চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে যা পড়া যেত, আজ তা ধীরে ধীরে মূলধারার চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে যা পড়া যেত, আজ তা ধীরে ধীরে মূলধারার চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

মতামত

জিন সম্পাদনা: জন্মগত রোগ কি আর জন্মগত থাকবে?

খাদ্যসংকট মেটাতে কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার লড়াইয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই গবাদিপশু ও উদ্ভিদের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে আসছি।

ভালো জাতের আম, অধিক ফলনশীল ধান কিংবা রোগপ্রতিরোধী সবজির নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ‘জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ নতুন কিছু নয়।

কিন্তু যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা গরু-ছাগল-ফল-ফসলের ভাগ্যবদল করেছি, তা কি মানুষের অবিনশ্বর নিয়তিকেও বদলে দিতে পারে?

বিজ্ঞান বলছে, গবাদিপশু আর উদ্ভিদ নয়, মানুষ চাইলে তার নিজেরও উন্নত জাত তৈরি করতে পারে। জন্মের অমোঘ নিয়তি বলে যাকে আমরা মেনে নিতাম, জিন সম্পাদনার হাত ধরে সেই ‘অদৃষ্ট’ আজ মানুষেরই করতলগত হওয়ার অপেক্ষায়।

জন্মের সময় যে জিনগত গঠন আমরা নিয়ে আসি, সেটাই আমাদের জীবনের চূড়ান্ত সীমা নির্ধারণ করে দিত। কারও জন্মগত রোগ থাকলে সেটিকে মেনে নেওয়াই ছিল একমাত্র প্রথাগত উপায়-চিকিৎসা মানে সেখানে কেবল রোগের তীব্রতা বা লক্ষণ কমানো, জীবনটাকে কোনোমতে কিছুটা সহজ করে তোলা।

ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন, মানুষ তার নিজের নিয়তি নিজেই তৈরি করে। কিন্তু জিনগত রোগের ক্ষেত্রে মানুষ জন্ম থেকেই এক অমোঘ দাসত্বে বন্দি। বিজ্ঞান এখন সেই বন্দিদশা থেকে মুক্তির গান গাইছে।

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এই সনাতন ধারণাকেই একবারে গোড়া থেকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি বা ‘জিন এডিটিং’ এখন এমন এক যুগান্তকারী পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে রোগের সাময়িক উপশম নয়, বরং তার মূল কারণ-ডিএনএ-র ভেতরের আদি ত্রুটিকেই সরাসরি সংশোধন করা সম্ভব হচ্ছে।

ক্রিসপার ও পরবর্তী অধ্যায়: ডিএনএ সেলাইয়ের বিজ্ঞান

আজ থেকে কয়েক বছর আগেও ক্রিসপার প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিএনএ-র নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলা বা বদলে দেওয়ার ধারণাটি অনেকটা পরীক্ষাগারের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে যা পড়া যেত, আজ তা ধীরে ধীরে মূলধারার চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার এবং সায়েন্স-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সুনির্দিষ্ট জিনগত ত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে কিছু বিরল ও জটিল রোগের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই মানবশরীরে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।

এই প্রযুক্তির সাম্প্রতিক বড় অগ্রগতিগুলোর একটি হলো, এখন বিজ্ঞানীরা ডিএনএর শুধু একটি বা দুটি জিন নিয়ে কাজ করছেন না; বরং ডিএনএর বড় অংশ একসঙ্গে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন।

আগে কোনো জিনে ত্রুটি থাকলে বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য ছিল সেই নির্দিষ্ট জিনটি শনাক্ত করে তার ত্রুটি ঠিক করা।

এখন গবেষণার পরিধি আরও বড় হয়েছে। ডিএনএর একটি বড় অংশে একসঙ্গে পরিবর্তন এনে কীভাবে ত্রুটিপূর্ণ জিনের সমস্যা ঠিক করা যায় বা কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য তৈরি করা যায়, বিজ্ঞানীরা এখন সেই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন।

‘সায়েন্টিফিক ডিসকভারি রিপোর্ট’-এর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষকেরা এখন ‘স্টিচিং’ বা এক ধরনের আণবিক সংযোজনধর্মী পদ্ধতির মাধ্যমে বড় ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা দেখছেন।

এতে করে যেসব জটিল জিনগত রোগে শরীরের একাধিক অঙ্গ বা বহুমাত্রিক জিন সিকোয়েন্স জড়িত, সেগুলোর চিকিৎসার পথও উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বোঝার জন্য আমাদের জিনগত রোগের ভেতরের কাঠামোর দিকে একটু তাকানো দরকার।

অনেক রোগই মূলত একটি অতি ক্ষুদ্র ত্রুটির কারণে হয়-যেমন ডিএনএ-র কোটি কোটি অক্ষরের মধ্যে মাত্র একটি অক্ষরের ভুল বিন্যাস। আবার অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও বড় ও বিস্তৃত, যেখানে পুরো একটি জিনের অনুপস্থিতি বা একাধিক জিনের জটিল গোলযোগ জড়িত থাকে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে দ্বিতীয় ধরনের সমস্যাগুলো এত দিন প্রায় অমীমাংসিত এবং লাজওয়াব হিসেবেই গণ্য হতো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে গবেষণার দিকবদল ঘটছে এবং বিজ্ঞানীরা সেই জটিলতার কেন্দ্রেই আঘাত করছেন।

জিন সম্পাদনার এই অতি আধুনিক রূপান্তরের পেছনে যে চালিকাশক্তিটি সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে, তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ও জিন সম্পাদনা

জিন সম্পাদনার এই অতি আধুনিক রূপান্তরের পেছনে যে চালিকাশক্তিটি সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে, তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

ডিএনএ-র বিলিয়ন বিলিয়ন বিন্যাসের মধ্যে ঠিক কোন জায়গায় ত্রুটি আছে, তা খালি চোখে বা সাধারণ কম্পিউটারে খুঁজে বের করা খড়কুটোর গাদায় সুচ খোঁজার মতোই অসম্ভব।

এখানেই আলো দেখাচ্ছে এআই। ‘নেচার বায়োটেকনোলজি’ সাময়িকীর ২০২৫ সালের একটি বিশেষ নিবন্ধে বলা হয়েছে, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ডিপ লার্নিং মডেলগুলো এখন মানুষের জিনোমের কোটি কোটি ডেটা সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্লেষণ করতে পারছে।

বিশেষ করে, গুগলের ‘আলফাফোল্ড’ প্রযুক্তির নতুন সংস্করণগুলো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন এমন নিখুঁতভাবে পূর্বাভাস দিতে পারছে, যা আগে বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল কল্পনাতীত।

এর ফলে একটি নির্দিষ্ট জিন এডিট বা সম্পাদনা করলে প্রোটিনের গঠনে কী প্রভাব পড়বে, তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার আগেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে দেখে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

শুধু তা-ই নয়, জিন এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভয়ংকর যে ঝুঁকি থাকে-যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অফ-টার্গেট ইফেক্ট’ বা ভুল জায়গায় ডিএনএ কেটে ফেলা-তা এআই-এর ব্যবহারের ফলে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।

‘প্রাইম এডিটিং’ এবং ‘বেস এডিটিং’-এর মতো অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তিগুলো কোন কোষে কীভাবে কাজ করবে, তার নিখুঁত পথনকশা বা গাইড আরএনএ তৈরি করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফলে চিকিৎসা এখন অনেক বেশি নিরাপদ এবং সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠছে।

‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এর ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো রক্তজনিত মারাত্মক জন্মগত রোগের ক্ষেত্রে ক্রিসপার প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই চিকিৎসায় রোগীর শরীর থেকে প্রথমে নিজস্ব স্টেম সেল বা রক্ত উৎপাদনকারী কোষ সংগ্রহ করা হয়। এরপর ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এআই এবং ক্রিসপার প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই কোষের ভেতরের ত্রুটিপূর্ণ জিনটি সংশোধন করা হয়।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সাফল্য ও দীর্ঘমেয়াদি মুক্তি

তত্ত্বের টেবিল পেরিয়ে এই প্রযুক্তি এখন মানুষের জীবন বাঁচাতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবশরীরে এর কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে।

‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এর ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো রক্তজনিত মারাত্মক জন্মগত রোগের ক্ষেত্রে ক্রিসপার প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই চিকিৎসায় রোগীর শরীর থেকে প্রথমে নিজস্ব স্টেম সেল বা রক্ত উৎপাদনকারী কোষ সংগ্রহ করা হয়। এরপর ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এআই এবং ক্রিসপার প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই কোষের ভেতরের ত্রুটিপূর্ণ জিনটি সংশোধন করা হয়।

সবশেষে, সেই সংশোধিত সুস্থ কোষগুলো আবার রোগীর শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগীরা দীর্ঘদিনের তীব্র যন্ত্রণা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পেয়েছেন এবং তাদের শরীরে স্বাভাবিক রক্তকণিকা তৈরি হতে শুরু করেছে।

এই ধরনের চিকিৎসার সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক দিক হলো-এটি রোগীকে আজীবন ওষুধ বা অন্যের রক্তের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে পারে।

অর্থাৎ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের চিরাচরিত দর্শনটাই এখানে বদলে যাচ্ছে: রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন ওষুধ দেওয়ার সনাতন ধারণার অবসান ঘটিয়ে, রোগ সৃষ্টির মূল কারণটিকেই শরীর থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলা হচ্ছে।

বর্তমানে চিকিৎসাক্ষেত্রে যে ধরনের জিন সম্পাদনা করা হচ্ছে এবং যার অনুমোদন রয়েছে, তা হলো সোমাটিক সম্পাদনা।

সোমাটিক বনাম জার্মলাইন: নীতিবিদ্যার দোটানা

বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রার সমান্তরালে হাত ধরাধরি করে আসে এক গভীর দার্শনিক ও নৈতিক সংকট।

জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে একবার বলেছিলেন, ক্ষমতার চরম শিখরে পৌঁছানোর চেষ্টা মানুষকে কখনো কখনো অতিমানবে রূপান্তর করে, কিন্তু তার নৈতিকতার ভিতকে কাঁপিয়ে দেয়।

জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান আজ সেই সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে আমাদের বুঝতে হবে সোমাটিক এবং জার্মলাইন সম্পাদনার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি।

বর্তমানে চিকিৎসাক্ষেত্রে যে ধরনের জিন সম্পাদনা করা হচ্ছে এবং যার অনুমোদন রয়েছে, তা হলো সোমাটিক সম্পাদনা।

এতে কেবল আক্রান্ত ব্যক্তির নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ বা কোষের (যেমন রক্ত বা লিভারের কোষ) জিন পরিবর্তন করা হয়। এই পরিবর্তনের ফলে রোগী নিজে সুস্থ হন, কিন্তু পরিবর্তিত জিনটি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শরীরে স্থানান্তরিত হয় না।

বিতর্ক ও আশঙ্কার মূল জায়গাটি হলো জার্মলাইন সম্পাদনা। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষের শুক্রাণু, ডিম্বাণু কিংবা মাতৃগর্ভে থাকা একদম প্রাথমিক স্তরের ভ্রূণের জিনগত পরিবর্তন ঘটানো হয়।

এর ফলে যে শিশুটির জন্ম হবে, সে তো রোগমুক্ত হবেই, পাশাপাশি তার পরবর্তী বংশধরেরাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই পরিবর্তিত জিনের অধিকারী হবে। অর্থাৎ, মানুষের বিবর্তনের ধারায় কৃত্রিমভাবে হস্তক্ষেপ করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, জার্মলাইন সম্পাদনার ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৈতিক আইনি কাঠামো বজায় রাখা জরুরি।

কারণ, এই প্রযুক্তি যদি কখনো অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তবে তা মানবজাতির জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আমরা কি কেবল জন্মগত রোগ দূর করতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করব, নাকি একসময় ধনী ও প্রভাবশালী শ্রেণি তাদের সন্তানদের কৃত্রিমভাবে আরও বুদ্ধিমান, দীর্ঘকায় কিংবা বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করার প্রতিযোগিতায় নামবে?

সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ডিজাইনার বেবি’র যুগ, যা সমাজে এক নতুন ধরনের জৈবিক বৈষম্য বা ‘জেনেটিক ক্লাসিজম’ তৈরি করতে পারে।

বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা ও অফ-টার্গেট ইফেক্টের চ্যালেঞ্জ

সম্ভাবনার পাশাপাশি জিন সম্পাদনার বৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতাগুলোও হেলাফেলা করার মতো নয়। মানুষের শরীর এক পরম বিস্ময়কর ও জটিল নেটওয়ার্ক।

ডিএনএ-র একটি সুনির্দিষ্ট সুতোয় টান দিলে পুরো শরীরের অন্য কোথাও তার কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা এখনো পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন।

ভুলবশত মূল লক্ষ্যবস্তুর বাইরে অন্য কোনো সুস্থ জিন কেটে ফেলার ঝুঁকি বা ‘অফ-টার্গেট ইফেক্ট’ ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ ডেকে আনতে পারে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্যই বিজ্ঞানীরা এখন কাজ করছেন ‘বেস এডিটিং’ ও ‘প্রাইম এডিটিং’ নিয়ে, যা মূলত ডিএনএ-র কোনো অংশ না কেটে সরাসরি একক অক্ষরকে প্রতিস্থাপন করতে পারে।

‘নেচার বায়োটেকনোলজি’র সাম্প্রতিক সংখ্যায় প্রকাশিত নিবন্ধে গবেষকেরা একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘আণবিক ওয়ার্ড প্রসেসর’ বলে অভিহিত করেছেন-যেমনটা আমরা কম্পিউটারে কোনো ভুল বানান ব্যাকস্পেস না চেপে কেবল সঠিক অক্ষরটি দিয়ে প্রতিস্থাপন করি।

এর বাইরে আরেকটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হলো ডেলিভারি সিস্টেম বা শরীরের সঠিক কোষে এই সংশোধিত উপাদানটি পৌঁছে দেওয়া।

বিশেষ করে রোগটি যদি কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো শরীরজুড়ে বা স্নায়ুতন্ত্রে বিস্তৃত থাকে, তবে প্রতিটি কোষে নিখুঁতভাবে জিন এডিটিং টুল পৌঁছে দেওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য এখনো এক বিশাল পরীক্ষা।

এই অনবদ্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সামনে আজ যে সবচেয়ে বড় বাস্তব ও রূঢ় দেয়ালটি দাঁড়িয়ে আছে, তা হলো-অর্থনীতি বা চিকিৎসার খরচ।

বর্তমানে অনুমোদিত জিন সম্পাদনাভিত্তিক চিকিৎসাগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আন্তর্জাতিক বাজার ও বিভিন্ন চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সিকেল সেল বা থ্যালাসেমিয়ার একক একজন রোগীর জিন থেরাপির খরচ প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, যে প্রযুক্তি মানবজাতিকে রোগমুক্ত করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তা কি কেবল পৃথিবীর মুষ্টিমেয় কিছু ধনী মানুষের বিলাসের সামগ্রী হয়ে থাকবে?

তৃতীয় বিশ্বের বা অনুন্নত দেশের সাধারণ মানুষের নাগালে এই চিকিৎসা কবে পৌঁছাবে, তা এক মস্ত বড় প্রশ্ন চিহ্ন। বিজ্ঞান যদি সবার জন্য সমতার পৃথিবী তৈরি করতে না পারে, তবে সেই বৈজ্ঞানিক অর্জন নৈতিকভাবে পূর্ণতা পায় না।

তা সত্ত্বেও, এই প্রযুক্তি মানবসভ্যতাকে এক অভূতপূর্ব ধারণাগত পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সাহিত্যিক ও দার্শনিকেরা যুগে যুগে মানুষের রোগ ও জরাকে প্রকৃতির এক অলঙ্ঘনীয় নিয়ম বা ‘নিয়তি’ হিসেবে দেখিয়েছেন।

এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে যে, অনেক মরণব্যাধি বা আজীবন বয়ে বেড়ানো কষ্টের মূল কারণটি বাইরের কোনো শত্রু নয়, বরং শরীরের ভেতরের আদি নকশার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা একটি সামান্য ভুল কোডিং।

গ্রিক ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে আধুনিক উপন্যাসেও মানুষের ভেতরের ত্রুটি বা রোগকে নিয়তির মার হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই নতুন জানলাটি মানুষের শরীরকে কোনো স্থির নিয়তি হিসেবে দেখে না, বরং একে দেখে একটি পরিবর্তনযোগ্য গতিশীল পদ্ধতি হিসেবে।

আগে চিকিৎসকেরা রোগকে দেখতেন শরীরের ওপর বাইরের কোনো শত্রুর ‘আক্রমণ’ হিসেবে, যাকে ওষুধ দিয়ে প্রতিহত করতে হতো।

এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে যে, অনেক মরণব্যাধি বা আজীবন বয়ে বেড়ানো কষ্টের মূল কারণটি বাইরের কোনো শত্রু নয়, বরং শরীরের ভেতরের আদি নকশার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা একটি সামান্য ভুল কোডিং।

আর সেই আদি নকশা বা কোডিংয়ে মানুষের হাত দিয়ে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাই জিন সম্পাদনাকে অন্য সব চিকিৎসা পদ্ধতি থেকে অনন্য ও শ্রেষ্ঠ করে তুলেছে।

এখানে এক নীরব এবং গভীর রূপান্তর ঘটে-চিকিৎসা আর কেবল বাহ্যিক কোনো রাসায়নিক হস্তক্ষেপ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে শরীরের নিজস্ব ভেতরের ভাষাটিকে নতুন করে লেখার এক মহত্তম প্রয়াস।

আমরা এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা, বিজ্ঞান ও নৈতিকতা-দুটি দিকই সমানভাবে আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট।

এটি একদিকে যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে আলোর নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে মানুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের ক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা ও আগামী প্রজন্মের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।

হয়তো খুব দূরের কোনো ভবিষ্যৎ নয়, যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিধান থেকে ‘জন্মগত রোগ’ শব্দবন্ধটি চিরতরে হারিয়ে যাবে। কারণ জন্মের আগেই ভ্রূণ অবস্থায় কিংবা জন্মের ঠিক পরপরই সেই ত্রুটি চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব হবে।

তখন হাসপাতালের করিডোরে বা চিকিৎসকের চেম্বারে সান্ত্বনার ভাষাও হয়তো একবারে বদলে যাবে।

“এই রোগ নিয়েই আপনাকে সারা জীবন বাঁচতে হবে”-বহু বছরের পুরনো, চেনা এবং বেদনাবিধুর এই অসহায় স্বীকৃতির জায়গায় সেদিন হয়তো বিজ্ঞানীর শান্ত ও প্রত্যয়ী কণ্ঠে উচ্চারিত হবে এক নতুন আশ্বাস: ‘আপনার শরীরের এই ক্ষুদ্র ত্রুটিটি আমরা চিহ্নিত করেছি, এবং আমরা তা চিরতরে ঠিক করে দিচ্ছি।’

  • কৌশিক আহমেদ লেখক ও সাংবাদিক।