পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে হুগলির তারকেশ্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২০ জুন, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে হুগলির তারকেশ্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২০ জুন, ২০২৬

মতামত

বিজেপিও কেন এখন সাতচল্লিশের বাংলা ভাগকে উদ্‌যাপন করছে

১৯৪০ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ লাহোরে তাঁর ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ নিয়ে ভাষণ দেন। শিগগিরই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাওয়া এই নেতা সে সময় দাবি করেছিলেন, ‘হিন্দু ও মুসলমানরা যে কখনো একটি একক জাতীয়তা গড়ে তুলতে পারে—এটি কেবলই একটি স্বপ্ন।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এই দুই সম্প্রদায় দুটি ভিন্ন ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক রীতিনীতি এবং লিটারেচার ধারণ করে।

জিন্নাহর সেই ভাষণটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও সুদূরপ্রসারী এক বক্তব্য। এর মাত্র সাত বছর পর, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতকে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে এমন এক রক্তাক্ত প্রক্রিয়ায় বিভক্ত করা হয়, যার ক্ষত দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে।

লাহোর ১৯৪০ থেকে বেঙ্গল ২০২৬

এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, পশ্চিমবঙ্গের (১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগের ফলেই যার সৃষ্টি) একজন মন্ত্রীর মুখে দ্বিজাতি তত্ত্বের পক্ষে সাফাই গাওয়া সত্যিই এক বিস্ময়কর ঘটনা।

রাজ্যটির বর্তমান অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত একটি লেখায় লেখেন, ‘ধর্মীয় বিভেদকে ছাপিয়ে একটি কম্পোজিট বা সমষ্টিগত সাংস্কৃতিক সম্প্রদায় গড়ে ওঠার ধারণাটি ছিল একটি মিথ।’ একই লেখায় তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘সমষ্টিগত বাঙালি পরিচয় চমৎকার বিষয় কিন্তু এটি আসলে মিথ।’ তিনি আরও দাবি করেন, বাংলা অঞ্চলের দু্টি ভিন্ন সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানেরা একই ভাষার হলেও তাদের মধ্যে অর্থপূর্ণ কোনো যোগাযোগ বা মেলবন্ধন ছিল না।

পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত কার্যত জিন্নাহর সেই লাহোর প্রস্তাবেরই পুনরাবৃত্তি করছিলেন। হিন্দু ও মুসলমানরা ‘ভিন্ন’ এবং কোনো ‘সমষ্টিগত পরিচয়’ কেবলই একটি ‘মিথ’—তাঁর এই বক্তব্য আর জিন্নাহর ‘দুই সম্প্রদায় দুটি ভিন্ন ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক রীতিনীতি ও লিটারেচার সাহিত্য ধারণ করা’ কথার মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই।

ভারতের সরকারি অবস্থান সব সময় এটাই ছিল যে দেশভাগ ছিল একটি ‘অনিবার্য বিপর্যয়’ যা কংগ্রেসকে ১৯৪৭ সালে মেনে নিতে হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল একটি রাষ্ট্রই এত দিন দেশভাগ উদ্যাপন করত—তা হলো পাকিস্তান; যারা এই ঘটনাকে দ্বিজাতি তত্ত্বের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখে। তবে ২০ জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ ঘোষণার মাধ্যমে ভারতও এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তালিকায় যোগ দিল।

ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিজাতি তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করায় বিষয়টিকে আপাতদৃষ্টিতে আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে। তবে এই দ্বিজাতি তত্ত্বকে হিন্দুত্ববাদের সমর্থন করার অবস্থানটি তাদের আদর্শের মতোই পুরোনো। এই মতাদর্শ তথা হিন্দুত্ববাদের ভিত্তি তৈরি করা বিনায়ক দামোদর সাভারকার এ বিষয়ে একদম স্পষ্ট ছিলেন। ১৯৪৩ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘মিস্টার জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। আমরা হিন্দুরা নিজেরাই একটি জাতি এবং এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য যে হিন্দু ও মুসলমানরা দুটি আলাদা জাতি।’

সাভারকার অবশ্য এর চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তাঁর ভাবনার দ্বিজাতিতত্ত্বে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য থাকবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকত্ব। যুক্তরাষ্ট্রে যখন বর্ণবৈষম্য চরম পর্যায়ে, তখন এক আমেরিকান সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতে মুসলমানরা ঠিক তেমন সংখ্যালঘু অবস্থানে থাকবে, যেমনটা আপনাদের দেশে কৃষ্ণাঙ্গরা রয়েছে।’

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন। ২০ জুন ২০২৬

তত্ত্ব থেকে নীতিতে

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) মূলত সাভারকারের এই দ্বিজাতি তত্ত্ব বাস্তবায়নের পথেই অনেকটা এগিয়ে গেছে। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিম নাগরিকরা এখন অন্যান্য নাগরিকের তুলনায় কম অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিচারব্যবস্থায়। সামান্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত মুসলিমদেরও কঠোর এবং প্রায়ই বিচারবহির্ভূত শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

উত্তর প্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে কোনো মুসলিম কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে তাঁর বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এসব রাজ্যে পুলিশের কথিত বিচারবহির্ভূত ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিমের সংখ্যা আনুপাতিক হারের চেয়ে অনেক বেশি।

অন্যদিকে মুসলিমদের ওপর চালানো অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থা অনেক নমনীয় আচরণ করছে বা প্রায়ই কোনো শাস্তিই দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে ‘হিন্দুত্ব ভিজিল্যান্টিজম’ (হিন্দুত্ববাদী অতি-উৎসাহী দল বা গোষ্ঠীর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া) এক ধরনের দায়মুক্তি পেয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মুসলিমদের ওপর সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিরা নিজেরাই সেসব আক্রমণের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছে। কারণ, তারা নিশ্চিত যে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।

আদালতও এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খুব একটা ভূমিকা রাখছে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই এতে শামিল হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ গত মার্চ মাসে গঙ্গা নদীতে মুরগির মাংস খাওয়ার ‘অপরাধে’ কয়েকজন মুসলিমকে আদালত জামিন দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অথচ এই মাংস ভক্ষণকারীদের পরিচয় যদি ভিন্ন হতো, তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো সমালোচনাও হতো না।

২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্বকে সরাসরি আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার নাগরিকত্ব আইনে ধর্মের প্রবেশ ঘটিয়েছে। সে সময় বিজেপি নেতারা ভারতীয় মুসলিমদের হুমকিতে প্রকাশ পেয়েছিল যে, সিএএর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এআরসি) যুক্ত হলে তা মুসলিমদের নাগরিকত্বের দাবির ওপর বড় আঘাত হানবে।

শেষ পর্যন্ত সেটিরও আর প্রয়োজন পড়েনি। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ‘বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় খুব খোলামেলাভাবেই রাজ্যের মুসলিমদের নিশানা করা হয় এবং ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়। এরপর থেকে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার এমন আদেশ জারি করেছে, যা এই বিশেষ সংশোধনী থেকে বাদ পড়া মানুষদের সব ধরনের সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা এবং অনগ্রসর জাতি (ওবিসি) কোটার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে।

১৯৪৭ সালের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

তাই দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি বিজেপির এই সমর্থনের অংশ হিসেবে দলটি এখন প্রকাশ্যেই দেশভাগ উদ্যাপন করছে—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ২০ জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা। ১৯৪৭ সালের এই দিনটিতেই বাংলার বিধানসভা বসেছিল দেশভাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে।

বিজেপি বিধানসভার সেই ভোটকে এমনভাবে চিত্রায়িত করেছে, যেন এটি বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ হওয়া থেকে ‘রক্ষা’ করেছিল এবং এর পুরো কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে। তবে এই দুটি দাবিই সত্যের অপলাপ মাত্র। ২০ জুনের সেই ভোট ছিল স্রেফ একটি আনুষ্ঠানিকতা।

লর্ড মাউন্টব্যাটেনের যে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশভাগ নির্ধারিত হয়েছিল, তাতে বলা ছিল, বাংলার বিধানসভা পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ভোট দেবে। দেশভাগ চূড়ান্ত হওয়ার জন্য যেকোনো একটি অংশ দেশভাগ ও ভারতের পক্ষে ভোট দিলেই যথেষ্ট।

কংগ্রেস ইতিমধ্যেই মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিল এবং বিধানসভার পশ্চিমাংশে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল স্পষ্ট। তাই ২০ জুনের ভোটটি ছিল কেবলই একটি নিয়মরক্ষা। তা ছাড়া শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হিন্দু মহাসভার আসন ছিল মাত্র একটি। ভোটে তাঁর ভূমিকা ছিল একেবারেই সামান্য। প্রকৃতপক্ষে নথিপত্রে স্পষ্ট রয়েছে যে মুখার্জি ‘ভারত বিভক্ত না হলেও’ বাংলাকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভাগ করতে চেয়েছিলেন। ফলে বাংলাকে পাকিস্তানে যাওয়া থেকে আটকাতে তিনি দেশভাগ সমর্থন করেছিলেন—বিজেপির এই যুক্তি একেবারেই সত্য নয়।

এ পর্যন্ত ভারতের সরকারি অবস্থান সব সময় এটাই ছিল যে দেশভাগ ছিল একটি ‘অনিবার্য বিপর্যয়’ যা কংগ্রেসকে ১৯৪৭ সালে মেনে নিতে হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল একটি রাষ্ট্রই এত দিন দেশভাগ উদ্যাপন করত—তা হলো পাকিস্তান; যারা এই ঘটনাকে দ্বিজাতি তত্ত্বের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখে। তবে ২০ জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ ঘোষণার মাধ্যমে ভারতও এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তালিকায় যোগ দিল।

  • শোয়াইব দানিয়াল পলিটিক্যাল এডিটর, স্ক্রল ইন

স্ক্রল ইনের নিউজলেটার দ্য ইন্ডিয়া ফিক্স থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব