বিশ্লেষণ

পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভাঙন, নাকি ধারাবাহিকতা

অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনীতি পুরোনো ব্যবস্থার ভাঙন, নাকি ধারাবাহিকতা—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মির্জা হাসান ও খলিলউল্লাহ্‌

১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দলীয় আধিপত্য। মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ছিল। তবে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী এই দলীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে টিকে ছিল। রাজনৈতিক এই দৃশ্যপটে মেরুকরণ ও বিভাজন ছিল তুলনামূলক কম। তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন চেহারা দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের ধরন হলো ‘ক্যাচ অল’, অর্থাৎ দলগুলোর চেষ্টা থাকে সমাজের সব শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করার। এদের আদর্শিক অবস্থান ছিল মূলত মধ্য ডানপন্থী, শুধু জামায়াতে ইসলামী ছিল ডানপন্থী। ১৯৯১ সাল থেকে এই নির্বাচনী রাজনীতির একটা স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী আলোচনায় এখন মূল দলগুলো হলো বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং নবগঠিত এনসিপি। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও আলোচনার কেন্দ্রে বিভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগ একটা ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে রয়ে গেছে, বিশেষ করে দলটির সমর্থকদের ভোট কার বাক্সে যাবে, সেই হিসাব–নিকাশ এবং দেশের বাইরে থেকে দলটির নেতাদের বক্তৃতা–বিবৃতির কারণে। জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার কারণে তারা তুলনামূলক কম আলোচনায়। এর বড় কারণ বিগত শাসনামলে তারা আওয়ামী লীগের ‘সহযোগী’ শক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল।

দলীয় ব্যবস্থার মেরুকরণ ও বিভাজনের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি জিনিস উল্লেখযোগ্য। তথাকথিত ‘মধ্যপন্থী’ এনসিপির আবির্ভাব এবং ডানপন্থী শক্তিগুলোর পুনরুজ্জীবনের কারণে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্য ডানপন্থী মতাদর্শ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তবে সব রাজনৈতিক দলই ‘ক্যাচ অল পার্টি’ হিসেবে রয়ে গেছে।

বামপন্থী রাজনীতি আরও কোণঠাসা

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতি আরও বেশি প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে। কয়েকটি বামপন্থী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নিজেদের ঘোষিত মতাদর্শ ও রাজনীতির সঙ্গে তারা অনেকটাই আপস করেছে বলে মত রয়েছে।

কয়েকটা বামপন্থী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গেও একই কাজ করেছিল, যাকে কৌতুক করে ‘ইনু–মেনন’ সিনড্রোম বলা হয়।

তবে যারা এ ধরনের জোটে যায়নি, যেমন সিপিবি, তাদের দিক থেকেও নতুন রাজনৈতিক পরিসরে যুক্ত হওয়ার তেমন কোনো সৃজনশীল উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। ফলে তারা আরও বেশি অপ্রাসঙ্গিক ও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

উজ্জীবিত ডানপন্থী রাজনীতি

অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক উভয় দিক থেকেই উজ্জীবিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মতাদর্শের পতনের কারণে আগের আমলে দমিত হয়ে থাকা ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার’ হিসেবে পরিচিত বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রভাববলয়ের বাইরে অনেকাংশেই স্বাধীন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। 

আগে বড় দুটি দলের রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এখন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে মতাদর্শিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে নেমেছে। তারা সামনের নির্বাচনে জিততে না পারলেও, অন্তত নিকট ভবিষ্যতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেই রয়ে যাবে।

অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী ব্যাপক রাজনৈতিক দক্ষতা দেখিয়েছে। কৌশলগতভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা বিএনপির সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। দলটির ছাত্ররাজনীতি আরও বেশি সংহত হয়েছে। প্রায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির জয় পেয়েছে। তবে জামায়াতের রক্ষণশীল মতাদর্শিক অবস্থানের কারণে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে দলটি সম্পর্কে এখনো ব্যাপক নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।

বামপন্থী দলগুলোর মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলোও নির্বাচনী রাজনীতিতে অনেকটাই অস্তিত্বহীন ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর সৃষ্টি হওয়া নতুন রাজনৈতিক পরিসরের পূর্ণ সুবিধা নিয়েছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো। তারা আক্রমণাত্মকভাবে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শক্তির ব্যবহার করছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করছে। 

নিজেদের দাবি আদায়ে তারা দঙ্গলবাজি ও রাস্তার শক্তি ব্যবহার করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নারী নীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সিলেবাস বা জাতীয় সাংস্কৃতিক নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারা এসব শক্তি ও কৌশল ব্যবহার করেছে। এসব গোষ্ঠীর প্রায় সবাই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জোটে এসে থিতু হয়েছে।

► ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর সৃষ্টি হওয়া নতুন রাজনৈতিক পরিসরের পূর্ণ সুবিধা নিয়েছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো। ► অনেকগুলো গোষ্ঠী মব বা দঙ্গলবাজিতে উসকানি দেওয়া থেকে শুরু করে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে।

ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক মরিস ডিউভারজের তত্ত্ব অনুযায়ী, আসনভিত্তিক নির্বাচনী পদ্ধতিতে সাধারণত স্থিতিশীল দ্বিদলীয় ব্যবস্থার জন্ম হয়। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান–পরবর্তী পরিস্থিতিতে, সামনের নির্বাচনের আগে আবারও সেই দ্বৈত কাঠামোর সৃষ্টি হয়েছে। স্পষ্টতই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় পুরোনো নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যত দুটি রাজনৈতিক জোটের আবির্ভাব ঘটেছে। 

বিএনপি ও জামায়াতের এ দুটি রাজনৈতিক ব্লকের বৈশিষ্ট্য মূলত নির্বাচনী হিসাব–নিকাশের চেয়ে অনেক বেশি মতাদর্শকেন্দ্রিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান। অভ্যুত্থানের আগে, দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় মতাদর্শিক ও কর্মসূচিগত পার্থক্যের চেয়ে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বই ছিল প্রধান। তবে নতুন আবির্ভূত দ্বিদলীয় ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বের চেয়ে অনেক বেশি মতাদর্শিক। 

মবতন্ত্র: সময়টা দানবের

ইতালীয় রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আন্তোনি গ্রামসির প্রিজন নোটবুক গ্রন্থে লেখা সেই বিখ্যাত কথা: পুরোনো জগতের অবসান হচ্ছে, কিন্তু নতুন জগতের দেখা মিলছে না; মধ্যবর্তী এই সময়টা দানবের।

অভ্যুত্থানের সময় আবির্ভূত জনতা (ক্রাউড) ও জনগণ (পিপল) পরবর্তী সময়ে দুটি ভিন্ন রূপ গ্রহণ করেছে। একটি হলো মবতন্ত্র, আরেকটি হলো গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া–সংবলিত সমাবেশ। পরেরটিকে আমরা ‘বহুজনের রাজনীতি ফিরে আসা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছি। অর্থাৎ আগের এলিট নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির অবসানের ফলে এখন সবাই নিজেদের দাবিদাওয়া জানানোর সুযোগ পেয়েছে।

অভ্যুত্থানের পর আমরা দেখেছি মব সহিংসতা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকগুলো গোষ্ঠী এসব মব বা দঙ্গলবাজিতে উসকানি দেওয়া থেকে শুরু করে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৯৫ জন মব সহিংসতায় নিহত হয়েছে। বিআইজিডির একটি জনমত জরিপে দেখা যায়, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা মব সহিংসতা নিয়ে আর ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

দলীয়–রাষ্ট্রের (দল ও রাষ্ট্র যেখানে একাকার) পতন মব সহিংসতার অন্যতম কারণ। কারণ, এ ধরনের রাষ্ট্র মব সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের মতো ব্যবহার ও পোষ মানাতে পারে। দলীয় রাষ্ট্রের পতনের ফলে রাষ্ট্রের বাইরের গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার একক কোনো শক্তি এখন আর নেই।

আগে যেসব রক্ষণশীল গোষ্ঠী প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, তারা পুনরায় উজ্জীবিত হয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। তাদের নৈতিক ব্যবস্থা জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দৃঢ়ভাবে এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর সবগুলো বিষয়ই অভ্যুত্থান–পরবর্তীকালে মবতন্ত্রের উর্বর ভূমি তৈরি করেছে।

বহুজনের রাজনীতি ফিরে আসা

বেলজিয়ান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক শাতাল মুফ দ্য রিটার্ন অব দ্য পলিটিক্যাল গ্রন্থে ‘বহুজনের রাজনীতি ফিরে আসা’ তত্ত্ব দিয়েছেন। এটা এমন এক অবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে দ্বন্দ্বকে গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি সমাজের গভীরে থাকা বিদ্যমান ভিন্নমতের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়া বোঝায়। দ্বন্দ্ব এড়িয়ে গেলে সমাজ তখন গণতান্ত্রিক উপায়ে সেই দ্বন্দ্ব আর নিরসন করতে পারে না। ফলে কর্তৃত্বপরায়ণ সমাধানই হয়ে ওঠে একমাত্র অবলম্বন।

এই পদ্ধতিতে শক্তিশালী মতাদর্শিক বা নীতিগত ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নিয়ম মানতে উৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে জনতা ও তাদের উত্থানকে ‘বহুজনের রাজনীতি ফিরে আসা’ ধারণার মাধ্যমে ভালোভাবে বোঝা যায়।

সমাজে বিদ্যমান বেশ কিছু ক্ষোভকে কেন্দ্র করে জনতার আন্দোলন ঘুরপাক খেয়েছে। এসব আন্দোলনের ব্যাপারে সরকারের প্রতিক্রিয়াও ছিল বিভিন্ন রকম। যেমন আংশিকভাবে মেনে নেওয়া, দমনের চেষ্টা এবং নাকচ করে দেওয়া। যেসব ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং দাবিদাওয়া প্রশাসনিকভাবে সমাধানযোগ্য ছিল, সেসব ক্ষেত্রে সরকার মেনে নিয়েছে। তবে হুমকি মনে হলে বল প্রয়োগ করে ভন্ডুল করে দিয়েছে। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উচিত–অনুচিত বিবেচনা এবং সমতা ও ন্যায়বিচারের বোধ বহুলাংশেই অনুপস্থিত ছিল।

আশা–নিরাশার ভবিষ্যৎ

১৯৯১ ও ২০০৮ সালে যে ধরনের ব্যর্থ সূচনা আমরা করেছিলাম, এবার একই পরিণতি হওয়া কঠিন। এর কারণ অসংখ্য তরুণ রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের আবির্ভাব। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধিতায় সম্ভবত কিছু হলেও জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকবে। গণতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকে না হলেও নিজেদের টিকে থাকার জন্যই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তা করবে বলে আশা করা যায়।

একইভাবে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগের মতো কোনো সরকারের প্রতি ‘অন্ধ আনুগত্য’ দেখাতে চাইবে না। ফলে আগের মতো ‘পরিপুষ্ট স্বৈরাচার’ জন্ম নেওয়া কঠিন। আর তাই ভবিষ্যতের উদার গণতান্ত্রিক পরিসর যতই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ হোক না কেন, সেখানে একটা টেকসই ও জোরালো ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ পদ্ধতি এবং জবাবদিহি রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আমরা চাই একটা মিশ্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে নির্বাচনী প্রতিনিধিত্ব ও প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র পাশাপাশি থাকবে। নাগরিকেরা নিজেদের দাবিদাওয়া প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার ও আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম পাবে। পাশাপাশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির মধ্যে রাখতে জনগণের ভেটো ক্ষমতা থাকবে। এটা কোনো কাল্পনিক আশাবাদ নয়; পৃথিবীব্যাপী চর্চিত অনেকগুলো প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের মধ্যে একটা মডেল মাত্র। বাংলাদেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি মডেল আমরা বাছাই করতে পারি।

তবে জনগণকে বুঝতে হবে গণতন্ত্র কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়; ফ্যাসিবাদ বা রাজকীয় শাসন অনেকাংশেই ‘প্রাকৃতিক ব্যবস্থা’। বংশ পরম্পরা, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বা স্বর্গীয় আদেশের দোহাই দিয়ে এসব ব্যবস্থা টিকে থাকে বলেই সহজে মানুষের সমর্থন পায়।

গণতন্ত্রে এ ধরনের যুক্তি দিয়ে যেকোনো কিছু জায়েজ করার সুযোগ নেই। কারণ, গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো সামাজিকভাবে সবাই মিলে সৃষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধ। এগুলো নির্ভর করে ইতিহাসের ওপর, যা আবার পরিবর্তনশীল। আর তাই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সক্রিয় নাগরিকদের দৃঢ় মনোবল ও প্রতিশ্রুতি এবং অবিরাম নজরদারি। শুনতে যতই জীর্ণ–সস্তা আলাপ মনে হোক, এই ব্যবস্থাই এখনও পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক। 

সাধারণত অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে দ্রুত ঘটতে থাকা ‘বিশৃঙ্খল’ ঘটনাপ্রবাহের কারণে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক। ফলে তারা চায় যত দ্রুত সম্ভব সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক। অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জরিপে এ ধরনের হতাশা ও শঙ্কার চিত্র উঠে এসেছে।

অন্যদিকে গণতান্ত্রিক নাকি স্বৈরাচারী উপায়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হচ্ছে, সে ব্যাপারে জনগণের একধরনের উদাসীনতা রয়েছে। নিজেদের সক্রিয় ভূমিকার ব্যাপারে নাগরিকেরা বহুলাংশেই সচেতন থাকে না, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের যে উদাহরণ ওপরে দেওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে। একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণের পথে এগুলো ভালো লক্ষণ নয়।

নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশার কারণে নির্বাচনের পর আরও জোরেশোরে মবতন্ত্র ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া—দুটোরই প্রকাশ ঘটবে। এসব দাবিদাওয়া ও প্রত্যাশা যদি বহুলাংশে পূরণ না হয়, তাহলে হয়তো আমরা আবারও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে দেখব। এতে এলিট ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি আবারও হতাশ হয়ে হবসীয় সমাধান, তথা ‘শক্ত হাতে’ রাষ্ট্র পরিচালনার দাবি জানাতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি আবারও পুরোনো পদ্ধতির দেশ শাসনে সহযোগিতা করবে?

ড. মির্জা হাসান বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক,

খলিলউল্লাহ্‌ লেখক ও সাংবাদিক

* মতামত লেখকদ্বয়ের নিজস্ব