
নির্বাচন সংযুক্তির স্মারক মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে বিভক্তির কারক। নির্বাচন মানে কাউকে না কাউকে বেছে নেওয়া আর অন্যদের উপেক্ষা করার এক বিশেষ প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনের নামে অন্যদের উপেক্ষার অর্থ বোঝা সহজ নয়। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। আর তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির গোড়াপত্তন করেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি ভারতের রাজনীতিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে পরিচিত। ১৯৫১ সালে তাঁর হাতেই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজিপি) মতাদর্শগত পূর্বসূরি ‘ভারতীয় জনসংঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় উদ্যাপনের অংশ হিসেবে পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গভীর শ্রদ্ধায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে স্মরণ করেন। পশ্চিমবঙ্গকে শ্যামাপ্রসাদের মাটি হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন।
মূল কথা, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকড় পশ্চিম বাংলার মাটিতেই গাড়া হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে, যা এখন মহিরুহরূপে বিকশিত হলো।
এ নির্বাচন দারুণ বিভক্তিরেখা টেনে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমাজের অন্তঃস্রোতে। ক্ষয় ও ক্ষরণ শুরু হয়েছে। সম্পর্কগুলো ভাঙতে শুরু করেছে। এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষত কেন্দ্রের দোর্দণ্ড হস্তক্ষেপ ও স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) তৎপরতা নির্বাচনী পরিবেশকে ক্লেদাক্ত করে তুলেছিল। এবারে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিশেষ কিছু প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।
এ ভোটযুদ্ধ গেরুয়া রং, জয় শ্রীরাম, জয় বাংলা, মাছে-ভাতে বাঙালি ইস্যুতে বিভক্তিরেখা টেনে দেয়। বিজেপির সমর্থকদের ভেতর গেরুয়া রঙের প্রতি আসক্তি লক্ষ করা যায়, যা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে। এই তৎপরতা ভারতব্যাপী হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর করে তুলেছে। গেরুয়া রঙের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের এই মোহ এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
গেরুয়া রং প্রধানত ত্যাগ, সাহস, পবিত্রতা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মে সন্ন্যাস বা ত্যাগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এ রং মনের শান্তি, আত্মচেতনা ও ইতিবাচক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে বলে বিশ্বাস চালু আছে। বিজেপির সমর্থকেরা গেরুয়া রং ব্যবহার করে মূলত দলের মূল আদর্শ হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতিক ধারণাকে তুলে ধরতে চাচ্ছেন।
ভারতের মানচিত্রজুড়ে গেরুয়া রঙের আধিক্য বাড়ল। যোগাযোগ তাত্ত্বিক হার্বার্ট মিড তাঁর ‘সিম্বলিক ইন্টারঅ্যাকশনিজম’ তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন, মানুষের যোগাযোগ মিথস্ক্রিয়া মূলত প্রতীকাশ্রয়ী। এ প্রতীকের যোগাযোগের ফিলিং স্ট্রাকচার বা অনুভব-কাঠামো।
গেরুয়া রং ঘিরে ভারতজুড়ে গড়ে উঠেছে এক ইস্পাতকঠিন জনমনোভঙ্গি। এই গেরুয়া রং বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে এবং স্পাইরাল অব সাইলেন্স বা নৈঃশব্দ্যের ক্রমবিকাশের মতো কখনো সরবে, কখনোবা নীরবে লাখো মানুষের অন্তর্জগতের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দিচ্ছে। ভারতের ৩১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ২১টিতে বিজেপি একক বা জোটগতভাবে ক্ষমতায় রয়েছে। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় বিজেপির আসন এখন ২৪৫টি।
বহু বর্ণের ভারত পড়েছে এক বর্ণের শাসনে। গেরুয়া রং সর্বব্যাপী রূপ ধারণ করতে চাচ্ছে। এর পেছনের রাজনীতি হলো হিন্দুত্ববাদ ছড়িয়ে দেওয়া। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করেন এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মতবাদ, যার উৎস জনমানুষের সাংস্কৃতিক ও যাপিত জীবন। কিন্তু সমকালীন পরিস্থিতি তার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। মূলত হিন্দুত্ববাদীরা চাচ্ছেন এক ধর্মের শাসন। ধর্মের সহনশীল দিকের চেয়ে উগ্রবাদী দিককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এক বৃহৎ ধর্মের ব্যাখ্যা হোমরাচোমরাদের হাতে পড়ে সংকোচনের চোরাগলি ধরেছে।
অর্জুন আপ্পাদুরাই গ্লোবাল স্টাডিজের বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত। পড়ান নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আপ্পাদুরাইয়ের ফিয়ার অব স্মল নাম্বার অর্থাৎ ছোট সংখ্যার ভয় নামে একটি বই রয়েছে। খুব শক্তিশালী বই। তিনি বলেছেন, মানুষ মূলত ছোট সংখ্যা দেখে ভয় পায়। ছোট সংখ্যা বড়দের ভয়ের অন্যতম কারণ। যেমন ধরুন, ভারতের ১০টি রাজ্যে বিজেপির শাসন নেই, আছে ২১টিতে সরাসরি বা জোটবদ্ধভাবে। কিন্তু এই ১০টি রাজ্য নিয়ে বিজেপির শঙ্কা বা আতঙ্কের শেষ নেই।
এ ১০টি রাজ্যে গেরুয়া রং বসাতে চায়, একটি পূর্ণাঙ্গ গেরুয়াসর্বস্ব মানচিত্র বানাতে চায়। এভাবেই ছোট সংখ্যা বড়দের ভেতর নানা অস্বস্তি তৈরি করে। অসম্পন্নের অনুভব জাগায়।
এ কারণে তাদের কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠাতে হচ্ছে, এসআইআর করতে হচ্ছে, লাখ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হচ্ছে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নাগরিকত্ব ধরে আছেন, ভোট দিচ্ছেন। এর পেছনে মূলত রয়েছে অসম্পূর্ণতার অনুভব। অর্থাৎ সংখ্যাধিক্যের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধই বেঁচে থাকবে। অন্যদের উপস্থিতি, তা যত নগণ্য হোক, থাকবে না। বড়রা এভাবে ছোটদের দ্বারা তাড়িত হচ্ছে। বড়রা ভীত ছোটদের উপস্থিতি দেখে। এই বড়করণ সংস্কৃতির আরেক নাম প্রান্তিকীকরণ বা একচেটিয়াতন্ত্র।
কর্তৃত্ববাদী কাঠামোয় যেসব প্রতিষ্ঠান ছোটদের গিলে ফেলার অপচর্চাকে মদদ দেয়, রাষ্ট্র তার মধ্যে অন্যতম। রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ ব্যবহার করে কখনো সজোরে, কখনো–বা নীরবে ছোটদের খেয়ে ফেলা হচ্ছে।
লরেন্ট গায়ার ও ক্রিস্টটোপ জেফরিলটের যৌথ সম্পাদিত মুসলিমস ইন ইন্ডিয়ান সিটিজ: ট্র্যাজেক্টরিজ অব মার্জিনালাইজেশন গ্রন্থের শুরুর অধ্যায়ে জাস্টিস রাজিন্দর সাচারের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ হলো: ‘একটি রাষ্ট্র কতটুকু সভ্য, তা যাচাইয়ের অন্যতম মাপকাঠি হলো সে রাষ্ট্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে কতটুকু বিশ্বাস ও আস্থার সঙ্গে নিতে পারে।’ রাজনৈতিক মতবাদও এর বাইরে নয়।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং জাস্টিস রাজিন্দর সাচারের নেতৃত্বে ভারতের মুসলমানদের প্রান্তিকীকরণ চিত্র বোঝার জন্য একটি কমিশন গঠন করেন।
ভারতীয় মুসলমানদের প্রান্তিকীকরণের যে চিত্র কমিশন উন্মোচন করেছে, তা কেবল বেদনাদায়ক নয়; নির্মমও বটে। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে একটি সম্প্রদায়কে ঠেলতে ঠেলতে কোনো পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সাচার কমিশন তা নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরেছে। সালমান খুরশিদ অ্যাট হোম ইন ইন্ডিয়া: দ্য মুসলিম সাগা গ্রন্থে একই ধরনের চিত্র তুলে ধরেছেন।
ভারতে মুসলিমসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রান্তিকীকরণ চলছে এবং তা চলছে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শগুলোর ওপরও। বিজেপি ভারতজুড়ে গেরুয়া রঙের রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চাচ্ছে।
আরেকটি বিষয় হলো ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ভেতর একধরনের শুদ্ধীকরণ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাদের মতাদর্শের রং পরিশুদ্ধ, এমন এক বোধের বিচ্ছুরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। ঘুসপেটিয়া নামক রূঢ় শব্দের আধিক্য দেখলাম। ঘুসপেটিয়া হলো তারা, যারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে গেছে।
সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর ওপার বাংলা ও এপার বাংলার যে বিভক্ত সীমানা গড়ে উঠল, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম এক ট্র্যাজিক ঘটনা। মানুষ তার জন্মভিটা, নাড়ি-নক্ষত্র ফেলে জীবনের তাগিদে এপারে এসেছে, ওপারে গেছে।
এই পরিযায়ী বা অভিবাসনপ্রবণতা এখন নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এ প্রবণতার ভেতর তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকের গন্ধ পেয়েছে। এ কারণে নানা অজুহাতে এসব মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। বাংলাদেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠাচ্ছে এবং পাঠানোর হুমকি দিচ্ছে। আর তা দিচ্ছেন স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
শাসকগোষ্ঠীর এ মনোভঙ্গির কারণে সামাজিক সংহতি ও সহাবস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলার খবর আসতে শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ভবানীপুরে সাখাওয়াত মোমোরিয়াল কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় তাঁর গায়ে হাত তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক সংঘাতও পরিলক্ষিত হলো। বিজেপি–সমর্থকেরা যেখানে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থকেরা ‘জয় বাংলা’ বলতে অধিকতর সাবলীল। জয় শ্রীরামের ভেতর রাম রাজত্বের ঘ্রাণ রয়েছে, যা ধর্ম ও রাজনৈতিক সংযোগের মেলবন্ধন।
জয় শ্রীরাম একটি সংস্কৃত ও হিন্দি অভিব্যক্তি, যার আক্ষরিক অর্থ ভগবান রামের বিজয়। অন্যদিকে জয় বাংলা অর্থ বাংলার জয় বা বাংলা বিজয়ী হোক। অর্থাৎ দেশ জিতুক, ভাষা জিতুক, সংস্কৃতি জিতুক। দুটি অভিব্যক্তির রাজনৈতিক দ্যোতনা দুই ধরনের। জয় শ্রীরাম অভিব্যক্তির অভিমুখিনতা ধর্ম প্লাস রাজনীতি এবং জয় বাংলার গভীরে প্রোথিত বাংলা সংস্কৃতি প্লাস রাজনীতি।
নির্বাচন ঘিরে মাছে-ভাতে বাঙালিকেন্দ্রিক একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালির মাছে-ভাতে ধারণার অভ্যস্ততার সাংস্কৃতিক অভ্যাসটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালি মাছ খাওয়ার অধিকার হারাবে বা সংকুচিত হবে। পুরো বিষয়টিকে সংস্কৃতির ওপর সংঘাত হিসেবে দেখছেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ।
তিনি ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিজেপি একটা হিন্দুত্ববাদী দল, তাই বিতর্কটা সংস্কৃতির পর্যায়ে উঠে এসেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বিতর্ক ছিল বাঙালি বনাম অবাঙালি। তাই তৃণমূলের প্রচার ছিল বাংলা নিজের মেয়েকে চায়।
বিজেপি শুধু সরকার গঠনের রাজনীতি করে না, তাদের রাজনীতির মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক উপাদান আছে। আমরা দেখেছি, দিল্লিতে চিত্তরঞ্জন পার্কের কালীমন্দিরের পাশে নবমীতে কেন মাছ বিক্রি হবে—এ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নবরাত্রি চলাকালীন কেন মাছ খাওয়া হবে, এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।’
অথচ বাঙালির পার্বণ ও শুভকর্মের সঙ্গে মাছের যোগ রয়েছে। পয়লা বৈশাখে ঘরে ঘরে মাছ এনে তাতে সিঁদুর, ধান-দূর্বা দিয়ে বরণ করার রীতিও প্রচলিত।
এখানেই উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দুদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির তফাত। জাদ মাহমুদ আরও বলেন, ‘উত্তর ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সংস্কৃতির মধ্যে বিপুল ফারাক আছে। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা, এরপর কালীপূজা। আমাদের এখানে মাতৃ আরাধনার একটা ঐতিহ্য আছে। উত্তর ভারতের সংস্কৃতি হচ্ছে রাম, হনুমানের পূজা। বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাসন্তী বা অন্নপূর্ণা পূজা কমেছে। রামনবমী, হনুমানজয়ন্তী বড় আকারে পালিত হচ্ছে। অর্থাৎ বিজেপির রাজনীতি সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও এগোয়। তারা মূলত উত্তর ভারতের হিন্দু সংস্কৃতিকে সারা দেশে প্রচার করে।’
এ ধরনের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক আধিপত্য রুখতেই হয়তো তৃণমূল কংগ্রেস মাছ-ভাতনির্ভর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাজনীতিকে সামনে আনতে চেয়েছিল। একই সঙ্গে নিজেদের অপশাসন, দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের মতো ইস্যুগুলো আড়াল করতে হয়তো চেষ্টা করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মনে করেন, এটি ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের একটি রাজনৈতিক কৌশল। এটি যদি রটিয়ে দেওয়া যায়, বিজেপি মাছ খেতে দেবে না, তাহলে ভোটাররা হয়তো ভয় পাবেন, বিজেপির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবেন।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন শেখাচ্ছে গোটা ভারত হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের খপ্পরে পড়েছে। গণতন্ত্র, বহু মত ও পথ মাড়িয়ে বিজেপি একরৈখিক হিন্দুত্ববাদী ভারত গড়তে চাচ্ছে। এ অপচেষ্টায় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদনির্ভর পরিচয় নিশ্চিতভাবে সংকুচিত হবে। ভিন্ন চিন্তা, মত ও পথের মানুষে স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের অধিকার হারাতে থাকে।
ভারতে শুভবোধসম্পন্ন মানুষের অভাব নেই। হিন্দুত্ববাদের একরৈখিক সীমানা মাড়িয়ে নিশ্চয় তাঁরা সহনশীল, পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে এগিয়ে আসবেন। কারণ, একটি রাষ্ট্র বাঁচে মানুষের স্বস্তিতে, সহাবস্থানে।
খান মো. রবিউল আলম যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক