ভোটের আগে মানুষ ট্রাকে, পিকআপভ্যানে ছুটছে বাড়িতে।
ভোটের আগে মানুষ ট্রাকে, পিকআপভ্যানে ছুটছে বাড়িতে।

মতামত

মানুষের কাছে ভোট কেন এত বড় উৎসব

অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও শঙ্কা পেরিয়ে একটা নির্বাচনের সামনে দেশ। দেশের ইতিহাসে এটা এমন এক আলোচিত নির্বাচন, যেটা নিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত অনেকের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও প্রশ্ন ছিল। গত কয়েক মাস মুখে মুখে মানুষের প্রশ্ন ছিল, নির্বাচন হবে তো? কেউ কেউ এমনটাও ভেবেছেন, ভোট হলেও ফলাফল হবে তো?

শেষ দিনের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে কোনো কারসাজি হয় কি না, সে উদ্বেগ জানিয়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে। শফিকুর রহমান বলেছেন, নির্বাচন হাইজ্যাক করার চিন্তা করছে একটি পক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রশাসনিক ক্যু’, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

কিন্তু ভোটের ছুটির এক দিন আগে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বাস, ট্রেন ও লঞ্চে করে ঠাসাঠাসি ভিড়ে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো থেকে মানুষ যেভাবে ভোট দিতে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন, তাতে উৎসবের চিত্রই মনে করিয়ে দেয়। চার দিনের সঙ্গে অনেকে বাড়তি ছুটি নিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গ্রামে ফিরেছেন। ঈদের ছুটির মতোই অনেককে বাড়ি ফিরতে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে।

ভোটে বিএনপি, জামায়াত জোট—যারই জয় হোক না কেন, এবারের নির্বাচন আমাদের ৫৪ বছরের ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও বিভাজিত সমাজকে মেরামতের বড় সুযোগ। মঙ্গল ও বুধবার বাস, ট্রেন, লঞ্চে করে সাধারণ মানুষ যেভাবে ঈদের ছুটির মতোই বাড়ির পানে ছুটেছেন, তাতে আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশটাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে তাঁরা কতটা আন্তরিক আর মরিয়া। রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের এই অতিসাধারণ চাওয়াটাকে সামান্য সম্মান জানাতে শিখবে না?

ঢাকার ভেতরে চলাচল করা বাসগুলো ছুটেছে দূরপাল্লার পথে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই ঢাকা কার্যত ‘গরিবের টেসলার’ নগরীতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ফাঁকা ভোটের আগের ঢাকার সঙ্গে ঈদের ছবির ঢাকা বলে ফেসবুকে ছবি ও ভিডিও দিয়েছেন। আজ বুধবার সকালে মৌচাক থেকে কারওয়ান বাজারে অফিস আসার পথে ষাটোর্ধ্ব ‘টেসলাচালক’ বলেন, ‘একানব্বইয়ের পর কোনো নির্বাচনে এমন ফাঁকা ঢাকা তিনি দেখেননি।’

বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভোট প্রকৃতপক্ষেই উৎসব। আবার পাঁচ বছর পর এক দিনের জন্য নিজের মর্যাদা, ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার দিন। সারা বছর বাজারে গিয়ে ভালো মাছটা দেখেও কিনতে না পারার গ্লানি, চিকিৎসা নিতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার বোঝা, সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে না পারার বেদনা, রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে অপমান-লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার ক্ষোভ—এ সবকিছুর জবাব দেওয়ার একটা সুযোগ পাঁচ বছর পরই তো তাঁদের সামনে আসে।

ভোটকে কেন্দ্র করে কর্মস্থল থেকে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন মানুষ। টঙ্গী স্টেশন। ১০ ফেব্রুয়ারি

বাংলাদেশে সর্বশেষ ভালো আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হয়েছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। সেই নির্বাচনের সময় যাঁদের বয়স দু-তিন বছর, তাঁরা এবারে নির্বাচনে প্রথম ভোটার। বলতে গেলে জনম থেকেই তাঁরা দেখেননি নির্বাচন আসলে কেমন হয়। আওয়ামী লীগ আমলে পরপর তিনটি একতরফা, রাতের ভোট ও আমি-ডামির নির্বাচন হয়েছে। সেখানে দেশের সব মানুষই ফলাফল। নতুন ভোটার এবং আগের তিনটি নির্বাচনে ভোট না দিতে পারা ভোটার মিলিয়ে (১৮-৩৩ বছর পর্যন্ত) প্রায় সাড়ে চার কোটি ভোটার। ১২ কোটি ৭৬ লাখ ভোটারের ৩ ভাগের ১ ভাগ। ফলে অনেক আসনেই এই ভোট না দিতে পারা ও প্রথমবার ভোট দিতে ভোটাররা যে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠবেন, সেটা বলাই বাহুল্য।

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে পারে—এটা বিশ্বাস করা লোকের সংখ্যা খুব কমই ছিল। দেশের বড় অংশের মানুষ ভেবে নিয়েছিলেন, হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসন এ দেশের নিয়তি। সেই বিশ্বাসটা প্রবল আঘাতে ভেঙে দিয়েছিল জেন-জি প্রজন্ম। প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের বিশাল আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।

তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করলেও এবারে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মতো পুরোনো ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই হচ্ছে। আমাদের দেশে পরিবার থেকেই সাধারণত রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত তৈরি হয়। তবে এবারে তরুণ ভোটাররা মূলত ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন দল পরিবর্তনের কতটা পক্ষে অবস্থান করছে, সেটা বিবেচনায় নেবেন। ৬ কোটি ২৮ লাখ নারী ভোটারের বড় একটা অংশের মধ্যেও কোন দল নারীর ক্ষেত্রে রক্ষণশীল আর কোন দল নারীর পরিবর্তনের সঙ্গী সেই বিবেচনা কাজ করবে।

দুই.

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। অভ্যুত্থানের পর থেকেই পুলিশি ব্যবস্থা ছিল ভঙ্গুর। গত বছরের অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড বেড়ে যায়। এর মধ্যেই ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা করা হয়। এর ঠিক এক দিন পর ঢাকা আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মাথায় খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালানে হয়। কার্যালয়গুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় জনমনে সংশয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে যেভাবে সহিংসতা তৈরি করা হয়েছিল, তাতে অনেকের মনেই নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল।

তফসিল ঘোষণার পর দেশে রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়ে যায়। ৬০ দিনে ২৩৭ সহিংস ঘটনায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ১০৯ জন। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পরও ২২ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণায় সারা দেশেই উৎসবের আবহ তৈরি হয়। বিএনপি ও জামায়াতের প্রধান নেতৃত্ব সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণায় চষে বেড়ান।

তারেক রহমান ১৯ দিনে ৬৪টি জনসভায় বক্তব্য দেন। শফিকুর রহমান ১৯ দিনে ৬২টি জনসভায় বক্তব্য দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তাঁরা দুজন সাক্ষাৎকার দেন। দুই রহমানের বক্তব্যগুলো দলীয় নেতা-কর্মীদের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দেয়। ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ-উদ্দীপনা তৈরি করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিশ্চিত করেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কী ভূমিকা নেয়, তা নিয়েও জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে গত নভেম্বর মাসে গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে অনলাইনে ডাকা আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে যেভাবে চোরাগোপ্তা ককটেল হামলা ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল, তাতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা হয় কি না, সেই সংশয় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বিদেশ থেকে দলটির নেতাদের কেউ কেউ ভোট বর্জনের কথা বললেও মাঠে কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এবারের ভোটে অনেক আসনেই জয়-পরাজয় নির্ধারণে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখবেন।

ভোটে বিএনপি, জামায়াত—যারই জয় হোক না কেন, এবারের নির্বাচন আমাদের ৫৪ বছরের ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও বিভাজিত সমাজকে মেরামতের বড় সুযোগ। মঙ্গল ও বুধবার বাস, ট্রেন, লঞ্চে করে সাধারণ মানুষ যেভাবে ঈদের ছুটির মতোই বাড়ির পানে ছুটেছেন, তাতে আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশটাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে তাঁরা কতটা আন্তরিক আর মরিয়া। রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের এই অতিসাধারণ চাওয়াটাকে সামান্য সম্মান জানাতে শিখবে না?

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

*মতামত লেখকের নিজস্ব