বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫-এ ৮০ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫-এ ৮০ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন

মতামত

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ঘিরে কারা, কেন গুজব ছড়িয়েছিলেন

বাংলাদেশ এক গভীর জাতীয় শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোর ছয়টার দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই বেদনাবিধুর মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সমর্থকসহ সর্বস্তরের লাখো মানুষ একত্র হয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

অত্যন্ত আবেগঘন ও বিশাল এই জানাজার পর খালেদা জিয়াকে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে, জিয়া উদ্যানেই সমাহিত করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে নতুনভাবে রূপ দেওয়া এবং জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক অমোচনীয় ছাপ রেখে যাওয়া এক অনন্য জীবনের সমাপ্তি ঘটল।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীরভাবে একটি উদ্বেগজনক গুজব ছড়ানো হয়, যেখানে দাবি করা হয় যে বেগম খালেদা জিয়া নাকি আরও আগেই মারা গিয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁর মৃত্যুসংবাদ ‘পরে ঘোষণা’ করা হয়েছে। এই দাবি শুধু যে নির্জলা মিথ্যা তা নয়; বরং এটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং আমাদের সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষতি করে।

এমন অপপ্রচার আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যখন তা এমন একজন নারীর বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়, যিনি গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির পর জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট অর্জন করেন এবং কয়েক দশক ধরে জাতীয় ঐক্য, সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে ঘিরে গুজব ছড়ানো, বিশেষ করে একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে নিয়ে। এটি ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ নয়, এটি সামাজিক নাশকতা। এটি পরিবারকে অপমানিত করে, নাগরিকদের বিভ্রান্ত করে এবং জনপরিসরকে কলুষিত করে। আরও ভয়াবহ হলো, এটি এই ধারণাকে স্বাভাবিক করে তোলে যে রাজনৈতিক স্বার্থে মিথ্যা বলা গ্রহণযোগ্য।

একটি তথাকথিত ডানপন্থী গোষ্ঠী লাইফ সাপোর্ট ব্যবহারের বিষয়টি উদ্ধৃত করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। এটি হয় সচেতন বিকৃতি, নয়তো মৌলিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুতর অজ্ঞতার প্রকাশ। লাইফ সাপোর্ট ব্যবহৃত হয় গভীর অচেতন অবস্থায় হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে। এটি কোনোভাবেই মৃত্যুর ঘোষণা নয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসংখ্য নথিভুক্ত উদাহরণ রয়েছে, যেখানে মানুষ মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর লাইফ সাপোর্টে থেকেও সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। চিকিৎসা ও আইন, উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই একজন মানুষকে মৃত বলা যায় না, যতক্ষণ তার হৃৎস্পন্দন চলছে, রক্ত সঞ্চালিত হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে অক্সিজেন পৌঁছাচ্ছে।

বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও তা-ই সত্য ছিল। লাইফ সাপোর্টে থাকাকালে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র সচল ছিল, অঙ্গগুলো শারীরবৃত্তীয়ভাবে কার্যকর ছিল, এমনকি তিনি নিয়মিত ডায়ালাইসিসও নিচ্ছিলেন। তিনি জীবিত ছিলেন।

একই সঙ্গে এ ঘটনা আমাদের সামনে আরও একটি বড় ও ক্রমবর্ধমান সমস্যাকে উন্মোচিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার ও সহজলভ্য গুজব, ভ্রান্ত তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মতো জটিল ও মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত মিথ্যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আবেগ উসকে দেয় এবং জন–আস্থাকে দুর্বল করে, যেখানে দায়িত্বশীল যোগাযোগ ও মৌলিক তথ্যজ্ঞান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।

মৃত্যু একটি সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ও আইনি সিদ্ধান্ত। এটি কোনো রাজনৈতিক মতামত নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুমান নয়; এবং কখনোই দলীয় উসকানির হাতিয়ার হতে পারে না। যারা জেনে-বুঝে এই সীমারেখা ঘোলাটে করে, তারা শুধু রাজনৈতিক ভিন্নমতকেই নয়, নৈতিকতার সীমাও লঙ্ঘন করে এবং আধুনিক যোগাযোগপ্রযুক্তির বিপজ্জনক অপব্যবহার করে।

বিষয়টি কেবল রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়: যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে খালেদা জিয়ার মতো জাতীয়ভাবে সম্মানিত ব্যক্তিত্বকে অপমান ও মানবিক মর্যাদাহীন করা যায়, তবে আগামীকাল কোনো সাধারণ নাগরিকও নিরাপদ থাকবে না। এতে ভয়, বিশৃঙ্খলা ও গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সমাজের বুনন ও নৈতিক ভিত্তিকে ভেঙে দেয়।

এ ধরনের গুজবের ক্ষতি কোনো এক ব্যক্তি বা একটি পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজনৈতিক মেরুকরণের বেদনাদায়ক ইতিহাসবহুল বাংলাদেশে এ ধরনের অপতথ্য জনমনে ক্ষোভ, মানসিক যন্ত্রণা ও সমষ্টিগত হতাশা বাড়ায়। এটি এমন এক দুষ্টচক্রকে শক্তিশালী করে, যেখানে মিথ্যা বেঁচে থাকে, আস্থা ক্ষয় হয় এবং রাজনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে মৌলিক মানবিক শালীনতা বিসর্জন দেওয়া হয়।

যাঁরা খালেদা জিয়ার রাজনীতির সঙ্গে বা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে একমত নন, তাঁদেরও স্বীকার করতে হবে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবনের প্রতি সম্মান কোনো অবস্থাতেই আপসযোগ্য নয়। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনেই টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে নীতি, সত্যনিষ্ঠা, সংযম ও পারস্পরিক সহমর্মিতার ওপর। এই মূল্যবোধগুলো ভেঙে পড়লে রাজনীতি হয়ে ওঠে নির্মমতার মঞ্চ, মতাদর্শের প্রতিযোগিতা নয়।

কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে ঘিরে গুজব ছড়ানো, বিশেষ করে একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে নিয়ে, এটি ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ নয়, এটি সামাজিক নাশকতা। এটি পরিবারকে অপমানিত করে, নাগরিকদের বিভ্রান্ত করে এবং জনপরিসরকে কলুষিত করে। আরও ভয়াবহ হলো, এটি এই ধারণাকে স্বাভাবিক করে তোলে যে রাজনৈতিক স্বার্থে মিথ্যা বলা গ্রহণযোগ্য।

এই আচরণের নিঃশর্ত নিন্দা জানাতে হবে। নির্বাচিতভাবে নয়, নীরবে নয়; বরং দৃঢ় ও প্রকাশ্যে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সবারই দায়িত্ব এ ধরনের মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এ সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়; নীরবতা হলো সহ–অপরাধ।

  • ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার উপদেষ্টা, চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা, বিশ্বব্যাংক

*মতামত লেখকের নিজস্ব