিনার নিজের মুখে এবং তাঁর দলের লোকজনের তাঁর প্রতি অকথ্য মিথ্যা কুৎসার জবাবে কখনোই কিছু বলেননি। পুরো রাজনৈতিক জীবনে তিনি গড়েছিলেন সভ্যতা, ভদ্রতা, মৃদুভাষণের এক অসাধারণ নজির। বেঁচে থাকলে এবং কর্মক্ষম থাকলে তিনি ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবেই তাঁর এই প্রকাশের ধরন অব্যাহত রাখতেন।
এ কাজটি খালেদা জিয়া (তাঁর সন্তান তারেক রহমানও) এমন সময়ে করছেন, যখন সারা পৃথিবীতে ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির জয়জয়কার চলছে। পপুলিস্ট ও ডেমাগগ রাজনৈতিক নেতারা মানুষের রাগ-ক্ষোভ, বিদ্বেষ, বিভেদ ক্রমাগত উসকে দেওয়ার জন্য ক্রুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করছেন। বৈশ্বিক এই প্রবণতা এসে হাজির হয়েছে বাংলাদেশেও। তার ওপর দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থেকে আমাদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা একেবারে তলানিতে। এ কারণে আমাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।
এ যাত্রা বেগম খালেদা জিয়া যখন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন তাঁর অসুস্থতার যে বিস্তারিত বিবরণ আমাদের সামনে এসেছিল, তাতে তাঁর এবার ফিরে আসা নিয়ে বড় সংশয় ছিল। তখন থেকেই মনে হচ্ছিল, তিনি যদি চলে যান, আমাদের একটা বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। জীবনের পরের দিক থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত কষ্টসংকুল একটি জীবন কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিদায় নেওয়ার আগেই তিনি দেখে গিয়েছিলেন, একটি দলের প্রধান হলেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলমত–নির্বিশেষে সব মানুষের এক অভিভাবক।
এমনকি খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা (খালেদা জিয়াকে অন্যায় নিপীড়ন চালিয়েছে তাঁর সরকার) এবং তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বার্তা দেখলে বোঝা যায়, তাঁর এই অভিভাবকত্বের বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারেননি তাঁরাও। খালেদা জিয়ার এই অভিভাবকত্ব আমাদের জন্য এ মুহূর্তে ছিল খুবই জরুরি।
বেগম খালেদা জিয়াকে মূল্যায়নের জন্য আমরা যত বিশেষণ ব্যবহার করব, এর মধ্যে সবচেয়ে আগে আসবে সম্ভবত উদার, মধ্যপন্থী গণতন্ত্রের জন্য তাঁর আমৃত্যু সংগ্রাম। একটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও অগ্রযাত্রার সাক্ষী তিনি হতে পারলেন না, এটা কষ্টের।
গণ–অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতনের পরও শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সবকিছুর দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসা দেখে অনেকে বাংলাদেশ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশকে এই দুটি দেশের সঙ্গে তুলনা করা ভুল; কারণ, এই দুটি দেশ দীর্ঘকালীন কোনো স্বৈরাচারের শাসনের ছিল না; গণ–অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয়েছিল অবাধ–সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের।
এমন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ ভালোভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থাকলে কোনো দেশের সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। কারণ, স্বৈরাচারী সরকারকে তার ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এটা করতে হয়। এমন পটভূমিতে স্বৈরাচার–পরবর্তী দেশে স্থিতিশীলতা আসার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা থাকেই। এমনকি এমন কোনো দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরও এই ঝুঁকি থেকে যায়। ‘আরব বসন্তের’ পরবর্তী সময়ে এটা দেখা গেছে তিউনিসিয়া ও মিসরে।
একটা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। আশা করা যায়, একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারটি গঠিত হবে। কিন্তু অপরাপর দেশের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সংঘাত দেখলে এটা মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ আছে, নির্বাচন–পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের সামনে স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ থাকবে।
এমন পরিস্থিতিতেই বেগম খালেদা জিয়ার এক ভূমিকা থাকতে পারত অভিভাবক হিসেবে। নির্বাচনের আগে কিংবা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যেকোনো কঠোর দ্বন্দ্ব কিংবা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এবং শক্তির অন্যান্য ভরকেন্দ্রের ওপরে তাঁর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি এসব প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। নিজেদের স্বার্থে এ কারণেই মনে হয়েছিল, তিনি আরও কিছু সময় থাকুন আমাদের সঙ্গে। কিন্তু সেটা হলো না।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁকে যখন সব মানুষ সম্মান জানাচ্ছেন, তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলছেন, তখন আমরা কামনা করি, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের মধ্যকার বিতর্কের ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার মতো অতটা অহিংসার পথ গ্রহণ করতে না পারলেও যেন তারা এমন পর্যায়ে চলে না যায়, যেটা সংঘাত উসকে দিয়ে দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে।
বেগম খালেদা জিয়াকে মূল্যায়নের জন্য আমরা যত বিশেষণ ব্যবহার করব, এর মধ্যে সবচেয়ে আগে আসবে সম্ভবত উদার, মধ্যপন্থী গণতন্ত্রের জন্য তাঁর আমৃত্যু সংগ্রাম। একটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও অগ্রযাত্রার সাক্ষী তিনি হতে পারলেন না, এটা কষ্টের।
কিন্তু রাজনীতির মাঠে তাঁর মতো মার্জিত, ভদ্র আচরণ আমরা যেন করি, যাতে গণতন্ত্রে উত্তরণের ঝুঁকি এড়িয়ে গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে বিকশিত করতে পারি আমরা। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিকভাবে বিকশিত করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই বর্তমান পৃথিবীর প্রবণতা, ডানপন্থী, পরিচয়বাদী, জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির (যার প্রভাব বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও) বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে।
এক অবিশ্বাস্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শারীরিকভাবে বিদায় নিলেন বেগম খালেদা জিয়া; তাঁর জীবন, কর্ম বিদায় নেবে না কখনো। ঘোষিত স্থান ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া লোকে লোকারণ্য জানাজাস্থল (ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিশ্চয়ই যেতে পারেননি আরও অসংখ্য মানুষ) দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষ তাঁদের মনের কোথায় স্থান দিয়েছিলেন এই মানুষটিকে। বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ, শিক্ষা নিজেদের মধ্যে ধারণের মাধ্যমেই আমরা পারব তাঁর প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে।
● জাহেদ উর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব