
ভারতে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অধীন হিন্দুত্ববাদের উত্থান স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশকে উদ্বিগ্ন করেছে। ভৌগোলিক বাস্তবতা এ উদ্বেগের একটি কারণ—তিন দিক থেকে ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে।
কিন্তু আরও গভীর উদ্বেগের উৎস ভারতের অভ্যন্তরীণ আদর্শগত রূপান্তর। যে দেশ একসময় মধ্যপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর—বিশেষত স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কংগ্রেসের—দ্বারা পরিচালিত হতো, সেই দেশ আজ রাজনৈতিক ভারসাম্য হারিয়ে দ্রুত এগোচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দিকে।
ভারতে বিজেপি তার উত্থান নির্মাণ করেছে হিন্দু পরিচয়, সাংস্কৃতিক পুনরুত্থান ও রাজনৈতিক সংগঠনের এক শক্তিশালী সমন্বয়ের ওপর। হিন্দু ধর্মালম্বীদের হিন্দুত্ববাদের পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান প্রথমে গুজরাটে শিকড় গেড়ে পরে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আজ হিন্দুত্ববাদ আর প্রান্তিক কোনো স্লোগান নয়; শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি ভারতীয় জাতিসত্তার নতুন পরিচয়, যা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
কিন্তু এই রূপান্তরের সঙ্গে আরও জরুরি কিছু প্রশ্নও উঠে আসে। এগুলো শুধু ভারতের প্রতিবেশীদের জন্য নয়, ভারতের নিজস্ব নাগরিকদের জন্যও। ভারতের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য—আনুমানিক ২২ কোটি ৪০ লাখ মুসলমান, ৪ কোটি ৪০ লাখ খ্রিষ্টান, ২ কোটি ৫০ লাখ শিখ এবং ১ কোটি বৌদ্ধ। সেই সঙ্গে আছে ২০ কোটির বেশি দলিত শ্রেণির মানুষ। প্রকৃতপক্ষে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ—ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পরেই। যারা হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী নয়, তাদের ভবিষ্যৎ কী? তারা কি কম ভারতীয়? জন্মভূমিতে তাদের ধর্ম কি তাদের বহিরাগত করে তোলে?
দুর্ভাগ্যবশত, এ প্রশ্নগুলো কেবল ভারতের জন্য নয়; এগুলো এক বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিফলন—রাজনীতিতে ধর্মের পুনরুত্থান।
আজ বিশ্বজুড়ে ধর্ম রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে পরিচয়ের চিহ্ন হিসেবে এবং জনমত সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও—যার সংবিধান ধর্ম ও রাষ্ট্রের কঠোর বিচ্ছেদ নিশ্চিত করে—খ্রিষ্টান ইভানজেলিক আন্দোলন আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করেছে। ইউরোপে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও বেলজিয়ামের ডানপন্থী দলগুলো ‘খ্রিষ্টান পরিচয়’ ব্যবহার করছে ধর্মতত্ত্ব হিসেবে নয়, বরং অভিবাসন ও ইসলামের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক অস্ত্র হিসেবে।
অনেক পণ্ডিত রাজনৈতিক ইতিহাসকে এক চক্রের ঘূর্ণি বলে বর্ণনা করেন। সমাজে বেশি উদারতাবাদের পর আসে রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়া; ধর্মনিরপেক্ষতার পর ধর্মীয় পুনরুত্থান; বিশ্বায়নের পর জাতীয়তাবাদী সংকোচন। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পতন—যা একসময় তরুণদের আদর্শ ছিল—ঘটেছে সংস্কৃতিগতভাবে রক্ষণশীল, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থানের সমান্তরালে। এই পরিবর্তন একক কোনো কারণে নয়; বরং পরিচয় সংকট, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জনমতের রূপান্তর এবং মানুষের একাত্ম হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত ফল।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় ধর্মই শাসনব্যবস্থার ভিত্তি ছিল। ইসলামি খেলাফত ধর্মবিশ্বাস ও রাষ্ট্রকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত। ধর্ম ও রাজনীতির বিচ্ছেদের আধুনিক ধারণা আসে আলোকায়ন যুগ এবং আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দেশ হিসেবে সংবিধানে ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদকে প্রতিষ্ঠা করে, যা ২৫০ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে আছে। ইউরোপও পরে ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হাঁটে, আর রাশিয়া ও চীনে কমিউনিস্ট সাম্যবাদ ধর্মকে আরও কঠোরভাবে জনজীবন থেকে সরিয়ে দেয়।
কিন্তু বিশ শতক এক অদ্ভুত উপহার দেয়—দশকের পর দশক ধর্মনিরপেক্ষতার পর মানুষ আবার ধর্মে ফিরে আসে রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে খ্রিষ্টান ডেমোক্রেটিক দলগুলো মূলধারার শক্তি হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-এর দশকের শেষ থেকে ইভানজেলিক গোষ্ঠীগুলো রিপাবলিকান পার্টিকে পুনর্গঠিত করে। তুরস্কে আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান থাকা সত্ত্বেও ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলন ১৯৭০-এর দশক থেকে শক্তি অর্জন করে।
অনেক পণ্ডিত মনে করেন, রাজনৈতিক ইতিহাস চক্রাকারে ঘোরে—উদারীকরণ রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে, কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় পুনরুত্থান সৃষ্টি করে, আর বিশ্বায়ন জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া উসকে দেয়। একসময় প্রভাবশালী বামপন্থী মতাদর্শ—সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ—যখন ম্লান হয়ে গেছে, তখনই ডানমুখী, সংস্কৃতিগতভাবে রক্ষণশীল ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে। এই উত্থান স্থায়ী আদর্শগত পরিবর্তন নয়; বরং বৃহত্তর ঐতিহাসিক চক্রের অংশ বলেই অনেকে মনে করেন। সমালোচকেরা বলেন, এই পুনরুত্থান এসেছে পরিচয় সংকট, বিশ্বায়ন, পুরোনো মতাদর্শের ক্ষয়, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং মানুষের নিরাপত্তা ও অন্তর্গত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত প্রভাবে।
গত একশ বছরে বিশ্ব নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুধু অটোমান সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করেনি, বিশ্বমানচিত্রকেও পাল্টে দিয়েছে; পাশাপাশি রাজনীতিতে এনেছে ধর্মবিরোধী নতুন মতাদর্শ। প্রথমত ধর্মনিরপেক্ষতা, যা আলোকায়ন ও ফরাসি বিপ্লবের পর রাজনীতিতে প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত আরও আক্রমণাত্মক রূপে আসে সাম্যবাদ, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ায় এবং পরে ইউরোপ ও চীনে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম ইউরোপে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মীয় সংঘাতের ক্লান্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে জনপ্রিয় করে, আর রাশিয়া ও চীনে অত্যাচারী সম্রাটদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সাম্যবাদকে শক্তিশালী করে।
কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোয় বিদ্রূপাত্মকভাবে মানুষ আবার ধর্মে ফিরে আসে এবং তাদের বিশ্বাসের প্রতি অনুগত রাজনীতিবিদদের সমর্থন করতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে খ্রিষ্টান ডেমোক্রেটিক দলগুলো মূলধারার শক্তি হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে মোরাল মেজোরিটির মতো সংগঠন ইভানজেলিক ভোটারদের রিপাবলিকান পার্টিতে সংগঠিত করে। তুরস্কে আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান থাকা সত্ত্বেও ১৯৭০-এর দশক থেকে ইসলামি দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করে।
ভারতের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া বিশ্ব ইতিহাসে কোনো ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এর পরিণতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারতের আকার, বৈচিত্র্য ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস। উপমহাদেশ বারবার দেখেছে ধর্মীয় মেরুকরণ কীভাবে সমাজকে ছিন্নভিন্ন করতে পারে—বিভক্তি থেকে শুরু করে ভারত ও বাংলাদেশের দাঙ্গা পর্যন্ত।
এ বিপদ কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। যখন সংখ্যালঘুরা কোণঠাসা বোধ করে, যখন রাজনৈতিক ভাষ্য তাদের বহিরাগত হিসেবে চিত্রিত করে, যখন আইন ও নীতি এক সম্প্রদায়কে অন্যদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়—তখন ফলাফল অনুমেয়—বিচ্ছিন্নতা, ক্ষোভ এবং শেষ পর্যন্ত অস্থিরতা। উগ্রবাদ উগ্রবাদকে নিভিয়ে দেয় না; বরং উসকে দেয়।
ইতিহাস কঠিন শিক্ষা দেয়। আয়ারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেখিয়েছে—এক ধর্মীয় পরিচয়কে উচ্চে তুলে অন্যটিকে অবমূল্যায়ন করলে সহিংসতার চক্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে পারে।
ভারতের নেতারা হয়তো দশকের পর দশক ক্ষমতা সুসংহত করতে চান, কিন্তু গণতন্ত্রে প্রকৃত শক্তি আসে সব মানুষের সম্মতি থেকে—শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়। ভারত কোনো এক রথের দেশ নয়; এটি ধর্ম, ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর এক মোজাইক। ভারতের শক্তি বরাবরই এসেছে এই বহুত্ববাদ থেকে।
বাংলাদেশের জন্য হিন্দুত্ববাদের উত্থান কেবল ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ নয়; এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—পরিচয়কে অস্ত্র বানালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জটি অভ্যন্তরীণ—তারা কি সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুত্ববাদী চেতনা রক্ষা করতে পারবে, যা দীর্ঘদিন ধরে তাদের জাতীয় চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছে? ভারত বড় দেশ হলেও তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও পড়ে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো ভারতের আপাতদৃষ্টিতে একটি ধর্মের অনুসারীদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের এ দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিকে আরও জোরালো করবে। এটা ভারতের জন্য শুভ হবে না।
বিশ্ব ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির চক্র দেখতে থাকবে। কিন্তু যে দেশগুলো সাম্প্রদায়িক বিভাজনের যন্ত্রণা ভোগ করেছে, তাদের পক্ষে আত্মতুষ্টি বিপজ্জনক। ভারতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা—এবং পুরো অঞ্চলের শান্তি—নির্ভর করে এমন নেতৃত্বের ওপর, যারা বুঝতে পারে, বহু ধর্মের দেশে এক ধর্মকে উচ্চে তুলে অন্যদের নিচে রাখা যায় না।
বহুত্ববাদ ভারতের বোঝা নয়। এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আশা করা যায়, নেতারা এই সত্য ভুলে যাবেন না—তার আগে যেন মূল্যটা খুব বেশি না হয়ে যায়।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী সাবেক সরকারি ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব