
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়কে বেইজিংয়ের জন্য সুখবর মনে হতে পারে। তবে চীনা বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা হলো, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন। বিশেষ করে তাইওয়ান ও চিপ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তাঁর নীতি আরও কঠোর হতে পারে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দুই বছরে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বিরোধিতাপূর্ণ কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে ট্রাম্পকে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই পরাজয়ের জন্য ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। ওই যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে। পরে ভ্যান্সের এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হন ট্রাম্পও।
এই রাজনৈতিক ধাক্কা এসেছে ট্রাম্পের চীন সফরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে। ১৮ ও ১৯ নভেম্বর শেনজেনে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার (এপেক) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা তাঁর। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকও হতে পারে।
গত সেপ্টেম্বরে ক্রেমলিন জানিয়েছিল, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে নিয়ে তিন নেতার একটি বৈঠকের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পুতিনও ওই সম্মেলনে যোগ দেবেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই রিপাবলিকানদের পরাজয় কামনা করেছিলেন। কিন্তু ফল প্রকাশের পর বুধবার দিনভর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বৃহস্পতিবার প্রায় সব চীনা বিশ্লেষকের বক্তব্যে ভিন্ন সুর দেখা যায়। তাঁরা পাঠকদের সতর্ক করে বলেছেন, এই ফল নিয়ে উচ্ছ্বাসের কিছু নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়লেই চীনের লাভ হবে—এমন সরল ধারণা থেকেও সরে আসতে হবে।
তাঁদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের জয় ওয়াশিংটনের চীননীতি নমনীয় করবে না। কারণ, চীনকে মোকাবিলা করার বিষয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগে বিধিনিষেধ ইতিমধ্যে আইনে পরিণত হয়েছে। এসব বহাল থাকবে, এমনকি আরও কঠোর হতে পারে। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কে বেশি কঠোর, তা প্রমাণ করতে দুই দলই প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।
বিশ্লেষকেরা আরও মনে করছেন, ট্রাম্প ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করে আবার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মনোযোগ দিতে পারেন। একই সঙ্গে তাইওয়ানের কাছে আরও বেশি অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিতে পারেন।
চীনের শানডং প্রদেশের এক লেখক ‘ওয়েইচাং’ ছদ্মনামে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প বড় পরাজয়ের মুখে পড়েছেন এবং তাঁর ক্ষমতা কমে এসেছে—এমন খবর দেখে চীনের অনেকেই উল্লাস করেছেন। তাঁদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছে এবং চীনের ওপর চাপ কমেছে। এই ধারণা শুনতে স্বস্তিদায়ক হলেও বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘চীনকে কীভাবে আটকে রাখা যায়, তা নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে বিরোধ আছে; কিন্তু চীনকে আটকে রাখা উচিত কি না, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো মতপার্থক্য নেই। স্বল্প মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে চীনকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত হতে পারে।’
ওই লেখকের মতে, প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই এখন প্রেসিডেন্টের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের পরিবর্তে কংগ্রেসে পাস হওয়া স্থায়ী আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। এপ্রিলে দুই দলের সমর্থনে উত্থাপিত ‘মাল্টিল্যাটারাল অ্যালাইনমেন্ট অব টেকনোলজি কন্ট্রোলস অন হার্ডওয়্যার’ বা ম্যাচ (এমএটিসিএইচ) আইন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই আইনের লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোকে একই ধরনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণনীতি অনুসরণে বাধ্য করা। এর আওতায় হুয়াওয়ে টেকনোলজিস এবং সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের (এসএমআইসি) মতো চীনা চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ওই লেখক আরও বলেন, ট্রাম্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও আবার মেরামত করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। চীনের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধকে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর যৌথ প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরতে পারে তারা। ট্রাম্প হয়তো উত্তেজনা বাড়াতে চাইবেন না। কিন্তু কংগ্রেস তাইওয়ান, শিনজিয়াং এবং চিপ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একের পর এক বিল উত্থাপন করতে পারে। এতে ট্রাম্পকেও কোনো না কোনো অবস্থান নিতে বাধ্য হতে হবে।
শানডং প্রদেশের আরেক লেখক ইয়ানবিয়ান বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কা চীনের জন্য খারাপ খবর। এখন আমরা এমন প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি, যে দুর্বল নয়; বরং পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন প্রশ্ন হলো, চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে কি না, তা নয়; বরং আরও কার্যকরভাবে কীভাবে তা করা যায়।’
চীনের গুইঝৌ প্রদেশের কলাম লেখক জিয়াং তাও বলেন, ‘চীনকে মোকাবিলার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দল দীর্ঘদিন ধরেই একমত। তাদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতবিরোধ নেই। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও চীনের বিরুদ্ধে অবরোধ বা নিয়ন্ত্রণ কমবে না। শুধু ওয়াশিংটনের কৌশল বদলাবে। রিপাবলিকানরা এককভাবে চাপ প্রয়োগে বিশ্বাসী, আর ডেমোক্র্যাটরা মিত্রদেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চায়। পদ্ধতি আলাদা হলেও লক্ষ্য একই।’
তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, তাইওয়ান প্রণালি এখন আরও অস্থির ও জটিল এক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্পের তাইওয়ান নিয়ে আগ্রহ সবচেয়ে কম। নির্বাচনে বড় ধাক্কা খাওয়ার পর ট্রাম্প তাইওয়ান নিয়ে নিজের অবস্থান বদলে ফেলতে পারেন। রক্ষণশীল ভোটারদের সমর্থন ফিরে পেতে তিনি তাইওয়ান ইস্যুকে জোরালোভাবে ব্যবহার করতে পারেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। এই প্যাকেজে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল। কিন্তু পরে হোয়াইট হাউস সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এই প্যাকেজের কার্যক্রম এগিয়ে না নিতে নির্দেশ দেয়। কারণ, তখন ট্রাম্প বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শুরু করতে চাচ্ছিলেন। মে মাসে চীন সফরের আগে সি চিন পিংকে অসন্তুষ্ট করতেও চাননি তিনি।
ওই বৈঠকের পর চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। সেপ্টেম্বরে সি চিন পিং হোয়াইট হাউস সফর করেন। তবে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে প্রস্তাব না পাঠানো পর্যন্ত অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজটি কার্যকর করা যাবে না। ফলে সেটি এখনো স্থগিত রয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পূর্ণমাত্রার বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পরে দুই দেশ উত্তেজনা কমাতে সম্মত হয়। ২০২৬ সালেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা অব্যাহত ছিল। যদিও উভয় দেশ একে অপরের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল।
বুধবার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে যে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য হয়েছে, তা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে চীন প্রস্তুত। যোগাযোগ বাড়ানো, মতপার্থক্য যথাযথভাবে সামাল দেওয়া, সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে কৌশলগত স্থিতিশীলতার একটি গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমরা আগ্রহী।’
শানডং প্রদেশের আরেক লেখক ইয়ানবিয়ান বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কা চীনের জন্য খারাপ খবর। এখন আমরা এমন প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি, যে দুর্বল নয়; বরং পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন প্রশ্ন হলো, চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে কি না, তা নয়; বরং আরও কার্যকরভাবে কীভাবে তা করা যায়।’
ইয়ানবিয়ান বলেন, ‘ট্রাম্পের কৌশল হলো একা চলা, শক্তি প্রয়োগ করা এবং নিরাপত্তার বিনিময়ে মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায় করা। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা জোট গঠন, নিয়ম তৈরি এবং সরবরাহব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর পক্ষে। ডেমোক্র্যাটরা আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসায় চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা সরাসরি বিচ্ছিন্ন করে রাখার নীতি থেকে সরে আরও সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে পারে।’
ইয়ানবিয়ান বলেন, চীনকে নিজস্ব প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো সহজ পথ নেই, অবাস্তব আশাবাদেরও সুযোগ নেই। চিপ ও লিথোগ্রাফি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার সফটওয়্যার, অপারেটিং সিস্টেম এবং নিখুঁত যন্ত্রাংশ উৎপাদন—সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে চীনকে।
তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের (আইএনডিএসআর) প্রতিরক্ষা কৌশল ও সম্পদ বিভাগের সহযোগী গবেষক চেন লিয়াং-চিহ বলেন, ‘ট্রাম্প যদি নিজের প্রভাব ধরে রাখতে পারেন এবং চীন নিয়ে তাঁর বর্তমান নীতি অপরিবর্তিত রাখেন, তাহলে বেইজিং অবশ্যই খুশি হবে। এখন চীনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও বাণিজ্য আলোচনায় যে অগ্রগতি হয়েছে, তা অব্যাহত রাখা সম্ভব কি না।’
চেন লিয়াং-চিহ আরও বলেন, এপেক সম্মেলন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে গত এক বছরে বিভিন্ন সম্মেলন ও ট্রাম্প-সি বৈঠকে দুই পক্ষ যেসব সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায় কি না এবং আলোচনা সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় কি না, তার ওপর।
জেফ পাও লন্ডনভিত্তিক সাংবাদিক। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য এবং মার্কিন–চীন সম্পর্ক নিয়ে লেখালিখি করেন।
এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ