এসএসসির ফল পেয়ে উচ্ছ্বিসত শিক্ষার্থীরা।
এসএসসির ফল পেয়ে উচ্ছ্বিসত শিক্ষার্থীরা।

মতামত

এসএসসির ফল: নম্বরের কাছে কি হেরে যাচ্ছে জিপিএ

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আমার এক আত্মীয়া এই পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (গোল্ডেন) পেয়েছে। মূলত সব বিষয়ে এ-প্লাস পেলে তাকে নাকি গোল্ডেন জিপিএ বলা হচ্ছে, যদিও প্রচলিত জিপিএ গ্রেডিং পদ্ধতিতে ‘গোল্ডেন’ শব্দটি নেই। তবে কারা, কবে থেকে জিপিএ-৫-এর সঙ্গে ‘গোল্ডেন’ শব্দটি যোগ করতে শুরু করেছে, সেই তথ্য আমার কাছে নেই।

গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েও আমার ওই আত্মীয়া ও তাঁর পরিবার ভালো নেই। মেয়েটি অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করছে, কারণ তাঁর বন্ধুরা তাঁর চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে। মানে দাঁড়াচ্ছে, সব বিষয়ে লেটার গ্রেড দেওয়ার পাশাপাশি এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় নম্বর যুক্ত করা শুরু করেছে। ফলে এই নম্বরই নাকি ‘গোল্ডেন জিপিএ-৫’ পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার উপাদান হয়ে উঠছে।

বিষয়টি শোনার পর আমি কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে পড়েছি। নম্বরের এই খপ্পরে কেবল আমার ওই আত্মীয়া নয়, দেশের হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে এসব পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর একধরনের মানসিক পীড়ার মধ্যে থাকছে। যে ‘নম্বর’ প্রতিযোগিতা বন্ধ করার জন্য জিপিএ বা গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ চালু হয়েছিল, সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে উজ্জীবিত করার জন্য ঠিক কবে থেকে আবার আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় নম্বর প্রকাশের ব্যবস্থা চালু করেছে, তা আমার জানা নেই।

আজ থেকে দুই দশক আগে, যখন আমরা জিপিএ-পদ্ধতিতে স্কুল-কলেজ পাস করেছি, তখন এই নম্বর প্রকাশের পদ্ধতি চালু ছিল না। এমনকি ‘গোল্ডেন’ নামকরণও ছিল না। জিপিএ-৫ স্কেলে জিপিএ-৫ মানেই ছিল সর্বোচ্চ ফলাফল—আর কোনো প্রশ্ন নেই, আর কোনো তুলনা নেই। কারণ, এটাই তো ছিল জিপিএ-পদ্ধতির সৌন্দর্য।

প্রায় দুই শ বছর আগে, ১৭৯২ সালে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ফলাফল মূল্যায়নের জন্য একটি সংখ্যাভিত্তিক পদ্ধতি চালু করেছিলেন উইলিয়াম ফ্যারিশ। পরবর্তী সময়ে জিপিএ-৪ স্কেলে ১৮১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় তা অনুসরণ করা শুরু করে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ আমাদের অনেক আগে থেকেই এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হলেও, বাংলাদেশে ২০০১ সালে নম্বরভিত্তিক তীব্র প্রতিযোগিতা কমানো এবং সামগ্রিক মূল্যায়নে জোর দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পুরোনো বিভাগ পদ্ধতি (প্রথম/দ্বিতীয়/তৃতীয়) বাতিল করে গ্রেডিং পদ্ধতি (জিপিএ) চালু করে। এতে ৫.০০ স্কেলে এ-প্লাস থেকে এফ পর্যন্ত গ্রেড দেওয়া হয়।

সরকারের বোধগম্য হওয়া জরুরি যে জিপিএ ও নম্বর একসঙ্গে প্রকাশের ফলে যে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হচ্ছে, তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে সন্তান সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করেও নিজেকে ব্যর্থ মনে করছে, সেই ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।

এই জিপিএ বা গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ পদ্ধতি মূলত শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত প্রকৃত নম্বরকে একটি নির্দিষ্ট গ্রেডের আওতায় নিয়ে আসে। যেমন, ৮০ থেকে ১০০ নম্বর পেলে এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ বলা হচ্ছে, ৭০ থেকে ৭৯ নম্বর পেলে ‘এ’ এবং জিপিএ-৪—এভাবে ধাপে ধাপে গ্রেড নির্ধারিত হয়ে আসছে।

অর্থাৎ এই পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো, একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে ৮০ পেলেন নাকি ৯৯ পেলেন, তা গণনার মধ্যে পড়বে না। যেহেতু ৮০ থেকে ১০০ পর্যন্ত নম্বরপ্রাপ্তদের এ-প্লাস দেওয়া হয়, সেহেতু উভয়েই সমানভাবে সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনকারী হিসেবে বিবেচিত হন। এটাই ছিল জিপিএর মূল দর্শন।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় উল্টো পথে হাঁটছে। ধরা যাক, দুজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন গড়ে ৯৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছে, আরেকজন পেয়েছে ৮৩ শতাংশ। কিন্তু যেহেতু উভয়েই ৮০-এর ওপর নম্বর পেয়েছে, তাই গ্রেড পদ্ধতি অনুযায়ী দুজনেই জিপিএ-৫ পেয়েছে। জিপিএ কার্ডে তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু প্রকৃত নম্বর প্রকাশ পাওয়ায় এখন সবাই জানতে পারছে যে তাঁদের প্রকৃত পারফরম্যান্সে বিশাল ব্যবধান রয়েছে।

এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার ফলেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজের মধ্যে জিপিএর গুরুত্ব কমে গিয়ে নম্বরের গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পারিবারিক আলোচনায় ‘কে কত নম্বর পেয়েছে’—এই প্রশ্নই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
জিপিএর প্রকৃত দর্শন ব্যর্থতার দিকে যাওয়ায় শিক্ষার এই ফলাফল-পদ্ধতির মান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জেনে হোক, না বুঝে হোক, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ফলাফল নিয়ে একধরনের ‘দ্বিচারিতা’ করছে, যা কখনোই কাম্য নয়।

একবার ভাবুন তো, একজন শিক্ষার্থী সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও যদি অসন্তোষ প্রকাশ করে, তাহলে এই পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা আসলে কতটুকু থাকে? যে ফলাফল-ঘোষণা শিক্ষার্থীদের মানসিক ও দৈহিক অবসাদ তৈরি করে, সেই নিয়ম কখনোই প্রয়োজনীয় হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও, যখন থেকে বিষয়ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ নম্বরসহ মার্কশিট প্রকাশ করা শুরু হয়েছে, তখন থেকে এই মৌলিক প্রশ্নটা তোলা স্বাভাবিক যে, জিপিএ কি আসলেই শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা ও পরিশ্রমের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না? নাকি নম্বরের কাছে তার গুরুত্ব ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে?

শিক্ষার্থীদের গ্রেডের পাশাপাশি নম্বর দেওয়ার যৌক্তিকতা কী, তা এই পদ্ধতির উন্নয়নে জড়িত শিক্ষাবিদরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এই পদ্ধতি যে গ্রহণযোগ্য নয়, তা অকপটে স্বীকার করতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি মনে করে যে শুধু জিপিএ দিয়ে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না—একাদশে ভর্তিপ্রক্রিয়া, বৃত্তি নির্ধারণ কিংবা মেধাক্রম তৈরির ক্ষেত্রে যখন একাধিক শিক্ষার্থীর জিপিএ সমান হয়ে যাচ্ছে—তাহলে এই সমস্যা দূর করার জন্য অন্যান্য বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। যেমন, কোনো একটি প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তি দেবে; সেই প্রতিষ্ঠানের বৃত্তির সংখ্যা যদি ১০০ হয় আর আবেদনকারীর সংখ্যা ১৫০ (সবাই গোল্ডেন জিপিএ-৫) হয়, তাহলে এর সমাধান হতে পারে খুবই সাধারণভাবে—ওই শিক্ষার্থীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করা। সেটাতেও যদি সমতা থেকে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার আয়োজন করা যেতে পারে। কারণ, এমনও শিক্ষার্থী আছে, যারা কেবল জিপিএ-৫ পায়, কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের ভেতরে ঠিক কী লেখা থাকে, তা মূলত নোট-নির্ভর পড়াশোনার কারণে অনেকে বইটি খুলেও পড়ে না।

আর কলেজে ভর্তির জন্য অবশ্যই পছন্দক্রম, বসবাসের এলাকার বাসিন্দা হওয়া কিংবা বিষয়ভিত্তিক গ্রেড বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব বিকল্প পথ অবলম্বন না করে নম্বরভিত্তিক প্রতিযোগিতা চালু রাখা মানে সেই পুরোনো সমস্যাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে আসা, যে সমস্যা দূর করার জন্যই একদা জিপিএ পদ্ধতি চালু হয়েছিল।
এই প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের ওপর দৃশ্যমান অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। জিপিএ-৫-এর প্রয়োজনীয়তা যদি ফুরিয়েই যায়, তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন পুরোনো নম্বরভিত্তিক সেকেলে পদ্ধতিই আবার সরাসরি চালু করছে না?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফলাফলে কেন নম্বর ফিরছে না? অন্তত তাহলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা জানতেন, তাঁরা ঠিক কোন পদ্ধতিতে মূল্যায়িত হচ্ছেন। দুই পদ্ধতির এই মিশ্রণ শিক্ষার্থীদের সামনে একধরনের অস্পষ্টতা তৈরি করছে। তাঁরা বুঝতে পারছেন না, তাঁদের আসল অর্জন কী দিয়ে বিচার হবে—জিপিএ দিয়ে, নাকি নম্বর দিয়ে।

সরকারের বোধগম্য হওয়া জরুরি যে জিপিএ ও নম্বর একসঙ্গে প্রকাশের ফলে যে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হচ্ছে, তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে সন্তান সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করেও নিজেকে ব্যর্থ মনে করছে, সেই ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। হয় সরকারকে সম্পূর্ণভাবে জিপিএ পদ্ধতিতে ফিরে গিয়ে নম্বর প্রকাশ বন্ধ করতে হবে, নয়তো নম্বরভিত্তিক পদ্ধতিতেই পুরোপুরি ফিরে গিয়ে জিপিএর ধারণা বাদ দিতে হবে। দুটোকে মিশিয়ে রাখলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু বিভ্রান্তি আর মানসিক চাপই বাড়াবে, প্রকৃত মূল্যায়নের কোনো উপকারে আসবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে তার বন্ধুর চেয়ে কম নম্বর পাওয়ার কারণে কাঁদতে না হয়।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
    ই–মেইল: nadim.ru@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব