
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। যারা এর আগের কোনো জাতীয় নির্বাচনে ১৭টির বেশি আসন পায়নি, তারা এবার জোট বেঁধে ৭৭টি আসন দখল করেছে। মোট ভোটের হিসাবে প্রায় ৩১ শতাংশ। একাত্তরের গণহত্যার রক্ত হাতে লেগে থাকা এই দল এত দিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল ব্রাত্য। এই বিজয়ের ভেতর দিয়ে তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন হলো।
এটি মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠের ইতিহাস ভিন্ন। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে জামায়াত এতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে যে তারা বলা শুরু করে, এবার তারাই সরকার গঠন করবে। টক শো ও ইউটিউবে নিরলসভাবে জামায়াতের পক্ষে সাফাই দেওয়া অনেক ভাষ্যকারও বেশ জোরেশোরেই তেমন দাবি করা শুরু করেন। সত্যি বলতে কি, তাঁদের গলার আওয়াজ শুনে মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এত সহজে আমরা একাত্তরের খাণ্ডবদাহনকে ভুলে যাব?
শেষ পর্যন্ত সেটি যে হয়নি, তার একটি সম্ভাব্য কারণ বাংলাদেশের নারী ভোটার। এ কথা বলার কারণ রয়েছে। মুখে ও তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে জামায়াত নানাভাবে এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছে, দেশের মা-বোনদের ইজ্জত একমাত্র তারাই রক্ষা করতে সক্ষম। দলের আমির শফিকুর রহমান বরিশালের এক জনসভায় এমন কথাও বলেছেন, মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রয়োজনে নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত আছেন। পাশাপাশি তিনি এ কথাও বলেছেন, মেয়েরা শিক্ষায়-যোগ্যতায় যত সফল হোক না কেন, তারা কখনোই পুরুষদের ডিঙিয়ে যেতে পারবে না। সব সময় তাদের একজন পুরুষের পেছনে হাঁটতে হবে।
পুরুষ নারীর রক্ষাকর্তা, তার ‘প্রটেক্টর’—এই ধারণা আজকের নয়, হাজার বছরের। কিন্তু সেই পুরুষতন্ত্র অতিক্রম করে মেয়েরা শুধু যে বাইরে বেরিয়ে এসেছে তা-ই নয়, উল্টো অনেক ক্ষেত্রে তারাই পুরুষের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠেছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি, এমনকি দেশের সেনাবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে পৃথিবীর অনেক দেশেই দায়িত্ব পালন করেছেন নারী।
জামায়াতের আমির এ কথাও বুঝতে পারেননি যে মেয়েরা কেবল আমাদের মা ও বোন নয়; তারা কেউ কেউ আমাদের সহকর্মী, কেউ আমাদের স্ত্রী, কেউ আমাদের প্রেমিকা। এরা কেউ পুরুষের কাছ থেকে শুধু নিরাপত্তা আশা করে না, তারা সম-অধিকার ও সম-শ্রদ্ধা আশা করে।
জামায়াতের এই পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের আরেক পরিচয় মেলে নারীর কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার এক প্রস্তাবে। ঘরের কাজকর্ম করতে সুবিধা হবে, ছেলেপুলে লালন-পালনে সহায়ক হবে, এই যুক্তিতে তারা নারী শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টায় আনার প্রস্তাব করে। আপাত-উদার এই প্রস্তাব যে মেয়েদের ঘরে আটকে রাখার একটি চেষ্টা, সে কথা কর্মজীবী মেয়েদের অনেকেই চট করে ধরে ফেলেন।
একটি উদাহরণ নিই। ঢাকায় আমার পরিচিত এক আত্মীয়ের গৃহকর্মী ভোটের দুই দিন আগে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য ছুটির অনুরোধ করেন। এবার তাঁকে ভোট দিতেই হবে। তাঁর স্বামী একজন রিকশাচালক ও একটি মেয়ে পোশাকশ্রমিক। কেন ভোট দিতে ব্যাকুল, তার ব্যাখ্যায় ওই নারী জানান, দাঁড়িপাল্লা ক্ষমতায় এলে ‘মাইয়া মানুষ’ আর ঘরের বাইরে কাজ করতে পারবে না। এই ভয় শুধু এই গৃহকর্মীর নয়, আরও অনেক কর্মজীবী নারীর। তাঁরাই হয়তো দাঁড়িপাল্লার বদলে ধানের শীষ বা অন্য প্রতীকে ভোট দিয়েছেন, এমন ভাবনা একদম অমূলক নয়।
অনেক নারী ভোটারই বলেছেন, এর আগের বছরগুলোতে ভোটের সুযোগ পাননি, ভোট দিতে এসেও দেখেছেন ভোট আগে দেওয়া হয়ে গেছে। এবার অবস্থা ভিন্ন, সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সবান্ধবে, কোথাও কোথাও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। এটি তাঁদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের; তাঁদের ‘অটোনমির’ একটি প্রকাশ।
এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে এ কথা প্রমাণ অসম্ভব, শেষ পর্যন্ত নারীর ভোটেই ‘হার’ হয়েছে জামায়াতের। কিন্তু ভোটের সংখ্যানুপাতিক যে হিসাব আমাদের রয়েছে, তার দিকে নজর দিলে তেমন একটি চিত্র পাওয়া যায় বৈকি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, স্বভাবতই নারী ভোটার অর্ধেক বা তার কাছাকাছি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে, টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সচিত্র বিবরণ থেকে স্পষ্ট, এবার নারী ভোটারদের উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় আনুপাতিক হারে অনুল্লেখ্য নয়।
অনেক নারী ভোটারই বলেছেন, এর আগের বছরগুলোতে ভোটের সুযোগ পাননি, ভোট দিতে এসেও দেখেছেন ভোট আগে দেওয়া হয়ে গেছে। এবার অবস্থা ভিন্ন, সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সবান্ধবে, কোথাও কোথাও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। এটি তাঁদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের; তাঁদের ‘অটোনমির’ একটি প্রকাশ।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে। আইএলওর হিসাব অনুসারে, তারা এখন মোট শ্রমশক্তির ৪৪ শতাংশ। রেমিট্যান্সের বাইরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডই হলো পোশাকশিল্প, যার সিংহভাগ শ্রমিকই নারী। এই নারী শ্রমিক অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী, এবং সেই সূত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।
নিজের কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ তা বোঝার ক্ষমতা তাঁদের আছে। আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশ ও সংখ্যা ক্রমে যত বেড়েছে, পিতৃতান্ত্রিক স্ট্যাটাস-কোর বিরুদ্ধে মেয়েদের অনাস্থা ততই বৃদ্ধি পেয়েছে।
কর্মক্ষেত্র নারীকে কীভাবে বদলে দেয়, সে প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাজ করেছেন নায়লা কবীর। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের এই বাংলাদেশি গবেষক তাঁর রিভার্সড রিয়েলিটিস, জেন্ডার হায়ারার্কিস ইন ডেভেলপমেন্ট থট গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বেতনের বিনিময়ে কাজের সুযোগ নারীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে আমূল বদলে দিতে পারে। এই সক্ষমতা তাঁকে পিতৃতান্ত্রিক বাধাকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি প্রদান করে।
নায়লা কবীরের উপসংহার: নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে অধিক সক্ষম হয়, ভোট প্রদানের মতো রাজনৈতিক প্রশ্নে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সে অধিক আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আমার ধারণা, এবারের নির্বাচনে কর্মজীবী নারীর সিদ্ধান্ত সে কারণেই জামায়াতের বিপক্ষে গেছে।
জামায়াত যখন মেয়েদের শ্রমঘণ্টা কমাতে চায়, আপাতভাবে তা নারী শ্রমিকদের প্রতি সদয়নীতি মনে হতে পারে, কিন্তু এর লক্ষ্য তাদের ঘরে ঠেলে ফেলা হতে পারে, এমন উদ্বেগ অবশ্যই বাংলাদেশের মেয়ে ভোটারদের মধ্যে কাজ করেছে।
পুরুষ চাক বা না-চাক বাস্তবতা হলো এই, সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নারীর মর্যাদা ক্রমে বদলাচ্ছে। নারী এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান অংশীজন, অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেও সে কথার স্বীকৃতি মিলেছে। যেমন তুরস্কে ক্ষমতাসীন দল একেপি এখন বিশ্বের সর্বাধিক নারী সদস্য নিয়ে গঠিত একটি দল। তারা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ১৯৯৫-তে সে দেশের আইনসভায় নারীর প্রতিনিধিত্ব ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশে। সারা দেশে নারী প্রাদেশিক মেয়রের সংখ্যা ১৯, পঁচিশ বছর আগের তুলনায় যা তিন গুণ। একই অবস্থা ইন্দোনেশিয়ায়। সেখানে নারী জনপ্রতিনিধির সংখ্যা এখন মোট প্রতিনিধির ২১ শতাংশ। ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত পিকেএস দলের মোট সংসদ সদস্যের ৩০ শতাংশ নারী।
এই পরিবর্তন মেয়েদের মাথায় তুলে রাখার ফলে নয়, নারীর রাজনৈতিক ভূমিকার যৌক্তিক স্বীকৃতি হিসেবে এসেছে। ‘নারীর সম্মান রক্ষায় জান দিয়ে দেওয়ার বদলে’ বাংলাদেশের পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নারীকে তাঁর ন্যায্য মর্যাদার স্বীকৃতিটুকু দিতে সম্মত হয়, দেশ তাহলে আরও দুই কদম এগোতে পারে।
হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
*মতামত লেখকের নিজস্ব