দুবাইয়ে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মানুষ। ২৩ জুনের ছবি।
দুবাইয়ে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মানুষ। ২৩ জুনের ছবি।

মতামত

তিন মাসের যুদ্ধ যেভাবে আরব দেশগুলোকে জনমের তরে বদলে দিল

উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে যেগুলো ধনী, সেসব দেশের মানুষ গত কয়েক দশক ধরে যুদ্ধকে দেখেছেন টেলিভিশনের পর্দায়। এত দিন যুদ্ধ হয়েছে তাঁদের প্রতিবেশী গরিব দেশগুলোতে—ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনের গাজায়; কিন্তু নিজেদের দেশে নয়। এই মানুষগুলো এত দিন নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল। কারণ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তবে সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের ফলে এই নিরাপত্তার ভ্রম ভেঙে গেছে। এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাদের মাটিতে থাকা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদের রক্ষা করতে তো পারেইনি; উল্টে সেগুলো হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধ আপাতত থেমে গেছে বলে মনে হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা তৈরি হচ্ছে, তা তাদের ওপর ইরানের হুমকি কমাতে বিশেষ সাহায্য করবে না।

এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি অঞ্চলের একাধিক আরব নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। কুয়েতে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে এমন কিছু করবে না।

তবুও এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। নিজেদের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় তারা এখন সামরিক শক্তি বাড়াতে ও প্রতিরক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

গত এক দশকের বড় বড় উন্নয়নমূলক ও আশাবাদী প্রকল্পের জায়গায় এখন নতুন এক সতর্ক মানসিকতা দেখা যাচ্ছে।

কাতারের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খালিদ আল-জাবের বলেন, এই যুদ্ধ এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই ক্ষত সারাতে অনেক সময় লাগবে।

গত কয়েক মাসে দুবাই ও দোহার মতো শহরে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অকল্পনীয় ছিল। তাঁরা সেখানে বড় বড় বিস্ফোরণ দেখেছেন, বিলাসবহুল অট্টালিকাকে জ্বলতে দেখেছেন।

যুদ্ধের সময় মিসাইল হামলার সতর্কবার্তা মোবাইলে বেজে উঠলে বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে বাড়ির করিডরে আশ্রয় নিতেন। আমিরাতে কয়েক সপ্তাহ স্কুল বন্ধ ছিল এবং অনেক ধনী বিদেশি বাসিন্দারা দেশ ছেড়ে চলে যান।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করতে গেলে অনেকেই শুধু তিন দশকেরও বেশি আগে কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসনের কথাই মনে করতে পারছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে বাহরাইনের আল-সাখির প্রাসাদে দেশটির বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল-খলিফার সঙ্গে করমর্দন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট ও উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করার লক্ষ্যে রুবিওর এ সফর। ২৫ জুন ২০২৬–এর ছবি।

দুবাইয়ের একটি গবেষণা সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, এই যুদ্ধ গোটা অঞ্চলে এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের পদক্ষেপ এমন এক মানসিকতা তৈরি করেছে, যেখানে সহজেই শক্তি প্রয়োগকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে।

মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, এখন পরিস্থিতি অনেকটা ‘বুনো পশ্চিমের’ মতো হয়ে গেছে। তাঁর কথায়, যুদ্ধবিরতি বারবার খুব সহজেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর এ নিয়ে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।

এসব কারণে প্রত্যেক দেশ এখন ইরানের প্রতি নিজেদের মতো করে নীতি গ্রহণ করছে। ফলে এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে একত্রিত করার বদলে তাদের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের জোট আরও শক্তিশালী করেছে। কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে। সৌদি আরব নিজেদের বিকল্প খোলা রাখার চেষ্টা করছে।

একদিকে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে চায়, অন্যদিকে তারা ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখছে।

অন্যদিকে ওমান হরমুজ প্রণালিতে পরিষেবা ফি আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করায় ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণ হয়েছে। এই প্রণালি দিয়েই উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো, ইরানের কার্যত এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। ভবিষ্যতে ইরান আবারও এটি বন্ধ করতে পারে—এই আশঙ্কা এখন পুরো অঞ্চলের ওপর ভর করছে।

ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে, কীভাবে তেল, খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্য তাদের দেশে আনা-নেওয়া করা হবে।

আমিরাত সরকার এখন ‘হরমুজ নির্ভরতা শূন্য’ নীতি গ্রহণ করেছে। তারা প্রণালির বাইরে নতুন বন্দর গড়ে তুলছে এবং তেল পাইপলাইন ও রেলপথ নির্মাণ করছে।

অন্যদিকে সাধারণত শান্তশিষ্ট বলে পরিচিত ওমান (যার আরব সাগরের তীরে হরমুজ প্রণালির অনেক বাইরে বন্দর রয়েছে) এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখান থেকে স্থলপথে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে।

এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই সংঘাত কি সত্যিই শেষ হয়েছে?

কাতারের গবেষক আল-জাবের বলেন, তাঁদের ভয় হচ্ছে, এই যুদ্ধ হয়তো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হতে পারে।

প্রকাশ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ এই সংঘাত তাদের দেশগুলোর জন্য এতটাই ক্ষতিকর ছিল যে খুব কম লোকই চেয়েছিলেন এটি আরও দীর্ঘস্থায়ী হোক।

গত সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন বৈঠকে আমিরাতের প্রভাবশালী নেতা শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আপনার সমর্থন ও আপনার বন্ধুদের প্রতি অঙ্গীকারের জন্য ধন্যবাদ। এটা আমাদের কাছে অনেক বড় বিষয়, আর আপনি আমাদের দেখিয়েছেন আসল মিত্র কে।’

তবে পর্দার আড়ালে চিত্রটা অন্যরকম। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর বহু কর্তা তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) নিয়ে এক ধরনের হতাশা ও অসন্তোষ অনুভব করছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যে চুক্তি হয়েছে, তাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল উদ্বেগের বিষয়গুলো (যেমন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভান্ডার বা আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের প্রতি তার সমর্থন) প্রায় উল্লেখই করা হয়নি।

এরই মধ্যে সোমবার ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর তেলের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। এটি ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।

একটি আরব সংবাদপত্রে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি কলামে সৌদি লেখক আবদুলরহমান আল-রাশেদ লিখেছেন, এই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি আসলে তেহরানের শাসনকে আবার আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। তাঁর মতে, এই চুক্তি থেকে যে আর্থিক সুবিধা ইরান পেতে পারে, তা তাকে আগের চেয়েও আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক করে তুলবে।

এ ছাড়া মার্কিন কর্মকর্তারা প্রস্তাব দিয়েছেন, ইরানের পুনর্গঠনের জন্য তিন শ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিলে উপসাগরীয় দেশগুলোও অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এই প্রস্তাব অঞ্চলটিতে খুব একটা ভালোভাবে গ্রহণ করা হয়নি।

তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি বড় উদ্বেগ থেকেই গেছে। বাহরাইনের গবেষক মাহদি ঘুলুমের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকি হয়তো আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।

আল-জাবেরের কথায়, অনেকের মনে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন উপসাগরীয় দেশগুলোকে ‘এটিএম মেশিন’ হিসেবে দেখছে। এটি আরবদের অনেকের কাছেই বিরক্তিকর।

এই সপ্তাহে রুবিওর আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর সেই উত্তেজনারই ইঙ্গিত দেয়। যদিও তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলের সব দেশের মতামত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমরা চুক্তি চাই, কিন্তু যে কোনো মূল্যে চুক্তি চাই না।’

বৃহস্পতিবার বাহরাইনে উপসাগরীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর রুবিও সাংবাদিকদের জানান, তারা তাদের স্পষ্ট উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন এবং তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রতিটি ধাপে তাদের সরকারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

রুবিও জানান, তাঁর আলোচনায় তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে তিন শ বিলিয়ন ডলারের তহবিলে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব তোলেননি। বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিরা তাঁকে বলেছেন, পুনর্গঠনের জন্য তারাই বরং নিজস্ব অর্থসাহায্য পেতে আগ্রহী।

রুবিওর সঙ্গে বৈঠকে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাতিফ আল-জায়ানি বলেন, ‘আমরা যে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলাম, তার পর এই সংঘাতের অবসানকে অঞ্চল স্বাগত জানাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ আমরা আশার এক ঝলক দেখতে পাচ্ছি।’

তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি বড় উদ্বেগ থেকেই গেছে। বাহরাইনের গবেষক মাহদি ঘুলুমের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকি হয়তো আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।

যদিও বোমা হামলায় ইরান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল, তবুও তাদের সরকার টিকে গেছে এবং তারা বুঝে নিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা শক্তিশালী হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ঘুলুমের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর উচিত ইরানের সঙ্গে নিজেদের উদ্যোগে আলাদা করে আলোচনা শুরু করা, এমনকি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তির পথও খোঁজা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধের মধ্যে কিছু ইতিবাচক দিকও থাকতে পারে।

এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও শক্তিশালী ও অভিযোজনক্ষম করে তুলেছে।

ঘুলুমের কথায়, ‘আমরা নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আমরা ভাবতাম তার চেয়েও অনেক বেশি সহনশীল ও দৃঢ়।’

  • ভিভিয়ান নেরেইম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক।
    নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া।
    অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ