
অধিকৃত কাশ্মীরের পহেলগামে মর্মান্তিক সেই হামলার এক বছর পার হয়েছে। ভারত হয়তো চেয়েছিল বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান একঘরে হয়ে পড়ুক। দক্ষিণ এশিয়ায় নিরঙ্কুশ আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের বাসনার পাশাপাশি বিশ্বের বুকে নিজেদের সবচেয়ে বড় ‘সন্ত্রাসবিরোধী যোদ্ধা’ হিসেবে তুলে ধরার সাধও ভারতের ছিল।
বাস্তবে ভারতের এসব বাসনার কোনোটিই পূরণ হয়নি; বরং একটি জটিল সংঘাতে শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান এখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান প্রচণ্ড উত্তেজনার মধ্যে ভারত আঞ্চলিকভাবে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এমনকি পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে নয়াদিল্লির মদদ দেওয়ার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এড়ায়নি।
ফলে নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে ভারত এখন সেই কাজটিই করছে, যেটিতে তারা সবচেয়ে পারদর্শী। আর তা হলো, বিদ্যমান বাস্তবতার বদলে তারা নিজেদের কল্পনাপ্রসূত একটি দুনিয়ায় বসবাসের ভান করছে।
২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল ওই হামলার বর্ষপূর্তিতে বিজেপি নেতারা এমনভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, যেন ‘অপারেশন সিন্দুর’ ভারতের ইতিহাসের সেরা সিদ্ধান্ত। অথচ পাকিস্তানের জড়িত থাকার কোনো শক্ত প্রমাণ ছাড়াই ভারত ওই হঠকারী অভিযান চালিয়েছিল।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, তাঁদের সব প্রতিবেশী ভালো, কেবল একটি প্রতিবেশীই সমস্যাপ্রবণ। অপারেশন সিন্দুরের কারণে ভারতীয় সামরিক বাহিনী এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তবে পহেলগামের ঘটনায় পাকিস্তানকে জড়ানোর অভিযোগের মতোই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির এই দাবির পক্ষেও তিনি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
পাকিস্তান যখন গোটা বিশ্বকে বিপন্ন করা এক সংঘাত থামানোর চেষ্টায় রত, ভারতের আপামর জনতা তখন ‘ধুরন্ধর টু’ সিনেমা দেখতে ব্যস্ত। তারা মূলত বলিউড ছবির রূপকথার মাঝেই রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য খুঁজছে।
এই রাজনৈতিক আস্ফালনকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের বাস্তবতার একেবারেই পরিপন্থী বলা চলে। এগুলো মূলত সেই অবুঝ শিশুর প্রতিবাদের মতো, আবদার পূরণ না হলেও যে একগুঁয়ের মতো কেবল চিৎকার চালিয়ে যায়।
বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলা এক তীব্র সংঘাত প্রশমনে পাকিস্তানের গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগকে যদি কেউ এড়িয়েও যান, তবু এ কথা মানতে হবে যে ভারত তার নিজের স্বার্থ সুরক্ষায় চরম ব্যর্থ হয়েছে।
মোদি প্রশাসনের অন্যতম প্রচারযন্ত্র হিসেবে পরিচিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ যখন পাকিস্তানের উত্থান নিয়ে নিন্দায় মেতেছে, তখন খোদ ভারত এক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বিদেশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
আসন্ন নির্বাচনের কারণে মোদি সরকার এখন জ্বালানির দাম কমিয়ে রেখেছে সত্য, তবে ভোট শেষ হওয়ামাত্রই সাধারণ মানুষ আসল ধাক্কাটি টের পাবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে এবং তা মারাত্মক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করবে। সাগর ও প্রণালিগুলোয় বহু ভারতীয় জাহাজ ইতিমধ্যেই আটকা পড়ে আছে এবং ইরান থেকে কিছু ভারতীয় জাহাজে গুলি চালানোরও খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বাস্তবতা মোকাবিলার পরিবর্তে এসব সম্ভাব্য বিপদের খবর ধামাচাপা দেওয়া মোদি সরকারের চিরাচরিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নতুন ডিজিটাল মিডিয়া আইনের কারণে স্বাধীন ইউটিউবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা আরও বেশি নিপীড়নের শিকার হবেন। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ যখন অন্ধ জাতীয়তাবাদ ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রচারণায় লিপ্ত, ঠিক তখনই স্বাধীন এসব সংবাদ উৎসের উদ্ভব ঘটেছিল।
কিন্তু এখন মোদি সরকারের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন না করলে তাঁদের হয়রানি, হুমকি ও কারাদণ্ডের মুখে পড়তে হবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ার পরিচালকের ভাষায় বলতে গেলে, এসব সংশোধনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো কার্যত রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ সংস্থায় পরিণত করা হবে। এটি জনসাধারণের ওপর রাষ্ট্রের ব্যাপক নজরদারির পথ আরও প্রশস্ত করবে।
এসব পদক্ষেপ ভারতের কাছে জরুরি মনে হওয়ার কারণ, বাস্তবতাকে অস্বীকার করে দিন কাটানোই এখন মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবর ধামাচাপা দেওয়ার এই কৌশল বেশ কাজেও দিচ্ছে। পাকিস্তান যখন গোটা বিশ্বকে বিপন্ন করা এক সংঘাত থামানোর চেষ্টায় রত, ভারতের আপামর জনতা তখন ‘ধুরন্ধর টু’ সিনেমা দেখতে ব্যস্ত। তারা মূলত বলিউড ছবির রূপকথার মাঝেই রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য খুঁজছে।
অন্যদিকে খোদ পহেলগামের জনজীবনে এখনো আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এক ভারতীয় সাংবাদিকের মতে, সেখানে সাধারণ মানুষের ওপর সরকারি হয়রানির শেষ নেই।
বহুদিন আগে মারা যাওয়া অনেক কথিত চরমপন্থীর পরিবারকেও প্রতিদিন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। নানা বিধিনিষেধের কারণে আগের মতো পর্যটকও সেখানে দেখা যায় না। গাইডরা কোথায় পর্যটকদের নিতে পারবেন বা পারবেন না, তা নিয়ে কঠিন নির্দেশিকা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পহেলগামের মতো চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এলাকায় পর্যটনের জন্য এটি এক বিরাট অন্তরায়।
পহেলগামের ট্র্যাজেডি এবং সেই দুর্ভাগ্যজনক ‘অপারেশন সিন্দুর’ বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির জন্য কেবল অবমাননাই বয়ে এনেছে। চূড়ান্ত ব্যর্থতায় ভারত এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে একরকম পিছু হটে খোলসের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
যুদ্ধ ও শান্তির কূটনীতি কিংবা চরম অর্থনৈতিক সংকট আর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলার মতো গুরুতর কাজগুলো অনুধাবন করা তাদের কাছে বড্ড কঠিন মনে হচ্ছে। তাই নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বলিউডের সাজানো কল্পকাহিনি দেখাই তাদের জন্য সহজ বিকল্প।
রাওয়ালপিন্ডির নুর খান বিমানঘাঁটিতে যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সশরীর অবতরণ করলেন, সেটিই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে ওই ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ভারতীয় দাবি কত বড় মিথ্যা ছিল।
পরাজয়ের অর্থ কেবল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ নয়। কখনো কখনো এর অর্থ হলো ময়দান ছেড়ে পেছনে সরে আসা। চরম অপ্রীতিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে হতাশ ভারত এখন পিছিয়ে এসে নিজের ঘরে আড়াল নেওয়ার পথটাই আপাতত বেছে নিয়েছে।
রাফিয়া জাকারিয়া পাকিস্তানি লেখক ও সাংবিধানিক আইন ও রাজনৈতিক দর্শন বিশ্লেষক
ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত