আসিফ মো. শাহানের কলাম

সংসদের প্রথম অধিবেশন: গণতন্ত্রের যাত্রা কতটা ইতিবাচক হলো

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল এক অর্থে প্রত্যাশা, সম্ভাবনা এবং অনিশ্চয়তার এক সম্মিলিত প্রতিফলন।

২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক যাত্রার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তার প্রাথমিক দিকনির্দেশনা পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল এই অধিবেশন। কিন্তু আলোচনা প্রাণবন্ত থাকা সত্ত্বেও সংস্কার নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলো অনুচ্চারিত থেকে যাওয়ায় এ অধিবেশনকে পুরোপুরি সন্তোষজনক বলা কঠিন।

গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে—রূপান্তর এবং সংহতকরণ। একটি রাষ্ট্র গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করতে পারে, কিন্তু সেই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী বা স্থিতিশীল করতে না পারলে সেই যাত্রা টেকসই হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এই বাস্তবতারই সাক্ষ্য বহন করে।

১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পরও তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি; বরং সময়ের ব্যবধানে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিজ্ঞতা দেশকে নিতে হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের পরবর্তী সময়টিকে নতুনভাবে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সেই প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর কোনো রূপরেখা দিতে পারেনি।

সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে, যা একটি প্রাণবন্ত সংসদের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য যে গভীর ও কাঠামোগত আলোচনা প্রয়োজন ছিল—বিশেষ করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পুনর্গঠিত হবে, ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত হবে—সেসব প্রশ্নে স্পষ্টতা অনুপস্থিত ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার কতটা শক্তিশালী হওয়া উচিত? বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় আমরা দুই ধরনের চিত্র দেখেছি। একদিকে এমন সরকার ছিল, যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ হলেও নাগরিক অধিকার খর্ব করেছে।

অন্যদিকে এমন সময়ও এসেছে, যখন সরকার তুলনামূলক দুর্বল ছিল এবং ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নাগরিক অধিকার রক্ষা বা শাসন কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেনি।

এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্য কোথায় হবে—এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন। এর উত্তর নির্ধারণ করেই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু সংসদের আলোচনায় এই মৌলিক বিতর্কটি অনুপস্থিত ছিল।

এই অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা সংস্কার প্রসঙ্গটি দেখি। সংস্কার নিয়ে আলোচনায় সংস্কারকে প্রায়ই একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাস্তবে সংস্কার কোনো লক্ষ্য নয়; এটি একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে কার্যকর করা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই মৌলিক ধারণাটি রাজনৈতিক আলোচনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় সংস্কার প্রশ্নটি অনেক সময় বিমূর্ত ও অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।

এই অস্পষ্টতা সংসদে সরকারি দলকে সংস্কারসংশ্লিষ্ট সব আলোচনাকে উপেক্ষা করার বা সংস্কার আলোচনাকে তার মতো করে সাজানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে বিএনপির সংস্কারচিন্তা সব সময়ই একটি শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয় আর তাই দলটি ক্ষমতার পুনর্বিন‍্যাসের ব‍্যাপারে কখনোই উৎসাহী নয়।

বিরোধী দলের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গঠনের দাবি তুলছে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে জনগণের বাস্তব জীবনে পরিবর্তন আনবে, তা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। উদাহরণ হিসেবে মানবাধিকার কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশনের কথা বলা যায়। একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন থাকা প্রয়োজন—এটি একটি সাধারণ বক্তব্য। কিন্তু সেই কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করলে তার রিপোর্ট, অনুসন্ধান বা সুপারিশগুলো সংসদে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কীভাবে তা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে—এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর বিরোধী দলের কাছ থেকে পাওয়া যায় না।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটি সন্ধিক্ষণ নির্দেশ করছে। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই যাত্রা কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী করা যায়, তার ওপর। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সেই ভিত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি আংশিক সুযোগ তৈরি করলেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি।

ফলে সংস্কার প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের কাছে একটি দূরবর্তী আলোচনায় পরিণত হচ্ছে। যে মানুষটি স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, তার কাছে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কীভাবে বাস্তব পরিবর্তন আনবে, তা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা না গেলে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এই সংযোগ তৈরি না হওয়ায় সংস্কার প্রশ্নটি রাজনৈতিক অঙ্গনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

এদিকে সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব একটা ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি। অতীতে এমন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রায়ই একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে গেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গণতন্ত্র কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছা বা নৈতিকতার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। এটি টিকে থাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর, যেখানে ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং যে কেউ ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাকে সেই কাঠামোর মধ্যে থেকেই কাজ করতে হয়।

এ কারণেই চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থা, বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ, স্বাধীন সংস্থা—এসবই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। উদাহরণ হিসেবে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির নেতৃত্ব বিরোধী দলের হাতে থাকলে সরকারের আর্থিক কার্যক্রমের ওপর একটি কার্যকর নজরদারি তৈরি হতে পারে। একইভাবে একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন বা মানবাধিকার কমিশন থাকলে সেগুলোর তথ্য ও প্রতিবেদন সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব। কিন্তু এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে সুসংহত আলোচনা এখনো অনুপস্থিত।

চেক অ্যান্ড ব্যালান্স শুধু বিরোধী দলের জন্য নয়, সরকারের নিজের জন্যও প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন তার ওপর দলীয় ও রাজনৈতিক চাপ থাকে। দলীয় কর্মী বা সমর্থকদের বিভিন্ন প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় সরকার অনিয়ম বা দুর্নীতির দিকে ঝুঁকতে পারে।

এ অবস্থায় শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সরকারকে একটি ‘অজুহাত’ বা সুরক্ষা দিতে পারে। সরকার বলতে পারে যে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা অনৈতিক কাজ করতে পারছে না। এর ফলে একদিকে দুর্নীতি কমে, অন্যদিকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে।

অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কেবল গণতন্ত্রের জন্যই নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের টিকে থাকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একটি নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতাকাঠামো সরকারকে অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে রক্ষা করে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটি সন্ধিক্ষণ নির্দেশ করছে। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই যাত্রা কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী করা যায়, তার ওপর। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সেই ভিত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি আংশিক সুযোগ তৈরি করলেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি।

এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে খোলামেলা ও গভীর আলোচনা। সরকার কতটা শক্তিশালী হবে, কীভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে, কীভাবে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ধারণ করেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথরেখা তৈরি করতে হবে।

একই সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নটিকে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যাতে এটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান না হয়ে বাস্তব পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তা না হলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা আবারও একটি অসম্পূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হলে এখনই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।

  • আসিফ মোহাম্মদ শাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব