বঙ্গভবন। রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও কার্যালয়
বঙ্গভবন। রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও কার্যালয়

মতামত

রাষ্ট্রপতি কি শুধুই আলংকারিক পদ

বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান; ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে তাঁর অবস্থান সবার ওপরে। কিন্তু বাস্তবে তিনি কেবলই আনুষ্ঠানিকতার প্রতিমূর্তি, নাকি ক্ষমতার দৃশ্যমান কেন্দ্রের বাইরে থেকেও তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক? 

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু সীমিত ক্ষমতা মানেই গুরুত্বহীনতা নয়; বরং অনেক সময় সাংবিধানিক রাষ্ট্রে কিছু পদ এমন থাকে, যাঁর শক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সীমা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মধ্যে নিহিত থাকে।

রাষ্ট্রপতির এই ভূমিকাকে বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘পাওয়ার টু রিমাইন্ড’। অর্থাৎ এমন এক সাংবিধানিক ক্ষমতা, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি সরাসরি শাসন করেন না, কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতারও একটি সীমারেখা আছে।

দুই. রাষ্ট্রপতি কি শুধুই আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান—এটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই অনুচ্ছেদে তাঁকে রাষ্ট্রের অন্যান্য ব্যক্তির ওপর আনুষ্ঠানিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থার মৌলিক নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের এই কাঠামো রাষ্ট্রপতিকে নির্বাহী সরকারের বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হতে বাধা দিয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সমান্তরাল কোনো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নন। রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে নেই। এই জায়গা থেকেই অনেক বিশ্লেষক রাষ্ট্রপতির পদকে ‘সেরিমোনিয়াল’ বা ‘আলংকারিক’ বলে অভিহিত করেন। 

কিন্তু সাংবিধানিক তত্ত্বে সেরিমোনিয়াল শব্দটি অনেক সময় ভুলভাবে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে অনেক সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা সীমিত হলেও তাঁর সাংবিধানিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপ্রধানের প্রকৃত শক্তি অনেক সময় সরকারি বা রাজনৈতিক নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতায় নয়, বরং সাংবিধানিক সংকটে সঠিক প্রশ্ন তোলার সক্ষমতায়।

তিন. সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভারত, জার্মানি, ইতালি কিংবা যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্রপ্রধান অনেক সময় দৈনন্দিন শাসন পরিচালনা করেন না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাঁর ভূমিকা অর্থহীন; বরং পরিণত গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুত্ব অনেক সময় প্রকাশ পায় তখনই, যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সীমা ভুলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা নয়, সীমারেখার প্রহরী। রাষ্ট্রপতির পদটির প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই। তিনি সরকার পরিচালনা করেন না, কিন্তু সরকার যেন সংবিধানের কাঠামোর বাইরে না যায়, সেই নৈতিক ও সাংবিধানিক স্মারক হয়ে থাকতে পারেন। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ অবস্থান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা নয়, সীমারেখার প্রহরী। রাষ্ট্রপতির পদটির প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই। তিনি সরকার পরিচালনা করেন না, কিন্তু সরকার যেন সংবিধানের কাঠামোর বাইরে না যায়, সেই নৈতিক ও সাংবিধানিক স্মারক হয়ে থাকতে পারেন। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ অবস্থান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

যখন কোনো সরকার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে নিজেকে রাষ্ট্রের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে ভাবতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তিনি হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবেন না, কিন্তু তিনি প্রশ্ন তুলতে পারেন; সতর্ক করতে পারেন; সাংবিধানিক শিষ্টাচারের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন যৌক্তিক বিবেচনায়। এটি কোনো দুর্বল ক্ষমতা নয়; বরং সাংবিধানিক গণতন্ত্রে অনেক সময় সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা হলো—ক্ষমতার সীমা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা।

চার. রাষ্ট্রপতির কিছু স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ক্ষমতা স্বীকৃত। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে আনুষ্ঠানিক নয়। সংবিধান তাঁকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ক্ষমা মার্জনার ক্ষমতা। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির একটি সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে।

সংসদ নির্বাচনের পর তাঁকে এমন একজন সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করতে হয়, যিনি তাঁর কাছে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনপ্রাপ্ত বলে প্রতীয়মান হন। এই প্রতীয়মান হওয়ার বিষয়টি নিছক যান্ত্রিক নয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে—যেমন ঝুলন্ত সংসদ বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় পদটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপ্রধানের অবস্থান দিলেও বাস্তবে অধিকাংশ সময় এই পদটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রপতি কি সত্যিই সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার প্রতীক হতে পারবেন, নাকি তিনি কেবল ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অংশ? এই প্রশ্নের উত্তর সংবিধানে নেই; এটি নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের পরিপক্বতার ওপর।

পাঁচ. রাষ্ট্রপতির পদটি আলংকারিক নয়, সাংবিধানিক প্রতীক। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদকে তাই নিছক ‘আলংকারিক’ বলা কিছুটা বিভ্রান্তিকর। কারণ, আলংকারিকতার মধ্যেও সাংবিধানিক অর্থ থাকতে পারে। রাষ্ট্রপতি যদি কেবল আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তি হন, তাহলে তাঁর পদ অবশ্যই সীমিত অর্থ বহন করবে। কিন্তু যদি তিনি সংবিধানের মূল্যবোধ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে তাঁর ভূমিকা অনেক গভীর।

একটি পরিণত গণতন্ত্রে সব সময় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় ক্ষমতা নয়। কখন কোথায় থামতে হবে, সেটি মনে করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটির ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করবে তিনি কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তার ওপর নয়; বরং কতটা সাংবিধানিক বিবেকের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন তার ওপর। কারণ, গণতন্ত্রে কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠটি সেই কণ্ঠ, যে শাসন করে না—শুধু মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা প্রয়োগের একটি সীমা আছে।

এম এম খালেকুজ্জামান আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট 

* মতামত লেখকের নিজস্ব