মহিউদ্দিন আহমদের কলাম

নির্বাচনকে নৈতিক বৈধতা দিতে হলে...

নির্বাচনের আর মাসখানেক বাকি। এখন চলছে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার কাজ। সেই সঙ্গে চলছে দলগুলোর মধ্যে জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনটি পেরিয়ে গেলে বোঝা যাবে, কে কোথায়। কারা শেষ পর্যন্ত থাকছেন, কারা বাদ পড়ছেন, আর বিদ্রোহী হচ্ছেন কারা।

এবারের নির্বাচনটি ঘিরে উৎসাহ ও আশঙ্কা দুই–ই আছে। অনেক দিন পর একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখানে ভোটাররা বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে আশা করা যায়। গত তিনটি নির্বাচন হয়েছিল ভোটার ছাড়াই। ক্ষমতাসীনেরাই ঠিক করে দিয়েছিল জাতীয় সংসদের আসনবিন্যাস। নির্বাচন পরিণত হয়েছিল তামাশায়। এবার অন্য রকম হবে বলেই আশা করি।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচনের যুগে আমরা প্রবেশ করেছিলাম ১৯৯১ সালে। শুরুতে ছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অন্তর্বর্তী সরকার। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজিত হলো আমাদের সংবিধানে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে দেখা গেছে, কোনো দল পরপর দুটি নির্বাচনে জয়ী হয়নি। এখানে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর’। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ভোটারদের অনাস্থা।

একটি দলের বা জোটের সরকার যদি পাঁচ বছর দেশ চালায়, তারা অনেক ভালো কাজ করলেও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে না। মানুষ খারাপ কাজগুলোকেই বেশি মনে রাখে। ফলে অখুশি ভোটাররা ক্ষমতাসীন দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বিরোধী দলকে ভোট দেন। প্রায় সমশক্তির দুটি দল থাকলে ভোটারদের সামনে একটা ‘চয়েস’ থাকে। তাঁরা একটিকে অন্যটির বিকল্প মনে করেন।

নতুন দলটি ক্ষমতায় এসে কিছু ভালো কাজ করে নজর কাড়ে। তারপর আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসে। একের পর এক খারাপ কাজ করতে থাকে। তখন ভোটাররা অনেকেই এই দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে পুরোনো দলটিকেই আবার বেছে নেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে আমাদের দেশে যে দ্বিদলীয় রাজনীতি চলে এসেছে, সেখানে ভোটারের ইচ্ছা বড় দুই দলের দিকেই পেন্ডুলামের মতো ঘোরে।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর নির্বাচনী ব্যবস্থাটি হোঁচট খায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে একটি দল সারা জীবন সরকার চালানোর ক্ষমতা কবজা করে নেয়। নির্বাচনের মাধ্যমে এক দলকে সরিয়ে অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে ভোটারের যে স্বাধীনতা ছিল, সেটি কেড়ে নেওয়া হয়।

‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা ক্ষমতাসীনদের ওপর অনাস্থা জানানোর যে অস্ত্রটি ভোটারের হাতে ছিল, তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ফলে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। আমরা এমন একটা আজব সংসদ পাই, যেখানে সরকারি দল ঠিক করে দেয় কারা হবে বিরোধী দল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নিরুত্তাপ নির্বাচনে ভোটারের আগ্রহ থাকে না। এমনকি সরকারি দলের সমর্থকেরাও ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহ পান না। তাঁরা ধরেই নেন, তাঁরা জিতে গেছেন।

এবারের নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রশ্ন হলো, অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা কী বুঝি? এর দুটি দিক আছে। একটি হলো সব দলের অংশগ্রহণ। অন্যটি হলো অধিক হারে ভোটারের অংশগ্রহণ। এত দিন ধরে আমরা যে ‘ক্লাসিক’ দ্বিদলীয় রাজনীতির আশপাশে ঘুরপাক খেয়েছি, সেই পরিস্থিতি আর নেই।

একটি দল—আওয়ামী লীগ—দৃশ্যপটে নেই। সাড়ে ১৫ বছর একনাগাড়ে ক্ষমতার চর্চা করে দলটি সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো আমাদের কাঁধে চেপে বসেছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সেটি কুপোকাত হয়েছে। দলের প্রথম সারির বেশির ভাগ নেতা পালিয়ে গেছেন। দলটির কপালে জুটেছে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা। তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং তারা আর নির্বাচনের রেসে নেই।

আগামী নির্বাচনে যদি ভোটার উপস্থিতি একটা সম্মানজনক পর্যায়ে থাকে, তাহলে বলা যাবে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি যদি চোখে পড়ার মতো কম হয়, তাহলে নির্বাচনটির নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

তবে যত খারাপই হোক, এ রকম একটা বড় দল যেহেতু নির্বাচনের বাইরে থাকছে, তার নৈতিক বৈধতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৮০-এর দশকে এরশাদের আমলের দুটি নির্বাচন এবং হাসিনার আমলের শেষ তিনটি নির্বাচনকে নির্বাচন কমিশন, সরকার এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বৈধতা দিলেও নৈতিক বৈধতা পায়নি। এর একটি প্রধান কারণ ছিল বিপুলসংখ্যক ভোটারের অনাগ্রহ ও অনুপস্থিতি।

একটা দৃশ্য কল্পনা করা যাক। একটি কেন্দ্রে ভোটার আছেন এক হাজার। দেখা গেল, ভোটার উপস্থিতি দেড় শ। এক প্রার্থী পেলেন ১৩০ ভোট, অন্যরা সবাই মিলে পেলেন ২০ ভোট। ভোটের হিসাবে ১৩০ ভোট পাওয়া প্রার্থী জিতেছেন ঠিকই। কিন্তু যে নির্বাচনে ৮৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে যাননি বা ভোট বর্জন করেছেন, সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে তাকে যতই জায়েজ করা হোক না কেন, ১৩০ ভোট পাওয়া ব্যক্তির নির্বাচিত হওয়ার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। গত তিনটি নির্বাচনে আমরা এই ছবি দেখেছি। যদিও নির্বাচন কমিশন ও একশ্রেণির গণমাধ্যম ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে বেশি ভোট পড়ার খবর প্রচার করেছে।

একটা যুক্তি প্রায়ই শোনা যায়, নব্বই-পরবর্তী কয়েকটি নির্বাচনে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল খুব কম। বলা হয়ে থাকে, দল দুটোর প্রতিটিই এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করে। বাকিটা অনিশ্চিত বা ‘সুইং’ ভোট। তাহলে এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের ইচ্ছার প্রতিফলন হবে কীভাবে?

এখানে কিছু ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’ আছে। ধরা যাক একটি দল একটি নির্বাচনে ৩৩ শতাংশ ভোট পায়। তাহলে কি ধরে নেব, ওই ৩৩ শতাংশ ভোটার দলটির সমর্থক? বিষয়টি অত সরল নয়। এখানে আছে ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ ফ্যাক্টর। হয়তো ওই ভোটারদের অনেকেই ক্ষমতাসীনদের ওপর রাগ করে বিকল্প হিসেবে অন্য একটি দলকে বেছে নেন। অর্থাৎ একটি দলের ‘নিশ্চিত’ ভোটার কত শতাংশ, সেটি বলা কঠিন। সেটি ২৫ শতাংশ হতে পারে, আবার ৫ শতাংশও হতে পারে। আমরা অনেকেই আন্দাজের ওপর কথা বলি। একটা ভালো মানের জরিপ ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না।

একটা পর্যায়ে এসে আওয়ামী লীগের মনে হয়েছিল, তারা ভোটে জিততে পারবে না। নিজেদের ও ভোটারদের ওপর আস্থা থাকলে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনের বিধান বাতিল করত না, জনপ্রিয়তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করত। তারা সেই চ্যালেঞ্জ নিতে চায়নি। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে তারা নির্বাচনী ফলাফল ইচ্ছেমতো সাজানোর পথে গেছে। তিনটি নির্বাচন তারা নানা কৌশলে পার করেছে।

শেষমেশ ভরাডুবি হয়েছে। জনপ্রিয়তার পারদ কতটা নিচে নেমে গেলে দলের প্রধান নেতা তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে পালিয়ে যান? যেদিন তিনি গোপনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে উড়াল দেন, সেদিন অনেকেই ছিলেন রাজপথে, আর অন্যদের চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। পাহাড়সম জনপ্রিয়তার দাবিদার নেতার এই অমর্যাদাকর প্রস্থানের সময় এক শ লোকও তো তাঁর কাছে ছুটে যাননি। সুতরাং তাঁর দল নির্বাচনে অংশ না নিলে তাঁর কথিত সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

আওয়ামী লীগের অনেক গোঁড়া সমর্থক আছেন, যাঁরা জনরোষের ভয়ে সন্ত্রস্ত। তাঁরা অনেকেই আত্মগোপনে। অন্যরা বাড়িতে চুপচাপ বসে। ‘হয়রানির’ ভয়ে তাঁরা হয়তো ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। তাঁরা ‘মবের’ পাল্লায় পড়তে পারেন। তাঁদের সংখ্যা কত?

আগামী নির্বাচনে যদি ভোটার উপস্থিতি একটা সম্মানজনক পর্যায়ে থাকে, তাহলে বলা যাবে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি যদি চোখে পড়ার মতো কম হয়, তাহলে নির্বাচনটির নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, যত বেশি সম্ভব ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করা। এটি অনেকটা নির্ভর করবে দলগুলোর আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। নিরাপত্তার শঙ্কা থাকলে অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। তাঁদের সবাইকে আওয়ামী লীগের সমর্থক মনে করার কারণ নেই।

নির্বাচনকে বৈধতা দিতে হলে সবচেয়ে বেশি দরকার একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। ভোটারের নিরাপত্তা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণেরা ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। বাকি কাজটা করতে হবে সরকারকে।

  • মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব