ঢাকার কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নে বড় মনোহরিয়া এলাকায় জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্পের কাজ চলছে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নে বড় মনোহরিয়া এলাকায় জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্পের কাজ চলছে।

মতামত

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: প্রতিটি ইউনিয়নে সংরক্ষিত জলাশয়-উদ্যান জরুরি

সারা দেশে অনেক স্থানে অনেকের কাছে শুনেছি, তাদের বাড়ির পাশে নিকট অতীতে বিশাল বনজঙ্গল ছিল। বাঘ থাকার কথা অনেকের কাছে শুনেছি। রংপুরের উপকণ্ঠেও বাঘের ভয় ছিল। নদী-খাল-বিল নিয়ে যেহেতু সরেজমিনে কাজ করি, তাই লোকমুখে জানতে পারি, দেশজুড়ে নদী-খাল-বিল জলাশয় থাকার অসংখ্য গল্প। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ওঁরাওদের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। তাদের ধর্মগুরু শাস্ত্রীয় আলোচনায় যা জানালেন তার সারমর্ম, এ দেশে বনভূমি ছিল। এই বনভূমি মানুষে কেটে কেটে আজকের অবস্থায় নিয়ে এসেছে। ইতিহাসও সেই সাক্ষ্য বহন করে।

বনভূমি-জলাভূমির পূর্ববর্তী অবস্থায় আমাদের ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। দেশে ব্যাপক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছুটা নির্মমতা, কিছুটা প্রয়োজনে মানুষ বন উজাড় করেছে। জলাভূমির সর্বনাশও করেছে একইভাবে। বনভূমি ও জলাভূমি জীববৈচিত্র্যের আধার। পানিতে, বিশেষত বিলগুলোতে যে মাছ এবং পোকামাকড় থাকে, সেগুলোর সবটা পুকুরে কিংবা নদীতে থাকবে না। ফলে বিলের সংরক্ষণ প্রয়োজন আছে। মাছ ছাড়া আমরা অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণীর খবর তো রাখি না। প্রকৃতিতে সব রকম প্রাণের বেঁচে থাকার যেমন অধিকার আছে, তেমনি ভারসাম্য রক্ষায় এদের প্রয়োজনও আছে। আমরা এই প্রয়োজন একেবারেই ভুলে গেছি। অথচ আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে উদ্যান ও জলাশয়কে সংরক্ষিত ঘোষণা করা সম্ভব।

যে জলাশয়গুলো ভরাট হচ্ছে, সেগুলোকে আর আর জলাশয়ের রূপ দেওয়া হয় না। জলাশয় খনন করে পুকুরের রূপ দিলে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে না। জলাশয় সরকারিভাবে বিএডিসি, মৎস্য বিভাগ, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ক্ষেত্রবিশেষে এলজিইডিও খনন করে। খনন মানে, সেটাকে পুকুরে পরিণত করা। কখনো কখনো পুকুরের মতো খনন করে চারদিকে দেশি বৃক্ষ রোপণ করলে খারাপ নয়। কিন্তু খননে মনে রাখতে হবে, জলাশয় যেন তার নিজস্ব রূপ লাভ করে। সব প্রাণী গভীর পানিতে বাস করে না। বিলের সব কাদামাটি তুলে ফেললেও অনেক প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন। জলাশয় বিজ্ঞানসম্মতভাবে খনন করতে হবে।

সংরক্ষিত জলাশয় কিংবা বনের জন্য খুব বেশি টাকার প্রয়োজন হবে, এমনটাও নয়। দেশে যেহেতু অসংখ্য জলাশয় আছে, তাই প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে জলাশয়কে সংরক্ষিত ঘোষণা করা কঠিন কিছু নয়। এ জন্য কোনো জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে এমন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করতে পারে। আমরা দেশের উদ্ভিদ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে সংরক্ষিত জলাশয় ও উদ্যান চাই।

যেসব ইউনিয়নে বনভূমি আছে, সেসব ইউনিয়নে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ করার প্রয়োজন হবে না। নয়তো ইউনিয়ন পর্যায়ে কয়েক একর করে জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব। উদ্যানগুলো অবশ্যই ভিন্নধারায় হতে হবে। প্রতিটি উদ্যানে দেশের সব প্রজাতির অন্তত দুটি করে গাছ রোপণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারিভাবে এ কাজ করা সম্ভব না হলে এমন কোনো সংস্থাকে দিতে হবে, যারা বৃক্ষরোপণ এবং কিছুটা বড় করা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে।

উদ্যানের ভেতরে একটি পুকুর থাকতে পারে। উদ্যানের একটি অংশকে এমন প্রাকৃতিক জঙ্গলে রূপ দিতে হবে, যেন সেখানে বনবিড়াল, শিয়াল, বেজি, সাপসহ জঙ্গলের প্রাণীরা নিরাপদে থাকতে পারে। উদ্যানে সব ধরনের গাছ রোপণ ছাড়াও সেই সব গাছ বেশি পরিমাণে রোপণ করতে হবে, যার ফল, ফুল, ফুলের মধু পাখিরা খেতে পারে। গাছগাছালিতে ছোট ছোট অসংখ্য পোকামাকড় বেড়ে ওঠে। ওই পোকামাকড় খেয়ে অনেক পাখি-প্রাণী বেঁচে থাকে। আমাদের দেশের সুলভ-দুর্লভ সব ধরনের গাছ যখন প্রতিটি ইউনিয়নে থাকবে, তখন দেশের জনগণও গাছ চিনবে খুব সহজে।

দুর্লভ গাছ পাওয়া সহজ নয়। আমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চার শতাধিক প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করেছি। এই গাছ সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেছি, কাজটি অনেক কষ্টসাধ্য। দুর্লভ গাছের চারা সংগ্রহে আমাকে সবচেয়ে বড় সহযোগিতা করেছেন বৃক্ষবিদ মোকারম হোসেন। যখন সারা দেশে একেক প্রজাতির হাজার হাজার গাছ প্রয়োজন হবে, তখন সরকারি নার্সারিগুলো এসব গাছ উৎপাদনের কাজ করতে পারবে।

জলাশয়গুলো এখন লিজ দেওয়া হয়। যাঁরা লিজ গ্রহণ করেন, তাঁরা কৃত্রিম উপায়ে মাছ চাষ করেন। এই মাছ চাষ করার সময়ে পানি ওষুধ দিয়ে পরিষ্কার করেন। এই পরিষ্কার করার অর্থ হচ্ছে মাছসহ সব ধরনের পোকামাকড় মেরে ফেলা। এমনকি লিজের সময় যখন শেষ হয়, তখনো বিষ প্রয়োগ করে শেষ মাছটিও ধরে নিয়ে যায়। মাছের ব্যাপক উৎপাদনের জন্য হয়তো এসব পদ্ধতি তাঁরা অবলম্বন করেন। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে দেশীয় মাছ, তথা জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, সেটি তো আমরা খেয়াল রাখছি না। শাপলা, পদ্মসহ অনেক জলজ উদ্ভিদ রক্ষা করা প্রয়োজন আছে।

উদ্যান এবং বিল একসঙ্গে হতে পারে। যদি বিলের আয়তন বড় হয়, তাহলে বিলের স্বাভাবিক রূপ ঠিক রেখে পাড়ে উদ্যান গড়ে তোলা সম্ভব। এ রকম একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলায় ভাড়ারদহ নামের একটি বিল আছে। কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম, বিলটি ভরাট হয়েছে।

সরকারি বিলের তালিকায় ছিল না বিলটি। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী ফজলুল হক বদরগঞ্জে চাকরি করতেন। তিনি বিলটি অবৈধ দখল থেকে মুক্ত করে খনন করেন। সেই বিলের চারদিকে শতাধিক প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করেছেন। বিলের পাড় এখন ফুলে ফুলে ভরা। বিলে হাজার হাজার পাতিসরালিসহ বিভিন্ন পাখির কলতানে ভরা। ভাড়ারদহ বিলটি আদর্শ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে এমন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করতে পারে। আমরা দেশের উদ্ভিদ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে সংরক্ষিত জলাশয় ও উদ্যান চাই।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক