
সম্প্রতি পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ও গোয়েন্দা মহল থেকে চেনা একটি সুর বারবার শোনা যাচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সহায়তার জন্য চীন ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করছে বা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ আলাপ যতটা নাটকীয়, ঠিক ততটাই বাস্তবতাবিবর্জিত। এটি মূলত পশ্চিমাদের একটি পরিচিত ছকে ফেলা সমীকরণ। যেখানে তারা বোঝাতে চায়, বেইজিং মূলত পর্দার আড়ালের ইন্ধনদাতা, তেহরান চীনের স্বেচ্ছাধীন ঘুঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্য হলো পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের দাবাখেলা।
কিন্তু এ ধরনের অনেক চেনা ছকের মতোই এটিও পশ্চিমাদের নিজস্ব অসারতার ভারে ধসে পড়ে। ইরানকে চীনের অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগটি যে শুধু ভিত্তিহীন তা-ই নয়; বরং এটি বেইজিংয়ের ঘোষিত নীতি, বৈশ্বিক সংঘাতে তাদের ধারাবাহিক আচরণ এবং কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক। এর কারণ বুঝতে হলে স্নায়ুযুদ্ধের পুরোনো চশমা সরিয়ে রেখে বেইজিং আসলে কীভাবে কাজ করে, তা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করতে হবে।
‘চীন যেহেতু ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই নিজেদের সরবরাহ লাইন ঠিক রাখতে বেইজিং একসময় বাধ্য হয়ে তেহরানকে অস্ত্র দেবে।’
প্রথমত, চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তির দিকে তাকানো যাক। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জোটনিরপেক্ষতা চীনের প্রধান পররাষ্ট্রনীতি। কয়েক দশক ধরে চীন সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বা অন্য দেশের যুদ্ধে পক্ষ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।
এটি কেবল কথার কথা বা লোকদেখানো ব্যাপার নয়। কোরীয় উপদ্বীপ থেকে শুরু করে বলকান অঞ্চল পর্যন্ত এ নীতিই চীনা কূটনীতির মূল পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের মধ্যকার সরাসরি সংঘাতে কোনো এক পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করা হবে চীনের জন্য স্পষ্টতই এক বড় ধরনের হস্তক্ষেপ। চার দশক ধরে ঠিক এ ধরনের ঝামেলাই এড়িয়ে চলেছে চীন। ফলে এ ধারণা ১৯৮০-এর পরবর্তী চীনের পররাষ্ট্রনীতির ‘ডিএনএ’র সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি চীন কীভাবে সামলেছে, তা একটু খেয়াল করা যাক। পশ্চিমা দেশগুলো যখন ইউক্রেনকে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সহায়তা করেছে, চীন তখন ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। প্রবল চাপ ও জল্পনাকল্পনা সত্ত্বেও বেইজিং কিন্তু মস্কোকে কোনো মারণাস্ত্র পাঠায়নি।
চীনের কাজের ধরন একেবারে স্পষ্ট যে তারা বিশ্বাস করে সংঘাত ও যুদ্ধের অবসান ঘটা উচিত আলোচনার টেবিলে, যুদ্ধ বাড়িয়ে নয়। ইরানের ক্ষেত্রে এ নীতির ব্যতিক্রম হবে কেন? ২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতাতেই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলেছিল। চীন সংলাপের মডেলকেই সব সময় প্রাধান্য দেয়। তেহরানকে অস্ত্র দিলে তাদের দাঁড় করানো ওই মডেল তো নিজেরাই ধ্বংস করে দেবে।
তৃতীয়ত, এখানে সার্বভৌম অধিকারের বিষয়টিও জড়িত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের কোনো পক্ষ নয় চীন। একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে যেকোনো দেশের সঙ্গে—জ্বালানি তেল, বেসামরিক পণ্য ও প্রযুক্তি–বাণিজ্যের মতো—স্বাভাবিক ও বৈধ ব্যবসা পরিচালনার অধিকার বেইজিংয়ের রয়েছে। সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেনকে সামরিক সমর্থনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা বড় ধরনের যৌক্তিক ভুল।
এটি অনেকটা এমন যে বিবদমান দুটি দেশের কাছে গাড়ি বিক্রি করার কারণে জার্মানি ওই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করা। অস্ত্র সরবরাহ না করেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারাই আসলে নিরপেক্ষতার প্রকৃত চেহারা।
পশ্চিমা মহলগুলো থেকে প্রায়ই এর পাল্টা যে যুক্তি দেওয়া হয়, তা তেলনির্ভরতা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘চীন যেহেতু ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই নিজেদের সরবরাহ লাইন ঠিক রাখতে বেইজিং একসময় বাধ্য হয়ে তেহরানকে অস্ত্র দেবে।’ এ তত্ত্ব পশ্চিমাদের চরম কল্পনাশূন্যতা এবং চীনের জ্বালানি সক্ষমতার বিশালতাকে বুঝতে পারার ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
এক দশক ধরে বেইজিং অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাদের জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য এনেছে। তারা বিশাল কৌশলগত তেলের মজুত গড়ে তুলেছে; রাশিয়া, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। চীন ইরানের তেলের কাছে জিম্মি নয়; বরং তারা বহু বিকল্প হাতে থাকা এক সুচতুর জ্বালানি ক্রেতা। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভর করার দিন চীনের জন্য এখন অতীত।
আরেকটি মুখরোচক তত্ত্ব রয়েছে যে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি বা ইউয়ানে ইরানের তেলের দাম মেটানোর যে ইচ্ছা (যাকে ‘পেট্রোইউয়ান’ বলা হচ্ছে), তা মূলত চীনকে তাদের সামরিক দ্বন্দ্বে টেনে আনার একটি ফন্দি। এটি আসলে ইরানের উদ্দেশ্য ও চীনের মানসিকতা—উভয় ক্ষেত্রেই একটি বড় ভুল–বোঝাবুঝি।
এই ‘পেট্রোইউয়ান’ মূলত মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি আর্থিক সুরক্ষাকবচ, সামরিক সাহায্যের কোনো আহ্বান নয়।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, চীন কিন্তু এর জবাবে কোনো রণতরি বা ক্ষেপণাস্ত্র পাঠায়নি। তারা রেনমিনবিতে কেবল তাদের স্বাভাবিক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করছে।
বিশ্ববাসীর চোখে যখন ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে যে চারপাশের অন্যরা যেখানে দেশলাই হাতে ঘুরছে, সেখানে চীন ‘পরিণত ও দায়িত্বশীলের’ মতো উত্তেজনা প্রশমনের তাগিদ দিচ্ছে। প্রকৃত দায়িত্বশীলেরা কেউ খোঁচা দিলেই খেপে ওঠে না। তারা সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল থেকে সরে আসে না।
তারা সিএনএনের কোনো চটকদার শিরোনাম কিংবা অজ্ঞাতপরিচয় কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তার ‘মূল্যায়ন’-এর ওপর ভিত্তি করে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে না। চীনকে সহজে প্ররোচিত করা যায়—এমন ভাবনা আসলে নিছকই এক কল্পনা।
সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে যখন দাবি করা হয় যে ‘মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য’ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চীন ইরানকে অস্ত্র দিচ্ছে, তখন আমাদের কাছে প্রত্যাশা করা হয়, আমরা যেন এটাকে বেদবাক্যের মতো ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিই। কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না, এই একই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই একসময় ইরাকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ থাকার গল্প ফেঁদেছিল।
ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর ইতিহাস তাদের বেশ পুরোনো। মানুষের মতামত তৈরির কারসাজি এবং ফাঁস হওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা আখ্যানের এই যুগে, অজ্ঞাত কোনো কর্মকর্তার দাবি প্রমাণ হতে পারে না। বরং তা সংশয়ের সূচনা হতে পারে।
সর্বোপরি, চীনের নিজস্ব দাপ্তরিক বক্তব্যগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার এ অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে। তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সক্রিয় কোনো সংঘাতে লিপ্ত পক্ষগুলোকে চীন কোনো মারণাস্ত্র সরবরাহ করে না।
যুক্তিবাদী একটি বিশ্বে কোনো দেশের প্রকাশ্য ঘোষণার প্রতি ন্যূনতম সম্মান থাকা উচিত, বিশেষ করে যখন তাদের কথা ও কাজের মধ্যে মিল পাওয়া যায়।
এ ধরনের ঘোষণাকে সম্পূর্ণ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বেনামি গোয়েন্দা তথ্য আঁকড়ে ধরে বসে থাকা কোনোমতেই সাংবাদিকতা নয়; বরং এটি স্রেফ কোনো পক্ষের হয়ে ওকালতি করা।
যেকোনো ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের চেয়ে সত্য আসলে অনেক সহজ। আর সেটি হলো, ইরানকে অস্ত্র দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই চীনের নেই। এটি করলে তাদের লাভের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি এবং তা তাদের নিজেদের নীতিরও ঘোর পরিপন্থী।
নেলসন ওং সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত