বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বিপজ্জনক ধারণা হচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরান অথবা ইসরায়েলের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে অতীব সরল এ ধারণা কৌশলগত দিক থেকে বিভ্রান্তিকর।
এ ধারণা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার ইস্যুকে এক আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে মিলে আরেক শক্তির বিরোধিতায় পর্যবসিত করে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল উদ্দেশ্য ইরানকে রক্ষা করা কিংবা ইসরায়েলের আঞ্চলিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা নয়; বরং তাদের স্বার্থ হচ্ছে এই অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা।
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যেকোনো উত্তেজনার প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশসীমা, নৌ-বাণিজ্যপথ, জ্বালানি অবকাঠামো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর পড়ে।
দূর থেকে নীরব হয়ে বসে থাকাও সম্ভব নয়। সংঘাতের খেসারত দিতে হয় তাদেরই। তাই ইরান অথবা ইসরায়েলের মধ্যে একটা বেছে নেওয়া নয়, বরং স্থিতিশীলতা অথবা স্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজে থেকে কোনো সংঘাত শুরু না করলেও শেষ পর্যন্ত তারা সেই যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়। গত জুনে ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন সেই সংঘাতের আঁচ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে দোহাকে লক্ষ্য করে একটি ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং একই সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতা।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, কাতারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় ভিত্তি হচ্ছে মধ্যস্থতা, সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা। এই নিরপেক্ষ অবস্থানও তাদের রক্ষা করতে পারেনি। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় পর্যায়ের সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের বাকি অংশেও ছড়িয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের আগেও ইরান-সম্পৃক্ত ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি, প্রক্সি নেটওয়ার্ক, আদর্শগত চাপ, সামুদ্রিক নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিজ্ঞতা উপসাগরীয় দেশগুলোর হয়েছিল। ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং হরমুজ প্রণালিকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা উপসাগরীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ইরানকে হুমকি হিসেবে স্বীকার করা মানে যুদ্ধকে কৌশল হিসেবে মেনে নেওয়া নয়। ইরানের চাপ নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর যুদ্ধ রোধের আরও স্বার্থ আছে। এ যুদ্ধ তাদের তাদের অবকাঠামো, অর্থনীতি ও উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে তাদের যেমন দমনের বিরোধিতা করতে হবে, তেমনি হিসাব-নিকাশের ত্রুটি এড়াতে যোগাযোগের পথও খোলা রাখতে হবে।
ইরানকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় দেশগুলোর কিছু উদ্বেগ হয়তো ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যেতে পারে, কিন্তু উভয়ের স্বার্থ এক নয়। ইসরায়েলের নিজস্ব নিরাপত্তানীতি, অভ্যন্তরীণ চাপ, সামরিক সমীকরণ এবং আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এর সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর অগ্রাধিকারের কোনো মিল নেই।
ইসরায়েল হয়তো উত্তেজনাকে শত্রুদের দুর্বল করা বা নিজের আধিপত্য পুনরুজ্জীবিত করার একটি উপায় হিসেবে দেখতে পারে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই উত্তেজনা তাৎক্ষণিক ক্ষতি বয়ে আনে। যে সংঘাত তেল আবিবের কাছে সামালযোগ্য, সেটা উপসাগরীয় বাস্তবতায় অনেক বিপজ্জনক হতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি হাত মেলানোও ঝুঁকিপূর্ণ। এটি উপসাগরকে একটা শক্তির নিরাপত্তা এজেন্ডার ঘাঁটিতে পরিণত করার পাশাপাশি ফিলিস্তিন ইস্যুকেও উপেক্ষা করে। এই ইস্যু যেকোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতার বৈধতার একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়।
যুদ্ধের মুখে পড়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন ভিন্ন ভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে। সেগুলো কখনো পরিপূরক, কখনোবা পরস্পরবিরোধী। ইরানের ব্যাপারে কাতারের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের কঠোর অবস্থানের একেবারেই ভিন্ন। আবার, তেহরানের সঙ্গে ওমান এমন কিছু যোগাযোগ বজায় রেখেছে, যা বাকিরা রাখেনি।
তবু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি স্পষ্ট ও অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
নৌ চলাচলের স্বাধীনতা কেন্দ্রীয় বিষয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা কোনো তাত্ত্বিক আইনি নীতি বা পশ্চিমা স্লোগান নয়। এটি একটি জাতীয় প্রয়োজনীয়তা। হরমুজ প্রণালি, ওমান উপসাগর, বাব আল-মানদেব ও অন্য নৌপথগুলো তাদের জ্বালানি রপ্তানি, খাদ্য আমদানি, শিল্প উৎপাদন এবং বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান জীবনরেখা। এই পথগুলোকে হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকেই হুমকিতে ফেলে দেয়।
তবে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সংকটকালীন যোগাযোগব্যবস্থা, আগাম সতর্কবার্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানসহ এমন এক কূটনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি হ্রাস করবে।
এখন আর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিচ্ছিন্ন থাকা অসম্ভব। বর্তমানে যে পরিস্থিতি, সেখানে এমন এক বহুমুখী কৌশলের প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে প্রতিরোধব্যবস্থা ও কূটনীতিকে একত্র করবে। যেকোনো ছোটখাটো ঘটনাকে বড় যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকাতে মধ্যস্থতা এবং পর্দার আড়ালের যোগাযোগ অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার। যেখানে দ্রুত বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, সেখানে পারস্পরিক যোগাযোগ হলো নিরাপদ কৌশল।
কোনো নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা নয়, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর জবাব হওয়া উচিত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’। অর্থাৎ নিজেদের নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত অন্যের হাতে ছেড়ে না দিয়ে ও নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে না দিয়ে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা।
আকাশ প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সংকটকালীন কূটনীতিকে অবশ্যই অভিন্ন অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। উপসাগরীয় দেশগুলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি চিরস্থায়ী যুদ্ধের একটি নাট্যমঞ্চ হতে চায়, নাকি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার রূপকার হতে চায়।
স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করা কোনো মোলায়েম স্লোগান নয়; এটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত নীতি। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান হলো ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে কাউকে বেছে না নিয়ে নিজেদের বেছে নেওয়া। নিজেদের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকাকে বেছে নেওয়া।
আবদুল্লা বান্দার আল-ইতাইবি কাতার ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক।
আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।