মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ নানা জায়গায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে
মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ নানা জায়গায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে

আলতাফ পারভেজের কলাম

মেয়াদোত্তীর্ণ রাজনীতির সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ

একটা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখা ও গড়ার স্বপ্ন বহু পুরোনো। শুধু বক্তৃতা বা সাহিত্যে নয়; সেই স্বপ্নের দাম হিসেবে হাজার হাজার মানুষ নানা সময় জীবন দিয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ এ রকম স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে পেশাজীবন গঠনের ব্যক্তিগত কর্তব্য ভুলেছেন। নিকটজনদের চাওয়া-পাওয়ার থেকেও দেশের কল্যাণ বড় হয়ে উঠেছিল তাঁদের কাছে।

অন্য অনেক দেশেও এ রকম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় সেই স্বপ্ন বারবার অধরা থেকে গেল। দেশপ্রেমিকদের আত্মবলিদান বৃথাই গেছে প্রতিবার। সে রকম আরেক পর্ব আবার পার হচ্ছে বাংলাদেশ। জীবিতরা মৃতদের রেখে যাওয়া কর্তব্যের ভার বইতে অক্ষম বলে মনে হচ্ছে। অবস্থাটা অভিনব নয়।

’৭১ ও ’৯০-এর পরও এ রকম ঘটেছে। শুধু স্বপ্নভঙ্গ নয়, শুধু যৌথ আশাবাদ ছিন্নভিন্ন হওয়া নয়—উল্টো, স্বপ্ন দেখার জন্য বহুজনকে বিস্তর মূল্য দিতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় মূল্য নিশ্চয়ই হৃদয়ের গভীরে আশার অপমৃত্যু এবং সম্ভাবনা ঝাপসা হয়ে যাওয়া। এর চেয়ে বড় সংকট, এ রকম আশাবর্জিত জীবনও যখন স্বাভাবিকভাবে যাপনের নিশ্চয়তা থাকে না। যখন মানুষ স্বাভাবিকভাবে কবরস্থ হওয়া বা শ্মশানে যাওয়ার নিশ্চয়তা খুঁজে পায় না চারপাশে। 

সম্প্রতি অনেক সংবাদ এ রকম অনুভূতি তৈরি করছে। ইংরেজি কাগজ নিউ এজ জানিয়েছে, গত ২০ মাসে নদ-নদী থেকে কেবল ৯ শতাধিক মৃতদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। সবচেয়ে বেশি মৃতদেহ পাওয়া গেছে ঢাকা অঞ্চলের নদীতে। ২০২১ সাল থেকে বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে যে এই সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে।

একই দিন বাংলা অনলাইন দৈনিক ভোরের কাগজ রিপোর্ট করেছে চলতি বছরের আট মাসে রাজধানীতে চাঁদাবাজির ৭২৩টি অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়েছে থানাগুলোতে। যেগুলোর তদন্ত হয়েছে, তার মধ্যে ৮৫ শতাংশ অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। উভয় ক্ষেত্রে  তথ্যের উৎস পুলিশ। 

বাংলাদেশের সমাজে বাস্তব অপরাধের একাংশমাত্র পুলিশি মনোযোগ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। মানুষ অনেক সময় অপরাধের শিকার হয়েও বাড়তি ঝামেলা এড়াতে অভিযোগ জানাতে কোনো দপ্তরে যায় না। সে ক্ষেত্রে এই প্রতিবেদনগুলোকে ভয়ংকর এক হিমশৈলীর চূড়া মনে হতে পারে। এ প্রশ্নও ওঠে, রাজধানী ও আশপাশে যদি এ রকম অবস্থা হয়, তাহলে দূরের গ্রাম-গঞ্জে কী ঘটছে?

আশুলিয়ার বিস্ফোরিত কিছু কিছু সিলিন্ডারের গায়ে লেখা ছিল, ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’। ঠিক তেমনি ২০২৪-এর আগের রাজনীতি দিয়ে আজকের বাংলাদেশকে চালানো যাবে বলে মনে হয় না। ফলে বলতে হয়, ‘লিডারস, ডু নট ট্রাই সেম পলিটিকস আফটার ২০২৪’। প্লিজ। 

হত্যা-খুন-রাহাজানি এ সমাজে নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দখল-বেদখল-লুণ্ঠনও নতুন হচ্ছে না। কিন্তু গত দুই বছরে এবং বিশেষভাবে সম্প্রতি একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে কেউ রাতে-দিনে যেকোনো সময় দলবদ্ধ হয়ে যে কারও জানমালের ওপর চড়াও হতে পারছে, ভাঙচুর চালাতে পারছে।

এ রকম ঘটার পর অপরাধের সপক্ষে নানান বয়ান হাজির করার লোকেরও অভাব হচ্ছে না। শত শত মাজার ও খানকা শরিফ ভাঙা থেকে শুরু করে তারকা কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙচুরের পক্ষে সাফাই গাওয়া মানুষের অভাব হচ্ছে না, যা গণনৈরাজ্য এবং গণবিকারগ্রস্ততার ইঙ্গিত দেয়।

একসময় আমরা ভেবেছি নির্বাচিত সরকার এলে নৈরাজ্য কমবে। বাস্তবে সে রকম ঘটেনি। কোথাও কোথাও অপরাধ ঘটছে পূর্বঘোষণা দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে। অনেক জায়গায় জুলুমের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। কোথাও কোথাও তারা পরে সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু ঘটনার সংখ্যা তাতে কমছে না। 

পুলিশ বাহিনী গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী মাসগুলোয় মনোবল ও জনবলের যে সংকটে পড়েছিল, তা থেকে কতটা উদ্ধার পেয়েছে, সেটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদারির পুঁজি নিয়ে কাজ করতে পারছে কি না, সে বিষয়েও গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে সম্প্রতি জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায়।

একটা অ-নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের প্রশাসনিকভাবে অনুমতি নিয়ে আয়োজিত সভা যেভাবে ‘আওয়ামী লীগের সভা’ ট্যাগ দিয়ে মিডিয়ায় প্রচার চালিয়ে পণ্ড হলো, তা রুখতে পারেনি নিরাপত্তা বাহিনী। পরে এই সভা থেকে আটককৃত সংখ্যাগরিষ্ঠকে যে ছেড়ে দেওয়া হলো, তাতেও প্রমাণিত হলো এ দেশে মানুষকে কত সহজে, অবলীলায় অপমান করা যায়। 

গত দুই বছরের মবের ইতিহাসে জাসদ অফিসের ঘটনা নব সংযোজন বলে অভিযোগ করছেন ওই দলের নেতারা ও অনেকে। কোনো প্রচারমাধ্যম তাৎক্ষণিকভাবে ওই ঘটনার সত্যাসত্য প্রকাশ করতে পারেনি বা সাহস পায়নি। এটাও উদ্বেগজনক।

দেশের নানা জায়গায় বিভিন্ন স্থাপনা হামলা ও দখলের ঘটনা ঘটছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে একটি বাড়ি দখলের অভিযোগ উঠে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে।

এসব ঘটনা স্পষ্ট জানাচ্ছে, গণনৈরাজ্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মিরপুরের টিকাদান কেন্দ্রের ঘটনাও প্রমাণ করে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানে হামলাকারী পুরোনো মবের ভিন্ন সংস্করণ এখন ভূসম্পদ দখলে ইচ্ছুকদের নবতর এক কাঠামোগত সংঘবদ্ধ চক্রে রূপ নিচ্ছে। যাতে আছে রাজনীতির সংযোগ। চাইলে এক্সক্যাভেটরও জোগাড় করতে পারছে।

প্রশ্ন হলো, পুলিশেরই কি দায় এসব গণনৈরাজ্য থামানো? ওসিদের বদলই কি সমস্যার প্রশাসনিক সমাধান? আমাদের রাজনৈতিক শাসকেরা কোথায়? সংসদ কোথায়? বিরোধী দল কোথায়? গণনৈরাজ্য থামিয়ে স্বপ্নের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে তারা কি আদৌ সমর্থ? 

সম্ভবত এটাই এ সময়ের প্রধান প্রশ্ন। বৈধ-অবৈধ, প্রকাশ্য ও নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দল কি বর্তমান অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে ন্যায়ভিত্তিক নিরাপদ পথে এগিয়ে নেওয়ার যোগ্যতা রাখে? তার কোনো প্রমাণ, আলামত ও আন্তরিক ইচ্ছা কি নাগরিক সমাজের সামনে হাজির আছে? 

সরাসরি দলীয় কর্মীরা বা সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী দল নিশ্চিতভাবে অনেক ইতিবাচক উদাহরণ হাজির করবেন। বাস্তবতা হলো ২০২৪-এর পর বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচার, সম্পদের ন্যায়ানুগ বণ্টন, জনস্বার্থে আইনকানুন-প্রশাসনের সংস্কারের যেসব ক্ষুধা তৈরি হয়েছে, সে ব্যাপারে মনোযোগী না হলে তা দিয়ে বর্তমান রাজনীতি টিকে থাকতে পারবে না। একই কারণে এই রাজনীতি সেসব সংস্কার করতেও ইচ্ছুক নয়।

গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন, র‌্যাব নামের অদলবদল, সংসদে স্থায়ী কমিটি গঠনের ধরন-ধারণ, খসড়া সাইবার আইনের অস্পষ্ট নানান বিপজ্জনক ধারা থেকে ইতিমধ্যে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে গেছে। এসব প্রতিটি ঘটনা একেকটা বার্তা। এসব বার্তা বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে বারণ করে। একাত্তর বলুন, চব্বিশ বলুন কোনো যুদ্ধের শহীদদের স্বপ্নের সাথি হতে পারছে না রাজনীতি। 

এ রকম সময়ে ‘সাধারণ’ মানুষ কী করবে? একটাই উপায় থাকে তার সামনে। একাকী বাঁচার গুহাজীবন খোঁজে তখন তারা। সেটাই চলছে এ মুহূর্তে। লাখ লাখ জনতার ভিড়ের মধ্যে থেকেও সবাই এখন একা একা। চব্বিশের জুলাইয়ের সময়ের সেই ঐকতান নেই কোথাও। চায়ের আড্ডায় ভাগাভাগি করে আশাবাদী হওয়ার মুহূর্তগুলো মিলিয়ে গেছে। 

২০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় বিস্ফোরিত কিছু কিছু সিলিন্ডারের গায়ে লেখা ছিল, ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’।

কিন্তু একাকী জীবনেও স্বাভাবিক শেষ অধ্যায়ের নিশ্চয়তা নেই। রাজধানীর কাছের আশুলিয়ায় ২০ সেপ্টেম্বর সিলিন্ডারভর্তি লরিতে বিস্ফোরণে যে ৮ জন মানুষ মারা গেলেন, তাঁদের পরিবারকে কে কী সান্ত্বনা দেবে? কেন তাঁরা মারা গেলেন? 

সরকার হয়তো বলবে এসব দুর্ঘটনায় সরকারের কী করার আছে? উত্তরটা হতে পারে আরেকটা প্রশ্ন। ২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হলো না কেন? এখানকার অনেক সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল এবং সেসব পরিবহন হচ্ছিল বিধিবহির্ভূতভাবে। অথচ এসব দেখার জন্য সরকারের একাধিক বিশেষায়িত সংস্থা আছে। তা ছাড়া ঘটনা শেষে দায়ীদের সম্পর্কে মামলাও হয়েছে।

এ ঘটনায় মরেছে সমাজের সাধারণ মানুষ। বিচারের গতি সে কারণে হয়তো ধীর। তবে বিনা অপরাধে এভাবে মৃত্যুর মিছিল রাজনৈতিক সরকারের আয়ু কমায়। অতীত তাই বলে। এ দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই সেই অতীত থেকে কিছু শিখতে ইচ্ছুক বলে মনে হয় না। এখানেই রাজনীতির সঙ্গে জনতার ব্যবধান। ব্যবধানের সে দেয়াল নতুন করে উঁচু হচ্ছে। কথা ছিল নিচু হওয়ার। 

আশুলিয়ার বিস্ফোরিত কিছু কিছু সিলিন্ডারের গায়ে লেখা ছিল, ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’। ঠিক তেমনি ২০২৪-এর আগের রাজনীতি দিয়ে আজকের বাংলাদেশকে চালানো যাবে বলে মনে হয় না। ফলে বলতে হয়, ‘লিডারস, ডু নট ট্রাই সেম পলিটিকস আফটার ২০২৪’। প্লিজ। 

মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের মতো মেয়াদোত্তীর্ণ রাজনীতিও বিপজ্জনক।

● আলতাফ পারভেজ: গবেষক ও লেখক

* মতামত লেখকের নিজস্ব