
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৭ সেপ্টেম্বর সংসদে জানিয়েছেন, সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখের মতো।
তিনি আরও জানিয়েছেন, রিকশার এই বিশাল বহরকে চার্জ দিতে গিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগছে তাতে নাকি বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
যদি পরিবারপিছু গড়ে ন্যূনতম চারজন করে সদস্যও ধরে নিই, তাহলে সংসদে দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশে দুই থেকে তিন কোটি মানুষের প্রতিদিনকার খাওয়াদাওয়া, কেনাকাটা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নির্ভর করে আছে এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেন্দ্রিক আয়-উপার্জনের ওপর।
ফলে সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ন্যূনতম প্রস্তুতি না সেরে, নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাজির না করে, অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে কোনো আলাপ–আলোচনায় না বসে সংসদে যখন রিকশা চার্জের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎকে রাজস্ব ক্ষতির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন বাংলাদেশের এই তিন কোটি নাগরিকের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের এই উন্নাসিকতায় আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না।
দেশজুড়ে রিকশাচালকদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে ব্যাটারি খুলে নেওয়ার মতো প্রকাশ্য কর্মসূচি ঘোষণা করার মতো লাগাতারভাবে যে ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে, রিকশাচালকদের অপমান করে, মেরে, লাঞ্ছিত করে সেগুলোর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে যে ঘৃণা উৎপাদন করা হচ্ছে, সে ব্যাপারে সরকারের নীরবতা সহনাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য একটা বড় চিন্তার কারণ।
বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাকাঠামোয় একেবারেই নিচের সারিতে অবস্থান করা রিকশাচালকদের বিরুদ্ধে এমন ঢালাও প্রচারণা এবং প্রতিনিয়ত এ পেশাটিকে হুমকি দিতে থাকা পরিবেশে বাকিদের জন্য হয়তো লুকিয়ে আছে আগাম সতর্কবার্তা।
এহেন ভয়ভীতি প্রদর্শন, ঢালাও অপবাদ, অপমান করে যখন রিকশাচালনা পেশাটাকে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রের নির্বিকার অবস্থানকে নিয়ে প্রশ্ন তো তোলাই যায় যে এমন পরিবেশে বাকিরা কতটুকু নিরাপদ?
অটোরিকশার বিপক্ষে আসা অভিযোগগুলোর যেন কোনো শেষ নেই! এই রিকশা বিপজ্জনক গতি তুলে নিরাপদ ব্রেক কষতে পারে না, লেন মেনে চলে না, হুটহাট মহাসড়কে উঠে পড়ে, ট্রাফিক আইন মানে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
অথচ এত কিছুর পরও পরিসংখ্যান আমাদের জানাচ্ছে যে যাত্রী পরিবহনের সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকায় এই রিকশা রয়েছে শীর্ষস্থানে, যা কিনা সংখ্যার হিসাবে যাত্রীদের মোট বাহন ব্যবহারের ৩৫ শতাংশ।
এরপর ধারাবাহিক তালিকায় রয়েছে বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ি, যা কিনা যথাক্রমে ২১ শতাংশ এবং ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
কম করে হলেও প্রতিটি অটোরিকশা যদি গড়ে প্রতিদিন ১৫ জন করেও যাত্রী পরিবহন করে তাহলে ৫০ লাখ রিকশা দৈনিক সাড়ে সাত কোটি যাত্রী পরিবহনের কাজ করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, অটোরিকশার বিরুদ্ধে এত এত অভিযোগের পরও কেন বিশালসংখ্যক মানুষ এই বিদ্যুৎ–চালিত বাহনটি স্বেচ্ছায় ব্যবহার করছেন! কারণ হচ্ছে, এর চেয়ে সস্তা বিকল্প কোনো বাহন আমাদের নেই। এই বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি না করার দায় তো কোনোভাবেই এই রিকশাচালকদের নয়।
তেমনি এই রিকশা ডিজাইনের যে ত্রুটিগুলো আছে সেটা সারাবার জন্য, রিকশাচালকদের ট্রাফিক আইনের ব্যাপারে শিক্ষিত করে তোলার জন্য, প্রশিক্ষণের জন্য, রিকশা এবং অন্যান্য গাড়িগুলোর জন্য পৃথক লেন ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য সম্পূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের।
এর জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান আছে, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ আছে, সড়ক বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা সবই আছে।
ফলে রিকশাকে এই যে হরহামেশাই ‘বিপজ্জনক’, ‘বিদ্যুৎ অপচয়কারী’, ‘ক্ষতিকারক’ ইত্যাদি নানা নেতিবাচক বিশ্লেষণে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেই নেতিবাচকতা তৈরিতে কি সরকারের কোনো ভূমিকা নেই?
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়মুক্তি দিয়ে কেবল রিকশাচালকদের টার্গেট করলেই কি আমাদের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে?
সস্তা বিকল্প কোনো বাহনের ব্যবস্থা না করে, অটোরিকশার বিরুদ্ধে এমন বিষোদ্গার উগরালেই কি এই অটোরিকশা ব্যবহারের যে বিশাল চাহিদা সেটা ফুরিয়ে যাবে?
যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারে তো তেমনটা হবার কথা নয়।
প্রকৃত অর্থে রিকশাচালকেরা নতুন যাত্রী তৈরি করেননি, বরং যাত্রীদের প্রয়োজনেই এই রিকশার সংখ্যা বেড়েছে।
কারণ, ঢাকা এবং বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রেই অলিগলিসহ অপ্রধান নানা ধরনের সড়কে রিকশা ব্যতীত অন্য যানবাহন চলাচলের অবস্থাটাই বিদ্যমান নেই।
ঢাকায় বাস কিংবা মেট্রো থেকে নেমে বাসা পর্যন্ত যেতে, কিংবা অন্যান্য জেলাশহরগুলোতে ট্রেন কিংবা বাসস্টেশন থেকে নেমে গন্তব্যস্থল পর্যন্ত যাবার জন্য, কিংবা বাসা থেকে নানা প্রয়োজনে স্বল্প কিংবা মাঝারি দূরত্বের হাট-বাজার, স্কুল, কলেজে যাবার জন্য রিকশা ভিন্ন অন্য কোনো সহজ মাধ্যম আমাদের কাছে নেই।
ফলে রিকশার চাহিদাই রিকশার সংখ্যাকে বাড়িয়েছে।
আবার প্যাডেল রিকশার স্বল্পগতির বিপরীতে যাত্রীরা যখন অটোরিকশার দ্রুতগামিতার স্বাদ পেয়ে গেলেন, তখন যাত্রীদের চাপেই অনেক রিকশাওয়ালা অটোরিকশা খুঁজে চালাতে শুরু করেছেন।
কারণ, প্যাডেল রিকশায় যাত্রীরা চড়তে আগের মতো আর আগ্রহ দেখান না। তা ছাড়া রিকশা বিদ্যুতায়িত হওয়ার ফলে রিকশাচালকদের হাঁড়ভাঙা খাটুনি খাটা জীবনে যে তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে, সেটারও তো একটা বিশাল মূল্য আছে।
ফলে অটোরিকশাচালকদের গণশত্রুতে পরিণত করার কার্যক্রমের পালে হাওয়া দেওয়ার পরিবর্তে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এই খাতের অসুবিধাগুলো দূর করা, চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, রিকশাচালকদের ঢালাওভাবে বিদ্যুৎ অপচয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত না করে যে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ চুরি করেও পার পেয়ে যাওয়া যায় সেটা বন্ধ করা, আর সর্বোপরি গণপরিবহনকে প্রকৃত অর্থে গণমুখী করতে খাতসংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে অটোরিকশা–বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন করা।
বাংলাদেশে রিকশা চলছে প্রয়োজনের খাতিরে। কাজেই আমাদের যানজটের যে সমস্যা, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার যে সংস্কৃতি, সড়কে দুর্ঘটনার যে বাস্তব অবস্থা, বিদ্যুতের যে অভাব তা অটোরিকশাকে টার্গেট করে সমাধান করা যাবে না।
রিকশা বাংলাদেশে সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়নি। বরং গণপরিবহনজনিত সংকট, সরু রাস্তা, ভাঙাচোরা মেঠো পথ, অলিগতিতে যাতায়াতের অন্য কোনো মাধ্যম না থাকা, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগব্যবস্থাকে গণমুখী করার বিষয়ে লাগাতার অনীহার ফলে বাংলাদেশের সড়কে যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে রিকশা আর অটোরিকশা সেই শূন্যতা পূরণ করছে মাত্র।
কাজেই অটোরিকশাকে নিয়মের মধ্যে আনার ব্যাপারে সরকারের বর্তমান ঘোষণা আখেরে কোনো ফল আনবে না, যদি না যোগাযোগব্যবস্থার প্রকৃত সংকটের জায়গাগুলোত মনোযোগী হওয়া যায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৭ সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া একই বক্তৃতায় অটোরিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারিকে পানিদূষণ, কৃষির জন্য ক্ষতি আর পোলট্রিশিল্পের ধ্বংসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
পানি, পরিবেশ, পোলট্রিতে দূষণ নিয়ে সরকারের চিন্তা দেশের মানুষের জন্য আশাজাগানিয়া। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ হিসেবে ব্যাটারিকে যেভাবে তিনি সামনে এনেছেন, সেটা সঠিক নয়।
কারণ, খোদ কৃষক এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আমাদের জানাচ্ছেন যে পানি ও কৃষিতে দূষণের মূল কারণ হচ্ছে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপন।
অন্যদিকে পোলট্রিশিল্পের সমস্যা অটোরিকশার ব্যাটারি নয়, বরং রোগের প্রাদুর্ভাব, আমদানি করা পোলট্রি খাবারের বেড়ে যাওয়া দাম, উচ্চ মূল্যের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং লোডশেডিং।
এ ছাড়া রিকশা চালাচ্ছেন সেই কৃষক, যিনি কিনা গেল মৌসুমে আশানুরূপ ফলন ঘরে তুলতে পারেননি, কিংবা শহরে রিকশা চালাচ্ছেন পরের মৌসুমে আবাদের জন্য বীজ কিংবা সারের খরচ মেটাবেন বলে, এই রিকশা সেই ছাত্রও চালান যাঁর পরীক্ষার ফি দেওয়ার সামর্থ্য গরিব পরিবারের নেই।
লেড অ্যাসিড ব্যাটারির দূষণ অবশ্যই আছে। কিন্তু মাথাব্যথার জন্য যেমন মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়, তেমনি দূষণের দোহাই দিয়ে ব্যাটারি প্রযুক্তিকেও বাতিল করে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কারণ, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সৌরসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিস্তারে এই ব্যাটারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, যা আমরা অনেক আগ থেকেই ব্যবহার করছি।
এই একই লেড অ্যাসিড ব্যাটারি প্রযুক্তি ব্যবহার করছি আমাদের গাড়িগুলোতে, আইপিএস সিস্টেমে।
কাজেই এই ব্যাটারি প্রযুক্তিকে ঘিরে লেড, অ্যাসিড এবং অন্যান্য ভারী ধাতু দূষণজনিত যে সমস্যা তা মূলত ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা, যা ঠিক করতে প্রয়োজন প্রথমত অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠা ব্যাটারি সংগ্রহ এবং পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাগত এবং প্রশিক্ষণজনিত সহায়তা প্রদান এবং সেই সঙ্গে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠান।
পরিসংখ্যান আমাদের জানাচ্ছে, রিকশাচালকের প্রতি চারজনের একজন এ পেশায় এসেছেন কৃষিজমি ছেড়ে।
এ ছাড়া রিকশা চালাচ্ছেন সেই কৃষক, যিনি কিনা গেল মৌসুমে আশানুরূপ ফলন ঘরে তুলতে পারেননি, কিংবা শহরে রিকশা চালাচ্ছেন পরের মৌসুমে আবাদের জন্য বীজ কিংবা সারের খরচ মেটাবেন বলে, এই রিকশা সেই ছাত্রও চালান যাঁর পরীক্ষার ফি দেওয়ার সামর্থ্য গরিব পরিবারের নেই।
জরিপে দেখা গেছে যে রিকশাচালকদের মধ্যে ২০ শতাংশ এসেছেন গার্মেন্টস এবং নিম্ন পুঁজির ব্যবসা ছেড়ে, কারণ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার আয়ে তাঁদের সংসার আর চলছিল না।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় এই রিকশাচালনা পেশা অনেক গরিব মানুষেরই শেষ ভরসার জায়গা।
কাজেই সরকারের দায়িত্ব হবে যানজট, দূষণ, বিদ্যুৎ–সংকটের দায় অটোরিকশাচালকদের না দিয়ে এই সংকটগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং এই বিপুলসংখ্যক রিকশাকে ঘিরে যে হালকা প্রকৌশলগত এবং অটোমোবাইলশিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তা কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে চিন্তা শুরু করা।
মওদুদ রহমান প্রকৌশলী ও গবেষক
ই-মেইল: mowdudur@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব