যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সময়, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সময়, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

শশী থারুরের কলাম

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কি জোড়া লাগবে

ভারতে এমন একসময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে সের্জিও গোরের আগমন ঘটছে, যখন দেশ দুটির সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর সন্ধিক্ষণে। মাত্র ৩৮ বছর বয়সী সের্জিও গোর নতুন প্রজন্মের কূটনীতিক, এই প্রজন্ম আদর্শিক ঘোষণার চেয়ে বাস্তব স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। গোরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের একজন বিশ্বস্ত সদস্য।

এ কারণেই নয়াদিল্লিতে গোরের উপস্থিতি ভারতের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারি স্থবির হয়ে পড়েছিল। বাণিজ্য বিরোধ, অবমাননাকর রাজনৈতিক বক্তব্য, অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যাওয়া কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন এবং নতুন ‘প্যাক্স সিলিকা’ সরবরাহ-শৃঙ্খল উদ্যোগের প্রাথমিক তালিকা থেকে ভারতকে বাদ দেওয়া—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি স্পষ্টভাবেই টানাপোড়েনে পড়েছিল। 

গোরের আগমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এখন সম্পর্ক সামলানো হবে আরও সরাসরি এবং আরও উচ্চ ঝুঁকির দর-কষাকষির মাধ্যমে। তাঁর বয়স ও ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়তো গত কয়েক দশকের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আবার গতি দিতে পারে। ভারতের উচিত এই বাস্তবতা মেনে তাঁর সঙ্গে কাজ করে একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো। 

তবে চ্যালেঞ্জগুলো মোটেও ছোট নয়। গোর এমন এক সম্পর্কের দায়িত্ব নিয়েছেন, যা বর্তমানে গভীর চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পেছনে ছিল পারস্পরিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির কারণে আরোপিত জরিমানা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কমে যায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। 

ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত সের্জিও গোর

যদিও বাণিজ্য আলোচনা পরিচালনা করছেন অন্য মার্কিন কর্মকর্তারা, তথাপি রাষ্ট্রদূত হিসেবে গোরের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে এই শুল্কযুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা। সেই সমাধান এমন হতে হবে, যাতে ভারত স্বস্তি পায়, আবার ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে আপস করার অভিযোগও না ওঠে। 

এই মুহূর্তে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্ক সহযোগিতার জায়গা থেকে অনেকটাই সতর্কতায় সরে গেছে। উচ্চ শুল্ক, বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাস্তববাদী জ্বালানি সম্পর্ক—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল।

তবু গোরের আগমন একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সেই পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের চাবিকাঠি এখনো ওয়াশিংটনের হাতেই রয়েছে। 

দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই গোর তাঁর একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে ভারতকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। শুরুতে এ উদ্যোগে ভারতের নাম না থাকা ছিল স্পষ্টতই একধরনের কূটনৈতিক অপমান। অথচ বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অংশীদার হলো ভারত। দুই দেশের সক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক। ভারতকে বাদ দেওয়ার অর্থ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই ক্ষতি করা—যা গোরের ঘোষণায় দ্রুত সংশোধিত হয়েছে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারতে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সম্ভাবনা। প্রতীকী ও কৌশলগত—দুই দিক থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে এই সম্মেলন পিছিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোয়াড যদি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রধান কাঠামো হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তাহলে এই সম্মেলন ভারতে হওয়াই জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদিও গোরের মন্তব্য, এই সফর ‘সম্ভবত এক-দুই বছরের মধ্যে’—এই সম্ভাবনাকে কিছুটা দুর্বল করেছে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে শাস্তিমূলক শুল্ক তুলে নিয়ে হারকে ব্রিটেনের মতো প্রায় ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট বার্তা দেবে—ভারত কোনো সমস্যার উৎস নয়, বরং চীনের বিকল্প একটি স্থিতিশীল সরবরাহ-শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। 

এই চুক্তি ছাড়া রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি বা পার্মিয়ান অঞ্চলের তেল নেওয়ার প্রস্তাব ভারতের জন্য বাস্তবসম্মত হবে না। কিন্তু বাণিজ্যচুক্তি এবং সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট সফর থাকলে, এমন নীতিগত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হবে।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের উষ্ণতা ভারতে নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, পাকিস্তানের খনিজ ও ক্রিপ্টো খাতে মার্কিন আগ্রহ, এমনকি পাসনি বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব—সবকিছুই ভারতের নজরে রয়েছে। এই জটিল বাস্তবতায় গোরের ভূমিকা শুধু বার্তাবাহকের হলে হবে না, সমাধানসূত্র তৈরিতেও তাঁকে ভূমিকা রাখতে হবে। 

শশী থারুর ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত