সরকার নিয়োগ পরীক্ষায় ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর চার গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা ভাবছে। বাংলাদেশে ২০১৭ সালের শেষ দিক থেকেই কোটাবিরোধী মনোভাব জাগরিত হয়। তখন ডেইলি স্টার-এ এক লেখায় আমি যুক্তি দেখিয়েছিলাম যে সরকারি নিয়োগে কোটা এবং ভাইভা হচ্ছে বৈষম্যকরণের দুটি মোক্ষম হাতিয়ার।
২০১৮ সালে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। তখন এর সপক্ষেও একাধিকবার লিখেছি। আমার একটি ইংরেজি গ্রন্থেও কোটা ও ভাইভাবিরোধী লেখা রয়েছে। আজ কেউ যেন না ভাবেন যে রাজনৈতিক পছন্দ বা অপছন্দ থেকে নতুন সরকারের ‘ভাইভা মোটাতাজাকরণ’ উদ্যোগের বিরোধিতা করছি।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান স্লোগান ছিল সরকারি নিয়োগে বৈষম্যের বিরোধিতা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বহু সংস্কারের ওয়াদা করে শেষে রাখতে পারেনি। তবে সরকারি চাকরির ভাইভায় দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে বিধায় এর পরিধি ও তেজ কমিয়েছিল। বিসিএস পরীক্ষার মোট নম্বর ছিল ১১০০, যার মধ্যে ভাইভায় থাকত ২০০ নম্বর।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়োগপদ্ধতিকে আরও ‘স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক’ করার যুক্তিতে ভাইভার পরিধি ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ নম্বরে সংকুচিত করেছিল।
গত জুনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত করলেন যে বিসিএস পরীক্ষার ভাইভায় ইউনূস প্রবর্তিত সেই ১০০ নম্বরই রাখা হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি ‘স্বচ্ছতা ও অনিয়ম কমানোর কথা’ উল্লেখ করলেন। তিন মাস না যেতেই সরকার ভাইভার নম্বর চার গুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা এই বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাহলে কি সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর ‘স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার’ যুক্তি মাত্র তিন মাসেই মাঠে মারা পড়ল?
উপদেষ্টার যুক্তিতে ভাইভায় বেশি নম্বর থাকলে চাকরির সঙ্গে জুতসই মেধাবীকে টেনে তোলা যায়। একাডেমিক ফলাফল ও লিখিত পরীক্ষায় ভালো না করা কিঞ্চিৎ অপদার্থ ভাতিজাকেও যে ভাইভায় বেশি নম্বর থাকলে টেনে তোলা যায়, সে কথা কি উপদেষ্টা ভুলে গেলেন? আবার বিদ্বেষ থাকলেও একজন ভালো প্রার্থীকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বিদায় করা যায়, সে কথাই–বা উপদেষ্টা ভুললেন কী করে?
সরকারের নিয়োগপদ্ধতি যদি এ রকম স্ববিরোধী হয়, তাহলে একটি মেধাসম্পন্ন আমলাতন্ত্র গড়ে উঠবে কী করে? বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে একটি ‘মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ‘ভাইভার মোটাতাজাকরণ’ প্রকল্প এই প্রত্যয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
ভাইভার অপব্যবহার ঘটিয়ে দলীয় নিয়োগ বাড়ানোর অভিযোগ আওয়ামী আমলেও উঠেছিল। তখন ওই সরকারের একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা দলীয় ছাত্রদের সভায় গিয়ে তাঁদের সরকারি চাকরিপ্রাপ্তি নিয়ে চিন্তা না করতে উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘তোমরা খালি রিটেনটা পাস কোরো।’ এ নিয়ে মিডিয়ায় সমালোচনা হলে সেই উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলন করে নিজের কথার আরেক মাহাত্ম্য খাড়া করেন। উপদেষ্টাদের বাচালতায় সরকারের বিপদ ঘটে। এর আলামত এখনো শুরু হয়েছে।
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ীর এক গ্রামে আমার বাস। সব আমলেই দেখেছি সরকারদলীয় স্থানীয় নেতার বাড়িতে বেকার যুবকদের ভিড়। একটা সনদ নিতে হবে, যেখানে লেখা থাকবে, ‘এই রত্নটি একজন একনিষ্ঠ দলীয় কর্মী।’ শুনেছি এ-জাতীয় সনদ নাকি সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মহৌষধের ভূমিকা পালন করে থাকে। এতটা দলীয় কর্মীভিত্তিক প্রশাসন গড়েও কি শেষরক্ষা হয়? ক্ষমতার ভাগ্য তো জনতারই হাতে নির্ধারিত হয়ে থাকে।
ধরা যাক সরকারি কর্ম-কাঠামোর পুরোটাই, অর্থাৎ ১৪ লাখ কর্মচারীই আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির কর্মী। তাতেই কি সরকার শক্তিশালী হয়ে গেল? প্রতিবছর বেকারের জনস্রোতেই বের হয় ২২ লাখ মানুষ। এর মধ্য থেকে জাত-ধর্ম ও দলমত-নির্বিশেষে একটি মেধাবী ও দক্ষ জনবল সরকারি নিয়োগ পেলে দীর্ঘ মেয়াদে জাতিকে উৎপাদনশীল করা সম্ভব।
জাতি-ধর্ম, লিঙ্গ, আঞ্চলিকতা ও দলীয় আনুগত্যের পছন্দে কর্মী বাহিনী গড়ে তুললে সেখানে মেধার প্রশ্ন গৌণ হয়ে যায়। ফলে একটা মানহীন গড় মেধাসম্পন্ন বা ‘মিডিওকার’ চরিত্রের লোকবল জাতিকে পেছনে টেনে ধরে। যে দল অযোগ্যকে খাতির করে চাকরি দেয়, সে দলেরই সমূহ পতনের আয়োজন করে থাকেন স্বজনপ্রীতির বরপুত্রগণ। ছাগল-কাণ্ড তারই প্রমাণ।
তথ্য উপদেষ্টার দাবি অনুযায়ী ভাইভার আনুপাতিক পরিধি বাড়িয়ে চাকরির জুতসই প্রকৃত মেধাবী কর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাবে। ভাইভা বোর্ডের ওই পাঁচজন জ্ঞানী ব্যক্তি কি কোনো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন জহুরি যে তাঁরা মাত্র আধা ঘণ্টায় এক গুণধর রত্নকে চিনে ফেলবেন। এটি কি ‘ছাইচাপা আগুন’ আবিষ্কারের সদিচ্ছা, নাকি নিজেদের পক্ষপাতিত্ব জায়েজ করার একটা ঢাল? বিস্তর গবেষণা ভাইভাকে স্বজনপ্রীতি বা বর্ণবিদ্বেষের হাতিয়ার মনে করে থাকে। তাই এটিকে একেবারে তুলে না দিয়ে এর কঠিন সংস্কার করা হয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ায়।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটিতে কাজ করার সুযোগ হয়েছে একাধিকবার। চাকরিপ্রার্থীদের কী কী প্রশ্ন করা হবে, তা আমাদের মানবসম্পদ অফিস থেকে পাস করিয়ে নিয়ে আসতে হতো। সবাইকে এই এক সেট প্রশ্নের মধ্য দিয়েই বিচার করতে হবে এবং এর বাইরে একটি প্রশ্নও করা যাবে না। বিশেষ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আমাদের শেখানো হয়েছে—ভাইভার সময় কোনোরূপ বৈষম্যমূলক প্রশ্ন করা যাবে না। চাকরিপ্রার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস, রাষ্ট্রীয় পরিচয়, বয়স কিংবা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি—এর কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কারও চেহারা দেখে পছন্দ হয়ে গেলে সেটিও প্রকাশ করা যাবে না।
মিতব্যয়িতা ও দালিলিক প্রমাণের প্রয়োজনে আজকাল অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভাইভা নিয়ে থাকে। মানবসম্পদ কর্মকর্তা ভদ্রমহিলাটি বললেন, সব ইন্টারভিউ রেকর্ড করা থাকবে। ‘আমি বললাম, রেকর্ডের কী প্রয়োজন?’ মহিলা বললেন, ‘ভাইভাতে বৈষম্য করা হয়েছে’ এই অভিযোগে কেউ কখনো মামলা দিলে আমরা রেকর্ডকৃত ভাইভা আদালতে পাঠাতে বাধ্য। শুনে আমি ভয়ে জড়সড়।
সরকার যদি সত্যিই মেধাসম্পন্ন একটি কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে চায়, তাহলে ভাইভার সংস্কারকর্মে তার দুটি পথ খোলা রয়েছে। এক. ভাইভা একেবারে তুলে দেওয়া। দুই. ভাইভার নম্বর যথাসম্ভব কম রেখে এর আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম ভাইভার সময় কোনো বাঙালি প্রার্থী পেলেই উচ্ছ্বসিত হব না। কিংবা কাউকে দেখে যেন কোনোভাবেই আমার বিগলিত মন ধরা না পড়ে যায়। মনস্তত্ত্ববিদেরা এই ‘বিগলিত হয়ে যাওয়া’র স্বভাবকে অসচেতন পক্ষপাতিত্ব বা ‘আনকনশাস বায়াস’ বলে উল্লেখ করেছেন।
একবার জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা মৌখিক পরীক্ষাকে বৈষম্যকরণের হাতিয়ার বলে মিছিল করেছিলেন। কিন্তু লিখিত পরীক্ষা বৈষম্যকরণের হাতিয়ার কি না—এ নিয়ে কোনো মিছিল আমাদের নজরে আসেনি। অভিযোগ রয়েছে যে ভাইভা কাউকে অতিরিক্ত মানসিক চাপে নার্ভাস বা দুশ্চিন্তায় কাতর করে ফেলে। প্রশ্নকর্তারা অনেক সময় হয়ে পড়েন ‘জাজমেন্টাল’। নিজস্ব খাপের মধ্য থেকে অন্যকে বিচার করেন।
কখনো উত্তরদাতার ঘটে যায় ‘নিউরোডাইভার্জেন্স’ বা স্নায়ুগত বিক্ষিপ্ততা। দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে যখন বিজ্ঞ প্রশ্নকর্তারা পরীক্ষার্থীকে ‘চাঁদের ওজন’ কিংবা ‘রাশিয়ার আয়তন’ জিজ্ঞেস করে বসেন। আরব-বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার ভাইভার সময় গর্বাচেভের পেরেস্ত্রইকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু ব্যাংকের কর্মজীবনে ব্যালান্স শিট মেলাতে গিয়ে কোথাও ওই পেরেস্ত্রইকার সন্ধান পাইনি। শুধু ভাইভার তামাশা নিয়েই বাংলা সাহিত্যে এক বিশাল মহাকাব্য রচনা সম্ভব।
সরকার যদি সত্যিই মেধাসম্পন্ন একটি কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে চায়, তাহলে ভাইভার সংস্কারকর্মে তার দুটি পথ খোলা রয়েছে। এক. ভাইভা একেবারে তুলে দেওয়া। দুই. ভাইভার নম্বর যথাসম্ভব কম রেখে এর আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
ভারসাম্যপূর্ণ জ্ঞানী মানুষকেই বোর্ড মেম্বার করতে হবে। অতি উচ্চ বা অতি নিম্ন নম্বর দিলে ভাইভার প্রশ্নকর্তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। ভাইভার রেকর্ড থাকলে ভবিষ্যতে একজন সংক্ষুব্ধ মেধাবী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন। নিষ্ঠা ও সদিচ্ছা দিয়ে ভাইভার সংস্কার করলে সরকারি কর্মী বাহিনীর মেধা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে। দীর্ঘ মেয়াদে উপকৃত হবে অর্থনীতি।
ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব