সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। নানা বয়সের মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে আত্মহত্যা করেছেন ৭৬ হাজার ৩৬১ জন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে প্রতিবছর আত্মহত্যা করে মারা যাচ্ছেন ৭ লাখ ২০ হাজার মানুষ। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, কিশোর, যুবক-যুবতীরা আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছেন বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরেকটি প্রতিবেদনে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর জন্য আত্মহত্যাকে তৃতীয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আত্মহত্যার মনোতত্ত্বগত দিক নিয়ে কাজ করেছেন সিগমন্ড ফ্রয়েড ও ড. ইগোর গালেনকা। ডেভিড এমিল ডুরখেইম আত্মহত্যার সমাজতাত্ত্বিক দিক নিয়ে গবেষণা করেছেন।
ফ্রয়েডের মতে, আত্মহত্যা মূলত নিজের ভেতরের অবদমিত ক্ষোভ, আগ্রাসন বা অন্যের প্রতি থাকা তীব্র রাগ নিজের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চরম বহিঃপ্রকাশ। ফ্রয়েড মনে করতেন, কোনো মানুষ সরাসরি নিজেকে শেষ করার মানসিক শক্তি পান না, যদি না এর পেছনে গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব জড়িয়ে থাকে।
আমেরিকান মনোরোগবিশেষজ্ঞ ও মাউন্ট সিনাই সুইসাইড প্রিভেনশন রিসার্চ ল্যাবরেটরির পরিচালক ড. ইগোর গালেনকার মতে, আত্মহত্যা কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে হঠাৎ করে ঘটে না। এটি মূলত একজন মানুষের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক দুর্বলতা ও তীব্র মানসিক সংকটের এক জটিল ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল। ড. গালেনকা ও তাঁর গবেষক দল দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় গবেষণার পর আত্মহত্যার মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে ‘ন্যারেটিভ-ক্রাইসিস মডেল’ নামে চার ধাপের একটি থিওরি দাঁড় করিয়েছেন। দুনিয়াজুড়ে আত্মহত্যাকেন্দ্রিক আলোচনায় এ থিওরি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই থিওরি অনুযায়ী, আত্মহত্যার কারণগুলো হলো—১। ক্রনিক যার পেছনে রয়েছে মূলত শৈশবের কোনো ট্রমা বা মানসিক আঘাত। ২। তীব্র মানসিক চাপযুক্ত জীবন। ৩) সাব-অ্যাকিউট সুইসাইডাল ন্যারেটিভ—যেখানে ব্যক্তি নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মনে মনে একটি নেতিবাচক গল্প বা ধারণা তৈরি করে।
ড. গালেনকার মতে, সুইসাইডাল ন্যারেটিভ বা আত্মহত্যার নেতিবাচক মানসিক গল্পটি ব্যক্তির ভেতর তার সত্তা সম্পর্কে অর্থহীন ধারণা তৈরি করে। এই পর্যায়ে ব্যক্তি তার জীবনের কোনো সমাধান খুঁজে পায় না এবং ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত মনে করে। ৪) সুইসাইড ক্রাইসিস সিনড্রোম হলো আত্মহত্যার চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে তীব্র ধাপ, যা মানুষকে সরাসরি হননের দিকে ঠেলে দেয়।
এ প্রবণতা কাউকে পেয়ে বসলে মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে অতিরিক্ত উত্তেজনা ও তাৎক্ষণিকতার মধ্যে পড়ে সামাজিকভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করতে থাকে এবং নিজেকে শেষ করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। ড. গালেনকার মনে করেন, আত্মহত্যা একটি চিকিৎসাগত সমস্যা। উপযুক্ত সময়ে সঠিক চিকিৎসা করা গেলে আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম মনস্তাত্ত্বিক দিকের চেয়ে সামাজিক দিককে আত্মহত্যার অগ্রগণ্য দিক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর সুইসাইড–সম্পর্কিত গবেষণার মূল বিষয় হলো আত্মহত্যা কেবল আবেগ বা মনস্তাত্ত্বিক ডিসঅর্ডারের কারণে ঘটে না বরং এর গভীরে রয়েছে সামাজিক বাস্তবতা। তিনি গবেষণায় দেখিয়েছেন, দুটি সূচক মূলত আত্মহত্যার প্রবণতাকে নির্ধারণ করে—১. সামাজিক সংযুক্তির সংকট (ব্যক্তি কতটা সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে) এবং ২. নৈতিক নিয়ন্ত্রণ (সমাজ ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ কতটা নিয়ন্ত্রণ করে)।
ফ্রয়েড, গালেনকা ও ডুরখেইমের তত্ত্ব বাংলাদেশ পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা লক্ষ করা যাবে। এক. দীর্ঘ অপশাসন নির্যাস যা জাতীয় হতাশা তৈরি করেছে। যেসব দেশে দীর্ঘ অপশাসন, স্বৈরশাসন বা ফ্যাসিস্ট শাসন চলেছে, সেসব দেশগুলোতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সম্পর্ক বা বন্ধন শিথিল হয়েছে। অর্থাৎ সামাজিক পরিসর থেকে ব্যক্তি ক্রমেই নিঃসঙ্গ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে ব্যক্তি সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারায় তার প্রান্তিকীকরণ চরম মাত্রায় পৌঁছে।
তবে অপশাসনে অভিঘাতে সব ব্যক্তি সমানভাবে প্রান্তিক হয় না। স্বৈরশাসন বা ফ্যাসিস্ট শাসকেরা দেশব্যাপী তাঁদের শাসনের উপযোগী একটি শ্রেণি তৈরি করেন, যারা সুবিধাভোগী শ্রেণি। ফ্যাসিস্ট শাসকদের ইকো চেম্বারের সঙ্গে তাদের সংযোগ থাকে। তাদের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর সম্পর্ক ক্লায়েন্ট-প্যাট্রোনের মতো। এটি একটি বিস্তৃত অনুগত জনমানস। তাদের ভেতর হতাশা নেই, আত্মহত্যার প্রবণতাও নেই। বৃহৎ অর্থে তাদের মনস্তত্ত্ব স্বার্থনির্ভর ও কলুষিত মনস্তত্ত্ব।
একটি ফ্যাসিস্ট শাসনের সঙ্গে সবাই অভিযোজন করতে পারে না। এ কারণে সমাজে সুবিধাভোগী ও অধিকারহীন দুটি শ্রেণি তৈরি হয়। এ অধিকারহীন শ্রেণি হলো হতাশা আর প্রতিরোধের আধার। যতক্ষণ জীবনীশক্তি থাকে, ততক্ষণ তারা প্রতিরোধে থাকে। আর জীবনীশক্তি শেষ হলে হতাশায় নিমজ্জিত হয়।
ডুরখেইম যেটাকে বলেছেন সামাজিক সংযুক্তির সংকট, আজ সে সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ব্যক্তি সামাজিক বলয় থেকে ক্রমেই ছিটকে পড়ে একা হয়ে উঠছে। এ একাকিত্ব তাকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত জীবন ও জীবিকার সংকট ক্রমেই কঠিন পড়ছে। জীবিকার সংকট যেখানে তীব্র, সেখানে জীবনের অস্তিত্ব স্বাভাবিক হতে পারে না। এ পরিস্থিতি আত্মহত্যার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।
বর্তমান ঢিলেঢালা শাসন তরুণ বা বয়স্ক কেউ নিতে পারছেন না। তাঁদের সামনে কোনো উন্নত বিকল্পও নেই। আত্মহত্যা কেবল মানসিক, আবেগীয় বা নিছক সামাজিক বিষয় নয়। এর গভীরে রয়েছে রাজনীতি, একে রাজনৈতিক লেন্স দিয়েই দেখতে হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আত্মহত্যা প্রবণতার সঙ্গে বিদ্যমান অপরাজনীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ, অপরাজনীতি মানেই অপশাসন। অপশাসন মানেই অব্যবস্থাপনা, অন্যায্য, ক্লেদ, ঘৃণা আর হতাশা—যেগুলো হলো আত্মহত্যার দুহিতা।
আত্মহত্যা একধরনের অসুস্থতাজনিত চয়েস। যাঁদের ভেতর এ প্রবণতা দেখা যাবে, তাঁদের প্রতি বাড়তি মনোযোগী হতে হবে। এখানে যেহেতু সেই অর্থে প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো দাঁড়ায়নি, তাই প্রতিবেশী, পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুত্বদের এগিয়ে আসতে হবে। আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তির মনে আশার ছবি টাঙিয়ে দিতে হবে। একগুচ্ছ মানবিক হাত পারে একটি সংকটাপন্ন জীবন রক্ষা করতে। জীবন সুন্দর, জীবনের স্বাদ সুন্দরতম।
আজ নাগরিকদের মধ্যে অধিকারহীনবোধ তীব্র হতাশা তৈরি করছে। বিশেষ সিস্টেম বা অভিভাবকত্ব কোনোটিই এখানে যথাযথভাবে কাজ করছে না। যার কারণে ব্যক্তির ওপর বিশেষ চাপ তৈরি হয়েছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও চাকরির ধরনে ব্যাপক পরিবর্তনে এসেছে।
এ পরিবর্তনের সঙ্গে সবাই সমানভাবে খাপ খাওয়াতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে দক্ষতার সংকট, রয়েছে মামা-চাচা বা খালু না থাকার সংকট। সিস্টেম যথাযথভাবে চললে এবং মানুষ ন্যায্য ট্রিটমেন্ট ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা পেলে অবশ্যই তা উপভোগ করবে। জীবন মহামূল্যবান তা ছেড়ে দেওয়ার বা ত্যাগের বিষয় নয়। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি যা সৃষ্টি করে না, তা ছেড়ে দিতে পারে না।
অভিভাবকত্ব প্রসঙ্গ যেটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হওয়ার পর প্রতিবছর দেখা যায় ফেল করার কারণে বা প্রত্যাশিত ফলাফল করতে না পারায় কিছু শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। এত ঠুনকো কারণে আত্মহত্যা মানা যায় না। এখানে শিক্ষার্থীদের ওপর যে বাড়তি চাপ, তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার থেকেই তৈরি করা হয়। একজন শিক্ষার্থীর ফেল বা প্রত্যাশিত ফলাফল করতে না পারার কারণ কেবল শিক্ষার্থী নয়, এর পেছনে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সার্বিক সীমাবদ্ধতা।
ডুরখেইম আত্মহত্যার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে যেটা উল্লেখ করেছেন, তা আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সাজুয্যময়। কথা হলো, সমাজে নৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে।
একটি জাজ মেন্টাল সমাজের ভেতর আমরা প্রবেশ করেছি। পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিচারালয় হয়ে উঠেছে। শুদ্ধ–অশুদ্ধ, সত্য-অসত্য, ঠিক-ভুল এ তীব্র প্রবাহ চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘিরে। পরিশুদ্ধ কনটেন্টের চেয়ে ক্লেদ বা ঘৃণাঘন কনটেন্টের আধিক্য লক্ষ করা যাচ্ছে। গালিগালাজ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হেয়করণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ভার্চ্যুয়াল এসব ক্লেদ ও সহিংসতা ভার্চ্যুয়াল থাকছে না, রিয়েল জগতে নেমে পড়ছে, তৈরি করছে হানাহানি ও সহিংসতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও ভিন্নমতের মানুষদের হেয় বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে উঠছে, যা ব্যক্তির আত্মমর্যাদা সংকটাপন্ন করে তুলছে। ব্যক্তি যখন অনুভব করছে তার মর্যাদা বা ভাবমূর্তি সুরক্ষিত নয়, তখন সে শূন্যতা অনুভব করছে, হননের পথ বেছে নিচ্ছে।
ডুরখেইম তাঁর তত্ত্বে আরও উল্লেখ করেছেন, ব্যক্তি যখন মনে করে তার স্বাধীনতা অবধারিত বা লিমিটলেস (ভোগের আর কিছু নেই), তখন সেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়; অন্যদিকে, যখন সে আবার মনে করে তার স্বাধীনতা বলে কিছু নেই, তখন সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যক্তির স্বাধীনতার সংকোচন আত্মহত্যার পথ তৈরি করে।
ফ্রয়েড, গালেনকা ও ডুরখেইমের তত্ত্বে আবেগ, মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক কারণ তুলে ধরা হলেও যোগাযোগ কলার বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। আত্মহত্যা হলো যোগাযোগের এক শূন্য পয়েন্ট। জনসমাজ থেকে ক্রমেই সরতে সরতে ব্যক্তির একক হয়ে পড়ার শেষ বিন্দু। মূলত যোগাযোগ শূন্যতা আত্মহত্যার এক বিশেষ পরিস্থিতি।
অন্যদিকে হতাশা, বিক্ষুদ্ধতা, ক্ষোভ, ভয়, আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা আত্মহত্যার বিশেষ রসায়ন। এ রসায়ন তৈরি হয় অসম ও অস্বাভাবিক যোগাযোগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। যিনি যোগাযোগের স্বাভাবিক প্রবাহের ভেতর থাকেন, তিনি আত্মহত্যাপ্রবণ হতে পারেন না।
আত্মহত্যা একধরনের অসুস্থতাজনিত চয়েস। যাঁদের ভেতর এ প্রবণতা দেখা যাবে, তাঁদের প্রতি বাড়তি মনোযোগী হতে হবে। এখানে যেহেতু সেই অর্থে প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো দাঁড়ায়নি, তাই প্রতিবেশী, পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুত্বদের এগিয়ে আসতে হবে। আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তির মনে আশার ছবি টাঙিয়ে দিতে হবে। একগুচ্ছ মানবিক হাত পারে একটি সংকটাপন্ন জীবন রক্ষা করতে। জীবন সুন্দর, জীবনের স্বাদ সুন্দরতম।
খান মো. রবিউল আলম যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক