
বছরের পর বছর ধরে সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসলে কার্যকর হয় না। এসব নিষেধাজ্ঞা কোনো লক্ষ্যবস্তু হওয়া সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে না; উল্টো তা সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার কেবল বেড়েই চলেছে।
ফলে অতিনির্ভরশীলতার কারণে এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা দিন দিন লোপ পাচ্ছে। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ সেই অসাড়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই সংঘাত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে দুর্বল করার চলমান প্রক্রিয়াটিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। এটি ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার বিমুখতা, পণ্য বিনিময় (বার্টার) এবং হুন্ডির মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক খেলোয়াড়দের লেনদেনের পছন্দও বদলে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বিশ্ববাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলো লেনদেন করতে পারে না। কারণ ক্রেতা ও বিক্রেতারা মূলত ডলারের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান করে থাকেন।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যেও পণ্য বিনিময় চুক্তি আছে। ভারত এখন চালের বিনিময়ে তেল আমদানির কথা ভাবছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পপণ্যের বিনিময় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিটি পদ্ধতি ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে চলে, যার ফলে ডলারের সংশ্লিষ্টতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কোনো ভয় থাকে না।
তবে বিকল্প পেমেন্ট পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির বিস্তার এই সমস্যার সমাধানের পথ খুলে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে ইরান তার আর্থিক লেনদেনের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে শুরু করেছে।
ব্লকচেইন তথ্য প্ল্যাটফর্ম চেইন অ্যানালাইসিসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত পক্ষগুলোর কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রবাহ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
২০২৪ সালে যেখানে এর পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৯০০ কোটি ডলার, ২০২৫ সালে তা ৬৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ১৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রাপ্ত মূল্যের ৫০ শতাংশই গেছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কাছে, যার পরিমাণ ছিল ৩০০ কোটি ডলার।
ইরান এই ক্রিপ্টোকারেন্সি জমা করে সেগুলোকে চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে রূপান্তর করে। এরপর সেই অর্থ দিয়ে রুশ পণ্য কেনা হয় অথবা এশিয়ার বাজারগুলোতে বাণিজ্য পরিচালনা করা হয়। এভাবেই ইরান একটি বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে, যা রেনমিনবিকে শক্তিশালী করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ হয়তো এমন অনেক দেশ ও সংস্থাকে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলবে, যারা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়। তেহরান যখন বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তারা এই পথে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘ট্রানজিট টোল’ বা মাশুল দাবি করতে শুরু করে।
প্রতি ব্যারেলে অন্তত ১ ডলার করে এই মাশুল দিতে হতো বিটকয়েন অথবা রেনমিনবিতে। চেইন অ্যানালাইসিসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক জাহাজ এবং কোম্পানি সেই মাশুল পরিশোধ করেছে। টিথার বা ইউএসডিটির মতো স্টেবলকয়েন থেকে বিটকয়েন আলাদা। কারণ, এটি পুরোপুরি বিকেন্দ্রীকৃত এবং কোনো পক্ষ চাইলেই একে ‘ফ্রিজ’ বা আটকে দিতে পারে না।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে বিভিন্ন ট্যাংকারে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। এই প্রণালি যদি আবার খুলে দেওয়া হয়, তবে এর আংশিক মাশুল থেকেও বিপুল রাজস্ব আয় করা সম্ভব।
এখানে রেনমিনবির ব্যবহারও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চীন হলো ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা এবং তারা নিজস্ব মুদ্রায় এর দাম মেটায়। শুধু চীন নয়, অন্যান্য দেশও রেনমিনবি ব্যবহার শুরু করেছে। ২০২৪ সালে চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৩০ শতাংশই তাদের নিজস্ব মুদ্রায় সম্পাদিত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির এই মাশুল পদ্ধতি অনেক কোম্পানিকে রেনমিনবি ব্যবহারে উৎসাহী করেছে। কারণ, এর ফলে তারা ডলারের ওপর অতিনির্ভরশীলতার বিপদ টের পেয়েছে। যে দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ডলারে বাণিজ্যের অসুবিধা সহ্য করে আসছিল, তারা এখন সরাসরি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি প্রত্যক্ষ করছে। তারা দেখছে যে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র শত্রু-মিত্রনির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধে ডলারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
তবে এই বিকল্প আর্থিক কাঠামো কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা রেনমিনবিতে সীমাবদ্ধ নয়, এর নিচে রয়েছে আরও গভীরে প্রোথিত কিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা—যেমন হুন্ডি (হাওয়ালা) নেটওয়ার্ক এবং পণ্য বিনিময় বা বার্টারপ্রথা। এই যুদ্ধ ও অবরোধের ফলে এগুলো এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূলধারায় চলে আসছে।
হুন্ডি বা হাওয়ালা হলো শতাব্দীর পুরোনো এক ব্যবস্থা, যেখানে সশরীর অর্থ না পাঠিয়ে দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে লেনদেন করা হয়। ইরানের ক্ষেত্রে শেশেল কোম্পানি বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে দালালেরা লেনদেন সম্পন্ন করে, যাতে সরাসরি ইরানের নাম কোথাও না আসে।
এই প্রক্রিয়ায় কমিশন, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোরও একটি স্বার্থ কাজ করে; অর্থাৎ হুন্ডি কেবল ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করছে না; বরং আঞ্চলিক দেশগুলোকেও এই ব্যবস্থার অংশীদার করে তুলছে।
একইভাবে বর্তমান যুদ্ধ বিদ্যমান ‘পণ্য বিনিময়প্রথা’কে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। যেমন ২০২১ সালে ইরান ও শ্রীলঙ্কা একটি চুক্তি করেছিল, যেখানে শ্রীলঙ্কা তার ঋণ শোধ করছে চা রপ্তানির মাধ্যমে।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যেও পণ্য বিনিময় চুক্তি আছে। ভারত এখন চালের বিনিময়ে তেল আমদানির কথা ভাবছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পপণ্যের বিনিময় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিটি পদ্ধতি ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে চলে, যার ফলে ডলারের সংশ্লিষ্টতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কোনো ভয় থাকে না।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান এখন হরমুজ প্রণালিতে এই ‘বার্টার মডেল’ প্রয়োগ করতে পারে। সেখানে আদায়কৃত রাজস্ব বা টোলকে পণ্যে রূপান্তরিত করে তারা এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে পৌঁছে দিতে পারে। এভাবে যুদ্ধের এক ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতা (চেকপয়েন্ট) বিশ্ব অর্থনীতির একটি বিকল্প বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
অবশ্যই ডলারের আধিপত্য রাতারাতি শেষ হয়ে যাবে না। বিশ্বের ৮০ শতাংশ তেল কেনাবেচা এখনো ডলারে হয় এবং বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ৫৭ শতাংশই হলো ডলার। সেই তুলনায় রেনমিনবি মাত্র ২ শতাংশ।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে যা ঘটছে, তাকে সরাসরি স্থলাভিষেক না বলে বরং ডলারের ক্রমক্ষয় বা ক্ষয়িষ্ণুদশা বলা যেতে পারে। এই যাত্রার শেষ কোথায় তা অনিশ্চিত হলেও, পথটি যে ফেরার নয়, তা স্পষ্ট হচ্ছে।
ডি-ডলারাইজেশন, হুন্ডি নেটওয়ার্ক এবং পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা—এসব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধকৌশলের গভীরে একধরনের স্ববিরোধিতা ধরা পড়েছে। যুদ্ধের নির্মাতারা যা কল্পনাও করেননি, তা–ই ঘটছে। ইরানের পরিকাঠামো ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে এটি আরও আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে, যাকে বিশ্লেষকেরা বলছেন ‘অ্যাক্সিস অব ইভেশন’ বা এড়ানোর অক্ষ।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হয়তো ইরান রাষ্ট্রটি হবে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে বর্তমানের নিষেধাজ্ঞার এই বৈশ্বিক পদ্ধতি। এর ফলে বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত ডলারের যে একচ্ছত্র আধিপত্য, তার কবরও রচিত হতে পারে।
ড. আলী এ গারে দাগি লেখক ও গবেষক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত