জেফরি এপস্টেইন ও তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল
জেফরি এপস্টেইন ও তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল

মতামত

এপস্টেইন ফাইলস: যৌন অপরাধের আড়ালে মোসাদ ও সিআইএর গোপন জাল

জেফরি এপস্টেইনের নাম উচ্চারিত হলেই প্রথমে মনে পড়ে এক ভয়ংকর অপরাধীর কথা। কিন্তু ধীরে ধীরে সামনে আসে আরও গভীর ও অস্বস্তিকর এক বাস্তবতা, যেখানে যৌন অপরাধ, অঢেল অর্থ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অদৃশ্য সুতাগুলো একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, জেফরি এপস্টেইন সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাতার আক্রমণের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে জানতেন। এ ছাড়া ইউরো মুদ্রাকে ধসের হাত থেকে রক্ষায় যে উদ্ধার–প্যাকেজ নেওয়া হয়েছিল, সেটি কার্যকর হওয়ার আগেই বিষয়টি নিয়ে অবগত ছিলেন এপস্টেইন। এমনকি ধারণা করা হয়, ২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে রাশিয়া সতর্ক করেছিল বলেও তাঁর কাছে তথ্য ছিল।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়া এই যৌন অপরাধীর কথোপকথনের এসব টুকরো তথ্য আজ নতুন করে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে। প্রশ্নটি হলো, জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে কি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল?

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত লাখ লাখ নথিতে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমন কিছু নেই, যা দেখিয়ে বলা যাবে—এপস্টেইন নিয়মিত সিআইএ, এমআই ৬ বা মোসাদের দপ্তরে যেতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁর সে প্রয়োজনও ছিল না। সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রদূত, বিশ্বনেতা ও ধনকুবেররাই তাঁর কাছে যেতেন।

ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থিত এপস্টেইনের ব্যক্তিগত যে দ্বীপে অল্প বয়সী মেয়েদের পাচার করে যৌন নিপীড়ন চালানো হতো, সেখানেই গড়ে উঠেছিল এক অভিজাত, অদৃশ্য ও ক্ষমতাবান নেটওয়ার্ক।

এপস্টেইন এমন এক স্তরে বিচরণ করতেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদার গোয়েন্দা কর্মকর্তা বা বিশ্লেষকদের জগতের বাইরে। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সঙ্গে জেফরি এপস্টেইনের ই–মেইল যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

একপর্যায়ে সেই ঘনিষ্ঠতা এতটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এপস্টেইন নিজেই বারাককে অনুরোধ করেন যেন প্রকাশ্যে বলা হয় তিনি মোসাদের হয়ে কাজ করেন না। তবে এপস্টেইনের গোয়েন্দা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক যোগাযোগের ইতিহাস আরও আগের। পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

গত ১৯ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে পাওয়া এবং রয়টার্স কর্তৃক মুদ্রণ ও সজ্জিত করা জেফরি এপস্টেইনের কিছু নথি

এই সংযোগের প্রথম সূত্র পাওয়া যায় ডোনাল্ড বারের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ওএসএসের সদস্য ছিলেন ডোনাল্ড বার। ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তিনিই এপস্টেইনকে নিউইয়র্কের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

ডোনাল্ড বার অবসরে অশ্লীল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখতেন। তাঁর ছেলে বিল বার তখন সিআইএতে কর্মরত ছিলেন। বিল বার পরে রিগ্যান ও জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল হন। ১৯৭৬ সালে ডাল্টন স্কুল ছাড়ার পর এপস্টেইন যোগ দেন বেয়ার স্টার্নস বিনিয়োগ ব্যাংকে।

কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্থান শুরু হয় ১৯৮১ সালে, যুক্তরাজ্যে এক সফরের সময়। সেখানে তিনি পরিচিত হন ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবসায়ী ডগলাস লিসের সঙ্গে। এই লিসই তাঁকে ইসরায়েলি ব্যবসায়ী রবার্ট ম্যাক্সওয়েল এবং সৌদি অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

লিস ছিলেন সৌদি আরবের কাছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান বিক্রির ঐতিহাসিক চুক্তির মধ্যস্থতাকারী। নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায়, তিনি এপস্টেইনকে অভিজাত বৈঠকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং একধরনের অভিজাত নেটওয়ার্কে গড়ে তুলতেন। এ সময়েই ঘটে ইরান কনট্রা কেলেঙ্কারি। সামনে আসে যে রিগ্যান প্রশাসন গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে এবং সেই অর্থ নিকারাগুয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সহায়তায় ব্যবহার করে। এই পুরো লেনদেনে ইসরায়েল ছিল গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী।

এই পর্বে এপস্টেইন যুক্ত হন সাবেক মার্কিন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা জে স্ট্যানলি পটিঞ্জারের সঙ্গে। বাহ্যিকভাবে তাঁদের প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকির কৌশল বিষয়ে পরামর্শ দিত। কিন্তু বাস্তবে উঠে আসে যে ইরানে অস্ত্র সরবরাহসংক্রান্ত নানা তৎপরতায় তাঁরা জড়িত ছিল। এই সময় সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি হয়ে ওঠেন এপস্টেইনের অন্যতম বড় ক্লায়েন্ট। এপস্টেইনের নিউইয়র্কের বাসভবন থেকে একটি ভুয়া অস্ট্রিয়ান পাসপোর্ট উদ্ধার হয়, যেখানে তাঁর ঠিকানা হিসেবে সৌদি আরবের নাম লেখা ছিল।

মৃত্যুর এক বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এপস্টেইনের আগ্রহ স্পষ্ট ছিল। ২০১৮ সালের এক ই–মেইলে তিনি ধারণা দেন, সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক সৌদি যুবরাজকে ফাঁদে ফেলেছিলেন।

এপস্টেইনের জীবনে সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আসে ম্যাক্সওয়েল পরিবারের মাধ্যমে। এপস্টেইনের সঙ্গিনী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ছিলেন রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের মেয়ে। রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ছিলেন একসময়ের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম মালিক। এ ছাড়া তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা। মোসাদ, এমআই ৬ ও কেজিবির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে বহু সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

ইরানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে নিজের ইয়ট (ব্যক্তিগত বিলাসী জাহাজ) থেকে পড়ে রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এর কিছুদিন আগেই গিসলেনের সঙ্গে এপস্টেইনের পরিচয় ঘটে।

একটি ই–মেইলে এপস্টেইন দাবি করেন, ম্যাক্সওয়েল মোসাদের হয়ে কাজ করতেন এবং অর্থ না দিলে তিনি গোপন তথ্য ফাঁসের হুমকি দিয়েছিলেন। এপস্টেইনের জীবনের আরেক কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন মার্কিন ধনকুবের লেস ওয়েক্সনার। ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটসহ একাধিক বড় ব্র্যান্ডের মালিক এই ব্যবসায়ীর প্রায় পুরো সম্পদের নিয়ন্ত্রণই ছিল এপস্টেইনের হাতে।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরান কনট্রা কেলেঙ্কারিতে ব্যবহৃত কিছু বিমান পরে ওয়েক্সনারের পোশাক পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। শিশু পাচারের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার পরও এপস্টেইনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থেমে থাকেনি। তিনি ইসরায়েল ও মঙ্গোলিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে কাজ করেন। এহুদ বারাকের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করেন। এমনকি রাশিয়ার সঙ্গেও গোপন যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন।

মৃত্যুর এক বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এপস্টেইনের আগ্রহ স্পষ্ট ছিল। ২০১৮ সালের এক ই–মেইলে তিনি ধারণা দেন, সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক সৌদি যুবরাজকে ফাঁদে ফেলেছিলেন।

  • শন ম্যাথিউস মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডিল ইস্ট আই–এর সাংবাদিক

মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত