লেবানন যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের দাবিগুলো বেশ সাদামাটা। ১৯৮২ সাল থেকে তারা হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই করছে। প্রথমে টানা ১৮ বছর লেবাননের ভেতরে এবং এরপর দুই দশক ধরে নিজেদের ভূখণ্ড থেকেই এই লড়াই চলছে।
ইসরায়েলিদের ক্ষোভ মেটানোর জন্য লেবানন একটি নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু। দেশটির সামরিক বাহিনী অত্যন্ত দুর্বল। খ্রিষ্টান, সুন্নি ও শিয়া মুসলিমদের মধ্যকার ক্ষমতার টানাপোড়েন লেবাননের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দীর্ঘকাল ধরে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে লেবাননের ভূখণ্ডে হানা দেওয়ার ছুতা খোঁজে ইসরায়েল।
তবে লেবাননের ওপর বর্তমান আগ্রাসনের কারণগুলো শুধু কৌশলগত নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ইসরায়েলের ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্যে একটি জরুরি রাজনৈতিক ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরার প্রবল তাগিদ থেকেই লেবাননে হামলা চালানো হচ্ছে।
হামাস বা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো বড় জয় অর্জন তো দূরের কথা, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এখন পর্যন্ত নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সরাসরি ইরানের সঙ্গে দর-কষাকষি করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সব বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অবহিত করলেও গাজায় ইসরায়েল দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারায় ট্রাম্প সম্ভবত ইসরায়েলের পরামর্শে তেমন কান দিচ্ছেন না। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাও এখন থমকে আছে এবং গাজার বেশ কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ এখনো হামাসের হাতেই রয়ে গেছে।
ইসরায়েল দাবি করছে যে হিজবুল্লাহকেও হামাসের মতো সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করতে হবে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, লেবানন ও গাজাকে স্থায়ীভাবে দখল করতে পারলেই কেবল এটি সম্ভব। কিন্তু দখলদারত্ব কোনো সাধারণ সামরিক অভিযান নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। দখলদারত্ব মানেই হলো প্রতিদিনের প্রাণহানি ও নিজেদেরই দীর্ঘস্থায়ী শোষণের জঘন্য এক রাজনৈতিক পাঁকে ফেলে দেওয়া।
এত কিছুর পরও নেতানিয়াহু এমন এক নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি গড়তে চান, যিনি ইসরায়েলের ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। যেহেতু ইরান ধীরে ধীরে তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে এবং গাজা আন্তর্জাতিক নজরদারির বিষয়ে রূপ নিয়েছে, তাই নিজেকে বিজয়ী প্রমাণ করার একমাত্র ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে লেবানন।
গাজার ব্যর্থতা ঢাকতেই নেতানিয়াহু এখন উত্তর সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহর এক কল্পিত আক্রমণের গল্প সাজিয়েছেন, যেন আগামী নির্বাচনে তিনি ভোটারদের নিরাপদ জীবনের ভুয়া প্রতিশ্রুতি ফের বিক্রি করতে পারেন।
লেবাননের এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। গাজায় ব্যবহৃত কায়দাটিই তারা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যবহার করছে। সেখানে শিয়া–অধ্যুষিত গ্রামগুলোকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ বাসিন্দাদের বৈরুতের দিকে পালাতে বাধ্য করা হয়েছে। এরপরও যারা থেকে যাবে, তাদের হিজবুল্লাহ কর্মী তকমা দিয়ে নির্দ্বিধায় হত্যার নীলনকশা এঁকেছে ইসরায়েল। লেবাননের সাধারণ মানুষের অমূল্য জীবনকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের এই নিষ্ঠুর পরিকল্পনা ইসরায়েলি রাজনীতিকদের জন্য লাভজনক হয়ে উঠেছে।
পুরো বিশ্বের চোখ এখন ইরান ও হরমুজ প্রণালির দিকে, আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল লেবাননে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলে। এই সামরিক দাম্ভিকতায় ভর করে নেতানিয়াহু হয়তো নিজের ক্ষমতা আবারও ধরে রাখবেন। কিন্তু একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, দক্ষিণ লেবাননে বিপুল পরিমাণ সেনা ঢোকালেও ইসরায়েল এখনো ১৯৮২ সালের মতো সর্বাত্মক কোনো আগ্রাসন চালায়নি।
ঠিক একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও এখন পর্যন্ত ইরানের মাটিতে হামলা করার উদ্যোগ নেয়নি। দুটি দেশই ভালোভাবে জানে, যেকোনো সরাসরি সর্বাত্মক আক্রমণের চরম মূল্য শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই চুকাতে হয়। সম্ভবত সেই উপলব্ধি থেকেই এই ভয়াবহ বিপর্যয় পুরোপুরি রুখে দেওয়ার ক্ষীণ আশাটুকু এখনো জিইয়ে রয়েছে।
ওরি গোল্ডবার্গ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত