
ভোট আবহে কলকাতা এলাম। এমন টান টান, এ রকম ‘কী হয় কী হয়’ নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে আগে হয়নি। সম্ভাব্য ফল ঘিরে এমন সাসপেন্স, চৈত্র মাসের দ্বিপ্রাহরিক তাপপ্রবাহের মতো তপ্ত সমাজ এবং যুযুধান দুই প্রধান শিবিরের মধ্যে ঘৃণামিশ্রিত এত প্রবল রেষারেষি বঙ্গসমাজ অতীতে দেখেনি।
পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটেও উত্তেজনা ছিল। কিন্তু এবারের তুলনায় তা ছিল নিতান্তই সরল। সেবারও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্লোগান তুলেছিলেন, ‘আব কি বার দু শ পার’। বিজেপির আশার বেলুন চুপসে গিয়েছিল ৭৭টি আসন জেতার ফলে।
এবার তারা চতুর্গুণ আশাবাদী। অমিত শাহ মাটি কামড়ে ঘাঁটি গেড়েছেন। নরেন্দ্র মোদি ভিড় উপচানো জনসভায় বাংলা দখলের খোয়াব দেখাচ্ছেন। কনভয় থামিয়ে ঝালমুড়ি কিনে খেয়ে ও বিলিয়ে বোঝাতে চাইছেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’। তবু তিনি নন, এবারের ভোটে তৃণমূলের মূল চ্যালেঞ্জার হিসেবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার। নিরপেক্ষতার মুখোশ একটানে খুলে তিনিই মোদি-শাহর ‘সুগ্রীব দোসর’।
সিইসির এই ভূমিকা যেমন অদৃষ্টপূর্ব, তেমনই কোনো রাজ্যের শাসককে এমন সাঁড়াশি আক্রমণের মোকাবিলা সংসদীয় ভারতের চুয়াত্তর বছরের ইতিহাসে দেখা যায়নি। এবারের ভোট তাই এত টান টান। এত সাসপেন্স। এত অভিনব। ছমাস ধরে সবচেয়ে চর্চিত, সমালোচিত, বন্দিত এবং নিন্দিত চরিত্রও জ্ঞানেশ কুমার। এবারের ভোটকে তিনিই হিচককীয় থ্রিলার করে তুলেছেন।
সোমবার কলকাতায় অবতরণের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জানা গেল, জ্ঞানেশ কুমার নতুন চাল চেলেছেন। প্রথম দফার ভোটের তিন ও দ্বিতীয় দফার নয় দিন আগেই রাজ্যের সব মদের দোকান ও পানশালা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।
গাইডলাইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে যা হওয়ার কথা। একইভাবে তিন দিন আগেই সব থানার কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে। অলিখিতভাবে। এর অর্থ, পুলিশের অনুমতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। তৃণমূল কংগ্রেস কিছুদিন ধরেই বলছে, অঘোষিতভাবে জারি হয়েছে জরুরি অবস্থা।
নাম বাদ যাওয়ার চিন্তা, দুশ্চিন্তা ও কাজের চাপ সহ্য করতে না পারা শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও আত্মহত্যার দায় জ্ঞানেশ নেননি। এমন তাড়াহুড়া ও অব্যবস্থায় কেন এসআইআর, সেই প্রশ্নও সুপ্রিম কোর্ট করেননি। এই অবস্থায় মমতা এবারের ভোট ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ করে তুলেছেন। একদিকে বাঙালির মান, মর্যাদা ও আত্মসম্মান রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে বহিরাগত ধূর্ত অবাঙালির আগ্রাসন। শেষ হাসি কে হাসবে? মমতা, নাকি বিজেপি-ইসির যুগলবন্দী?
ভোটের দিন যত এগোচ্ছে, সিইসির বজ্র আঁটুনিও তত দৃঢ় হচ্ছে। ইসির এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোমবারই কলকাতা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, দলের ৮০০ নেতা-কর্মীকে ভোটের আগে গ্রেপ্তারের ছক কষেছে ইসি। তৈরি আরও চার হাজার নামের তালিকা, যাঁদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রয়েছে।
কমিশনের হুকুম, এঁদের মঙ্গলবারের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। নইলে গ্রেপ্তারি! কলকাতায় দেখছি এ নিয়ে প্রবল ক্ষোভে শাসক দল ফুটছে, বিজেপি প্রফুল্ল।
বলতে দ্বিধা নেই, থরহরি কম্প লাগিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর পূর্বসূরি টি এন শেসন ছিলেন সবার চক্ষুশূল, জ্ঞানেশ ‘ভিলেন’ স্রেফ বিজেপিবিরোধীদের চোখে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলই তাঁকে দাঁড় করিয়েছে কঠিনতম প্রতিরোধের মুখে। জ্ঞানেশ কুমার ‘বুনো ওল’ হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাঘা তেঁতুল’। পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোট তাই এত ক্ষুরধার। এত অনিশ্চিত। এমন টান টান। সাসপেন্সে মোড়া।
জ্ঞানেশ চর্চায় আসেন গত বছর বিহারের ভোটের মাস কয়েক আগে, ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নির্দেশ দিয়ে। তাঁর ধারণায়, শাসকশ্রেণির ভোট জেতার অন্যতম হাতিয়ার ভুয়া ভোটার। সেই আগাছা সাফ করাই এসআইআরের লক্ষ্য।
এই যুক্তিতে বিহারে শুরুতেই বাদ যায় ৬৫ লাখ ভোটারের নাম, যাঁরা নাকি মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা যাঁদের নাম একাধিক কেন্দ্রে পাওয়া গেছে। এ নিয়ে হইহল্লার পর তালিকায় সাড়ে ২১ লাখ নাম ওঠে। সব মিলিয়ে বাদ যায় ৪৭ লাখ নাম। বিহারে ভোট হয়েছিল গত বছরের নভেম্বরে। তার আগে অক্টোবরের ২৮ তারিখ থেকে শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গসহ মোট ১২ রাজ্যের এসআইআর। সেই থেকে জ্ঞানেশ কুমারের প্রলয় নাচন চলছে।
১২ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা থেকে ইতিমধ্যে ছেঁটে দিয়েছেন ৭ কোটি ২০ লাখ নাম। তুলেছেন মাত্র ২ কোটি। এতকাল ইসির লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব প্রাপ্তবয়স্ককে ভোটার করা। মানুষকে বুথমুখী করে তোলা। এখন জ্ঞানেশের প্রধান কাজ ভোটার তালিকা থেকে ‘বেনোজল’ বের করা, তাঁর দৃষ্টিতে যাঁরা শাসকদের ক্ষমতাসীন রাখার অদৃশ্য অস্ত্র। এই কাজে তাঁকে সবচেয়ে বেশি বাধা দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। ভোট ঘিরে তাই এত উত্তেজনা।
জ্ঞানেশের চোখে পশ্চিমবঙ্গ দুয়োরানির সন্তান। দুর্বিনীত, রূঢ়, বদমেজাজি এবং নানা ধরনের অসামাজিক ও অগণতান্ত্রিক দোষে দুষ্ট। তৃণমূলের খপ্পর থেকে পশ্চিমবঙ্গকে উদ্ধার করতে তিনি সন্ত্রাসমুক্ত, সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে চান। তাই বনবন তলোয়ার চালিয়ে কলাবন সাফ করতে নেমেছেন। তা নিয়েই
চলছে তুমুল তরজা।
তৃণমূলের চোখে তিনি বিজেপির বিশুদ্ধ এজেন্ট। রেষারেষি এত তীব্র যে মমতার অভিযোগ, কমিশনের বৈঠকে তাঁকে সম্মান দেখাতে জ্ঞানেশ উঠে পর্যন্ত দাঁড়াননি। তৃণমূলের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের আরজি না শুনেই তাঁদের ‘গেট লস্ট’ বলে দরজা দেখিয়েছেন। তৃণমূল সরকারের প্রতি জ্ঞানেশের অবিশ্বাস এতটাই যে সন্ত্রাসমুক্ত ভোট করাতে রাজ্যের প্রায় ৬০০ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাকে বদলি করেছেন। তাঁর সর্বশেষ ছক চার হাজার ‘দুষ্টকে’ আত্মসমর্পণ করতে বলা এবং ৮০০ জন তৃণমূল নেতা-কর্মীকে আটক করা।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর করতে নেমে টিম জ্ঞানেশ প্রথমে বাদ দেয় ৫৮ লাখ নাম। তাঁদের কেউ মৃত, কেউ অন্যত্র চলে গেছেন, কারও নাম দু–তিন জায়গায় রয়েছে, কারও কোনো হদিস নেই। অর্থাৎ অজ্ঞাতকুলশীল বা ভুয়া ভোটার। এতে তেমন আপত্তি কেউ জানায়নি।
বিতর্ক শুরু হয় এরপর। একধাক্কায় আরও ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ গেলে। বিহারের বিরোধীরা যা করেনি, পশ্চিমবঙ্গে এবার তা দেখা গেল। শাসক দল জানপ্রাণ দিয়ে ইসিকে চ্যালেঞ্জ জানাল। শুরু হলো বিজেপি-জ্ঞানেশ ‘অশুভ আঁতাতের পর্দা ফাঁস’ ও ইসির বিরুদ্ধে মামলা।
কোনোকালে কেউ যা করেনি, মমতা তা–ই করলেন। সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে ইসিবিরোধী সওয়াল করলেন। শেষ পর্যন্ত ৯১ লাখ নেমে আসে ৬১ লাখে। ‘বিচারাধীন’ তালিকা থেকে বেরিয়ে আসেন আরও ৩২ লাখ, প্রধানত মমতার দৌলতে। ২৭ লাখের মতো এখনো অনিশ্চিত জ্ঞানেশের আমদানি করা শব্দ ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যানসির’ ফাঁদে। ট্রাইব্যুনাল কী করবে এখনো অজানা। অথচ ঘাড়ের ওপর ভোট।
জ্ঞানেশ বসে নেই। ত্রিনয়নী দুর্গার দেশে তিনি এখন লক্ষনয়নী। ৮৮ হাজার বুথ মুড়ে দিয়েছেন দুই লাখ সিসি ক্যামেরায়। ভোটের দিন হবে রিয়েল টাইম ওয়েবকাস্টিং। কলকাতায় খোলা হচ্ছে ‘ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টার’। ৯০টি স্ক্রিনে ২০০ পর্যবেক্ষক একসঙ্গে ৫০০ বুথে নজরদারি রাখবেন।
সব জেলায় খোলা হচ্ছে কন্ট্রোল রুম। বেগরবাই বা গড়বড় হওয়ার আগাম আন্দাজ পেতে সাহায্য করবে কৃত্রিম মেধা বা এআই। জ্ঞানেশের দৌলতে গোটা পশ্চিমবঙ্গ যেন বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর!
নাম বাদ যাওয়ার চিন্তা, দুশ্চিন্তা ও কাজের চাপ সহ্য করতে না পারা শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও আত্মহত্যার দায় জ্ঞানেশ নেননি। এমন তাড়াহুড়া ও অব্যবস্থায় কেন এসআইআর, সেই প্রশ্নও সুপ্রিম কোর্ট করেননি।
এই অবস্থায় মমতা এবারের ভোট ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ করে তুলেছেন। একদিকে বাঙালির মান, মর্যাদা ও আত্মসম্মান রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে বহিরাগত ধূর্ত অবাঙালির আগ্রাসন। শেষ হাসি কে হাসবে? মমতা, নাকি বিজেপি-ইসির যুগলবন্দী? উত্তর কঠিন, যদিও পরম্পরা হলো, এই ধরনের লড়াইয়ে তৃণমূলেশ্বরী এখনো অজেয়।
● সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
* মতামত লেখকের নিজস্ব