কাশ্মীরে বিজেপির বিস্তার
কাশ্মীরে বিজেপির বিস্তার

মতামত

হিন্দুত্ববাদ কাশ্মীরকে যেভাবে গ্রাস করে ফেলছে

হিন্দুত্ববাদের ছায়া ধীরে ধীরে কাশ্মীরে নেমে আসছে। সম্প্রতি মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোর ওপর অধিক নজরদারি, আর মুসলিম শিক্ষার্থী-অধ্যুষিত একটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এটি ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামবিদ্বেষের মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে বঞ্চিত ও কোণঠাসা করা হচ্ছে। গত ১০ বছরে ভারতের রাজনীতি ও সমাজে হিন্দুত্ববাদের প্রভাব এতটাই গভীর হয়েছে যে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এখন এর শিকার।

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গেরুয়াকরণ করার চেষ্টা নতুন নয়। তবে ভারতীয় জনতা পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা ও গণমাধ্যমের বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর এই প্রক্রিয়া নজিরবিহীন গতি পেয়েছে। গেরুয়াকরণ বা হিন্দুকরণ কখনোই ইসলামবিদ্বেষ থেকে আলাদা নয়; এটি সরাসরি মুসলমানদের প্রান্তিককরণের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

বারবার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে দেশের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নয়। গরু রক্ষা নামের সহিংসতা, লাভ জিহাদ ও ল্যান্ড জিহাদের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, মসজিদ ভাঙা, প্রকাশ্য গণপিটুনি কিংবা দরিদ্র মুসলিম মহল্লায় বুলডোজার চালানো—সব ক্ষেত্রেই হিন্দুত্ববাদের ঘৃণার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য মুসলমানরাই।

এখন এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আঘাত গিয়ে পড়ছে কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর। ভারতের অন্য অঞ্চলের তুলনায় কাশ্মীরে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভয়, আতঙ্ক ও বর্জনের রাজনীতির মাধ্যমে তাদেরও সন্দেহভাজন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ উপত্যকাজুড়ে মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে লক্ষ্য করে একটি অনধিকারমূলক অভিযান শুরু করেছে। বহু পৃষ্ঠার ফরম বিতরণ করে ইমাম, ধর্মশিক্ষক ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির লোকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চাওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ। কিন্তু কাশ্মীরের অনেক মানুষের কাছে মনে হচ্ছে, এটি নিরাপত্তার চেয়ে সামষ্টিক সন্দেহ আর নজরদারির হাতিয়ার।

হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প ধীরে হলেও নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে চলেছে। এটি একদিকে প্রতিষ্ঠান দখল করছে, অন্যদিকে মানুষের চিন্তা ও বোধবুদ্ধিকেও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ভারতের জনগণেরই।

ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। উপাসনালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির আওতায় আনা পুরো সম্প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা দেয় যে তাদের বিশ্বাস ও উপাসনার স্থান রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহের বিষয়।

জম্মুর শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্স বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা বঞ্চনার আরেকটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম এমবিবিএস ব্যাচে ভর্তি হওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪২ জনই ছিলেন মুসলিম। তাঁরা সবাই ভারতের জাতীয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ডানপন্থী উগ্র গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, একটি হিন্দু তীর্থস্থানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নেওয়ার কোনো অধিকার মুসলমানদের নেই। এর কিছুদিন পর জাতীয় মেডিকেল কমিশন অবকাঠামোগত ঘাটতির অজুহাতে কলেজটির স্বীকৃতি বাতিল করে দেয়।

এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, মুসলমানদের জীবন ও সাফল্যকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাশ্মীরে এই বাস্তবতা আরও তীব্র। কারণ, অঞ্চলটি আগেই তল্লাশি অভিযান, চেকপোস্ট ও সার্বক্ষণিক নজরদারির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার–বিশেষজ্ঞরা জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিষয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা দেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পেহেলগামে হামলার পর প্রায় ২ হাজার ৮০০ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরাও ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচার ছাড়াই দীর্ঘ সময় আটক, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের হয়রানির তথ্য উঠে আসে।

কাশ্মীর ক্রমেই সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রবণতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেক্যুলারিজমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। এসব সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ছিলেন মুসলমান। ওই বছর নথিভুক্ত ৫৯টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মধ্যে ৪৯টিই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ধর্মভিত্তিক ঘৃণাজনিত অপরাধের প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটেছে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর।

ঘৃণামূলক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৩০০টির বেশি ঘৃণামূলক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর বেশির ভাগই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে এবং মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমান ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। গরু রক্ষার নামে সন্ত্রাসী দল, বুলডোজার দিয়ে শাস্তি দেওয়া এবং নাগরিকত্ব ও ধর্মান্তর–সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক আইন সমষ্টিগত শাস্তি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আসলে বর্জন ও ভয়ের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পেরই স্বাভাবিক পরিণতি। যারা আগে থেকেই অবিরাম অবরোধ ও নজরদারির মধ্যে বসবাস করছে, সেই মুসলমানদের এখন আরও বেশি প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক মনে হয় না।

হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প ধীরে হলেও নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে চলেছে। এটি একদিকে প্রতিষ্ঠান দখল করছে, অন্যদিকে মানুষের চিন্তা ও বোধবুদ্ধিকেও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ভারতের জনগণেরই। তারা কি ঘৃণা ছড়ানো শক্তি ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রকে ছেড়ে দেবে এবং সাভারকারের কল্পিত ঘৃণা ও ভয়ের রাষ্ট্রে রূপ নিতে দেবে, নাকি গান্ধী ও নেহরুর কল্পিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করবে।

এ মুহূর্তে সেই উত্তরের ভেতরে খুব একটা আশার কারণ দেখা যাচ্ছে না।

  • জাওয়াদ খালিদ পাকিস্তানভিত্তিক লেখক ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক
    মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত