
লেখাটা যখন শুরু করলাম, তখন সৌহার্দ্য বাস দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ডুবে যাওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ২৬ জন যাত্রী মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলো। কিছু মৌলিক প্রশ্ন মাথার ভেতর খেলছিল।
এটা আসলে কোন ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়? নিঃসন্দেহে এটা মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। এমন নয় যে এ ধরনের মানবসৃষ্ট বিপর্যয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এটাই প্রথম। বরং মৃতের সংখ্যা, ভয়াবহতা, জাতীয় অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করলে এমন দুর্ঘটনা কিংবা বিপর্যয়ের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। কিছু দুর্ঘটনা তো জাতীয় ট্রমায় পরিণত হয়েছিল: ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি, নানা বছরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনা, পুরান ঢাকায় ২০১০ সালে নিমতলী ট্র্যাজেডি, ২০১৪ সালে পরিত্যক্ত পাম্পের পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যু, ২০২৪ সালে বেইলি রোড অগ্নিকাণ্ড প্রভৃতি।
এসব ভাবতে গিয়ে উন্নাসিকভাবে কিছু ভাবনা খেলে যাচ্ছিল। আমাদের সামষ্টিক মনোজগতে কি মানবসৃষ্ট বিপর্যয় নিয়ে কোনো সংশয় আছে?
আমরা কেন জানি ভবনের নিরাপত্তা, লঞ্চের রক্ষণাবেক্ষণ, রাসায়নিক গুদামের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে গুলিয়ে ফেলি। তা না হলে এত উন্নাসিক খামখেয়ালিপনা কী জন্য? খামখেয়ালিপনা বলে আসলে আমি এখানে ক্ষমতার অন্ধকার দিকটা একপ্রকার লুকিয়েই রাখলাম।
একটা ব্যাপার তো পরিষ্কার, ভয়াবহ এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে মূলত নিম্নবিত্তের খেটে খাওয়া মানুষ। দুটি বিপরীত পক্ষ যেন মুখোমুখি হাজির হয়ে যায় সব দুর্ঘটনায়: ভবনের কিংবা ফ্যাক্টরির মালিক বনাম শ্রমিক, লঞ্চের মালিক বনাম যাত্রী, বাসের মালিক বনাম যাত্রী ইত্যাদি।
মালিকপক্ষ কি আসলেই খামখেয়ালিপনা করে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, লঞ্চের মালিক কি জানেন না যে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে লঞ্চ ডুবে যেতে পারে? বাস কোম্পানির মালিক কি জানেন না কীভাবে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা যায়?
মালিকপক্ষ বলি, প্রশাসন বলি, কিংবা সাধারণ জনগণ—সবার মধ্যেই সামষ্টিক খামখেয়ালিপনা লক্ষ করা যায় ভয়ানকভাবে। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে এই গাফিলতির, এই ফাঁকির, এই দুর্নীতির, এই অব্যবস্থাপনার ফলে যে প্রতিবার হাজারো মানুষের জীবন অকালে হারিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে পুরো জাতি যেন সর্বেসর্বাভাবেই উদাসীন।
এই খামখেয়ালিপনা থেকেই সব অব্যবস্থাপনার অভিযোগের তির চলে আসে প্রশাসনের দিকে। যেসব মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তর (সিটি করপোরেশন, রাজউক, পৌরসভা, পুলিশ, সড়ক কর্তৃপক্ষ, নৌচলাচল কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ) এসব নিরাপত্তা বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য তদারকি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করে, সেসব প্রতিষ্ঠান কেনই–বা স্বাধীনভাবে কাজ করে না কিংবা তারা কেন গাফিলতি করে কিংবা কেনই–বা দুর্নীতির আশ্রয়ে–প্রশ্রয়ে এসব গাফিলতি ছাড় দেয়, সেটাও বাংলাদেশের জাতীয় মনস্তত্ত্বকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ মালিকপক্ষ বলি, প্রশাসন বলি, কিংবা সাধারণ জনগণ—সবার মধ্যেই সামষ্টিক খামখেয়ালিপনা লক্ষ করা যায় ভয়ানকভাবে। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে এই গাফিলতির, এই ফাঁকির, এই দুর্নীতির, এই অব্যবস্থাপনার ফলে যে প্রতিবার হাজারো মানুষের জীবন অকালে হারিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে পুরো জাতি যেন সর্বেসর্বাভাবেই উদাসীন।
মানবসৃষ্ট বিপর্যয় কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যকার যে বিশদাকার পার্থক্য, সে ব্যাপারে কি আমরা কোনোভাবে উদাসীন বা বুঝতে অপারগ? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে আরও গভীরে যাওয়া যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেভাবে নিয়তি আর অদৃষ্টের দিকে তির ছুড়ে কেল্লা ফতে করা যায়, মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে তা করা যায় না। একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় থেকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য সর্বতোভাবে নির্ভর করতে হয় আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও তদারকি প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় কর্মকাণ্ডের ওপর। ‘নাগরিক’ বোধের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল এই কাজগুলো।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উলরিশ বেকের জনপ্রিয় তত্ত্ব আছে আধুনিক রাষ্ট্রের মানবসৃষ্ট বিপর্যয় নিয়ে। তিনি আধুনিক সমাজকে বলেছেন ‘রিস্ক সোসাইটি’ (১৯৮৬/১৯৯২)। তার এই তত্ত্ব সারমর্ম করলে দাঁড়ায়: একুশ শতকের আধুনিক রাষ্ট্রে প্রগতির আর উন্নয়নের যাত্রার চেয়ে বেশি মুখ্য হলো কীভাবে নাগরিকেরা নিরাপদে থাকবে তার পেছনে সর্বশক্তি নিয়োজিত করা। সম্পদশালী হওয়া, চাকরি, সুশিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক রাষ্ট্রের শুভশক্তির সর্বেসর্বা নিয়োজিত থাকবে সংকট, বিপর্যয় কিংবা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়।
এ তত্ত্বের আলোকে গত পরশু ঘটে যাওয়া পদ্মায় মর্মান্তিক বাসডুবি, গত দু-তিন দশকে ঘটে যাওয়া গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ড, লঞ্চ দুর্ঘটনা ইত্যাদি ‘স্ট্রাকচারাল কিলিং’ রাষ্ট্রের তদারকির মধ্যেই সমাধা করতে হবে। সব ঝুঁকি, বিপর্যয়, দুর্ঘটনা নিয়ে ফরাসি দার্শনিক রুশো প্রণীত ‘সামাজিক ঐকমত্যে’ (সোশ্যাল কনট্রাক্ট) পৌঁছাতে হবে। মালিকপক্ষকে রাষ্ট্রের দিক থেকে কঠোর জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। এটা সত্য যে আমাদের মালিকপক্ষ, রাজনৈতিক শক্তি, অর্থনৈতিক নেতৃত্ব—সব মিলেমিশে একাকার স্বার্থের দিক থেকে। কিন্তু সেই ক্ষমতার কেন্দ্রের অনুঘটকদের এই একটা প্রশ্নে আপসহীন হতে হবে। নাগরিকদের নিরাপদ মৃত্যু নিয়ে এখনই সোচ্চার হতে হবে। এটা যেন ফাঁকা বুলি না হয়। নাগরিক সমাজের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা প্রেশার গ্রুপই হতে পারে চালিকা শক্তি: যাত্রী কল্যাণ সমিতি, শ্রমিক সংঘ, নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ নৌপথ। এ ধরনের নাগরিক সংগঠনের শক্তিশালী ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এই নাগরিক ঐকমত্যের জরুরতটা আসলে কোন জায়গায়? এককথায় উত্তর দিলে সেটা হলো জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সামষ্টিক ট্রমা বা বৈকল্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। লেখার শেষটা জনপ্রিয় জাপানি কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির প্রবন্ধ ‘আ ওয়াক টু কোবে’র ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারা দিয়ে শেষ করতে চাই।
এই প্রবন্ধের প্রেক্ষাপট ছিল জাপানের কোবে শহরে ১৯৯৫ সালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতম ভূমিকম্প ও ঠিক দুই মাস পরে টোকিও সাবওয়েতে ঘটে যাওয়া সারিন গ্যাস হত্যাকাণ্ড। কোবে ভূমিকম্পে মারা যায় পাঁচ হাজারজনের মতো মানুষ, আর সারিন হত্যাকাণ্ডে মারা গিয়েছিল ১৪ জনের মতো। ভূমিকম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর সারিন ছিল সন্ত্রাসী হত্যাকাণ্ড, অর্থাৎ মানবসৃষ্ট। দুটি ঘটনাই জাপানের জাতীয় ট্রমায় পরিণত হয়েছিল, যার রেশ এখনো বিদ্যমান।
মুরাকামি কোবে শহরে তাঁর কৈশোরের বড় একটা সময় কাটিয়েছেন। সেই সূত্রে তিনি ১৯৯৭ সালে কিয়োটো শহর থেকে কোবে শহরে হাঁটা দিয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে দুর্যোগ নিয়ে তাঁর বিচ্ছিন্ন চিন্তাভাবনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছিলেন সেই প্রবন্ধে।
তিনি বলছেন, দুর্যোগ, তা প্রাকৃতিক হোক বা মানবসৃষ্টই, দুটিই আসলে ভায়োলেন্স বা সহিংসতা। এসব দুর্যোগ কীভাবে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রভাবিত করে কিংবা জাতীয় মনস্তত্ত্বকে গড়ন দেয়, তার প্রভাব নিয়েই বলেছেন। তাঁর মতে, প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুই দুর্যোগের ট্রমার মধ্যে ফারাক নেই বললেই চলে। যদি এসব দুর্যোগ পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে দুর্যোগ আসলে আমাদের মনুষ্যপ্রজাতির প্রকাশ্য কিংবা প্রচ্ছন্ন ভূমিকাতেই ঘটতে থাকে। লেখাটা তিনি শেষ করেন একটা মোক্ষম প্রশ্ন দিয়ে: আমরা তাহলে কী করতে পারি এ থেকে রেহাই পেতে কিংবা নিরাপদে থাকতে।
উত্তরটা আমাদের খুঁজে নিতে হবে। রাষ্ট্র মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান। মুরাকামির প্রশ্নে নাগরিক হিসেবে কিংবা রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে যাঁরা নিয়োজিত, তাঁদের উচিত সেই করণীয় জায়গাটা পোক্ত করা। তা না হলে এর যে মানসিক ট্রমা বা বৈকল্য, তা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট—দুটি বিপর্যয়েই মুরাকামি বলছেন শারীরিক কিংবা মনস্তাত্ত্বিক, দুটি প্রভাবই একই সূত্রে গাঁথা।
হারুকি মুরাকামি তাঁর বিখ্যাত নন-ফিকশন বই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড: দ্য টোকিও গ্যাস অ্যাটাক অ্যান্ড দ্য জাপানিজ সাইকি’ এর ভূমিকা লিখেছেন— ‘...আই কেপ্ট আস্কিং মাইসেলফ: হোয়াট ওয়াজ দ্য সারিন গ্যাস অ্যাটাক অন দ্য সাবওয়ে অল অ্যাবাউট? অ্যাট দ্য সেম টাইম, অ্যাজ আই ড্র্যাগড অ্যালং দ্য শ্যাডো অব দ্য সারিন গ্যাস অ্যাটাক, আই ওয়ান্ডারড: হোয়াট ওয়াজ দ্য হানশিন আর্থকোয়েক? টু মি, দ্য টু ইভেন্টস ওয়ারেন্ট সেপারেট অ্যান্ড ডিসক্রিট; আনর্যাভেলিং ওয়ান মাইট হেল্প আনর্যাভেল দ্য আদার। দিস ওয়াজ সাইমালটেনিয়াসলি আ ফিজিক্যাল অ্যান্ড আ সাইকোলজিক্যাল ইস্যু। ইন আদার ওয়ার্ডস, দ্য সাইকোলজিক্যাল ইজ ইটসেলফ দ্য ফিজিক্যাল। অ্যান্ড আই হ্যাড টু ক্রিয়েট মাই ওন সর্ট অব করিডর কানেকটিং দ্য টু। আই কুড অ্যাড অ্যান ইভেন মোর ক্রিটিক্যাল কোয়েশ্চন টু দ্য মিক্স, নেমলি: হোয়াট ক্যান আই ডু অ্যাবাউট ইট?’
পদ্মায় বাসডুবির ঘটনা কিংবা অন্য যেকোনো দুর্যোগের ভয়াবহ বিপদ প্রশমনে ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে নিরাপদ জনপদ হিসেবে গড় তুলতে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ঐকমত্যের বিকল্প নেই।
ড. ইলিয়াছ কামাল রিসাত সমাজবিজ্ঞান গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
ই-মেইল: risat1346@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব