হাসান ফেরদৌসের কলাম

বুদ্ধিজীবী কেন স্বৈরাচারের দোসর হয়

আলতাফ হোসেন জন্মগতভাবে সিলেটের, কিন্তু বিশ্বাসে পাকিস্তানপন্থী। সামরিক একনায়ক আইয়ুব খানের আমলে ডন পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল বাঙালিদের পাকিস্তানি ও মুসলমান বানানো। সে কাজে তিনি এতটা সফল হন যে আইয়ুব তাঁকে নিজ মন্ত্রিসভায় জায়গা করে দেন।

আলতাফ হোসেন একা নন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর খুব কম সময়ই আমরা প্রকৃত গণতন্ত্রের আস্বাদ পেয়েছি। অধিকাংশ সময়ই গেছে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অধীন। এই দীর্ঘ সময়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একাংশ কোনো না কোনো অজুহাতে স্বৈরাচার ও আধা স্বৈরাচারী সরকারের পাশে ঢাল হাতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। কেউ ধর্মের নামে, কেউ ভারতবিরোধিতার নামে, কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, কেউবা অসাম্প্রদায়িকতা ও উন্নয়নের নামে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বনের যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছেন। 

বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন, বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁদের প্রধান কাজ ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে অনবরত আঘাত করা। তাঁরা ঠিক উল্টোটা করেছিলেন। শত্রুর অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সহজ, কিন্তু নিজের পক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই বুদ্ধিজীবীর সততার প্রকৃত পরীক্ষা। বুদ্ধিজীবী হিসেবে এই বড় পরীক্ষায় বাংলাদেশের আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

আমরা সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের কথাও বলতে পারি। ১৯৭১ সালের খাণ্ডবদাহনের প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতার নামে সেই গণহত্যাকে মেনে নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্বর হামলা চালায়, তার পরপরই তিনি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পুরস্কার হিসেবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই উপাচার্য পদ লাভ করেন। তিনি পাকিস্তানের প্রতি এতটাই অনুগত ছিলেন যে তাঁর কাছে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ‘পতন’।

গণহত্যাকে প্রকাশ্য উদ্‌যাপন করার প্রয়োজন তাঁর ছিল না। তিনি পাকিস্তানের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি বয়ান তৈরি করেছিলেন, যেখানে দেখানো হয়েছিল যে সেনাবাহিনী জাতীয় সংহতি রক্ষা করছে আর বাঙালিদের প্রতিরোধ ছিল ভারতের উসকানিতে তৈরি হওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদ। এভাবেই মতাদর্শের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল সব নৃশংসতা।

সম্মতি নির্মাণ

এই ধরনের বয়ান নির্মাণে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বনে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কোনো মনোপলি আছে, আমি সে কথা বলছি না। ইতিহাসে বিভিন্ন সময় একদল বুদ্ধিজীবী বরাবরই নির্দয় ও পৈশাচিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি এগিয়ে দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থেকেছেন।

ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট ও সহজ করে ব্যাখ্যা করেছেন আন্তোনিও গ্রামসি ও জর্জ অরওয়েল। নোয়াম চমস্কির ঘাড়ে ভর করে এখন যাকে আমরা ‘সম্মতি নির্মাণ’ (বা ম্যানুফাকচারিং কনসেন্ট) নামে অভিহিত করে থাকি, গ্রামসিই প্রথম, যিনি তাঁর প্রিজন নোটবুকস-এ বুদ্ধিজীবীদের সেই দুষ্কর্ম ধরিয়ে দিয়েছিলেন। গ্রামসির কাছে সবাই বুদ্ধিজীবী, রাজমিস্ত্রি হই বা কলমপেশা অধ্যাপক, আমরা সবাই যার যার মতো বুদ্ধি ব্যবহার করে কোনো না কোনো কাজ করি।

কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এমন একদল রয়েছেন, যাঁদের কাজ কোনো মত, বিশ্বাস বা মতাদর্শের মই ব্যবহার করে ক্ষমতার পক্ষে ওকালতি করা। তাঁদের তৈরি বয়ান ছাড়া স্বৈরাচারের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব। স্তালিন, হিটলার, আইয়ুব বা হাসিনার জন্য এসব বুদ্ধিজীবী ঠিক ততটা জরুরি, যতটা জরুরি কোনো গাড়ি চলার জন্য জ্বালানির।

স্বৈরশাসকের নিজের অস্ত্র বন্দুক। বুদ্ধিজীবীর অস্ত্র তাঁর কলম ও ভাষা। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক জর্জ অরওয়েল হাতে–কলমে দেখিয়েছিলেন, আমাদের নিত্যব্যবহার্য ভাষা ব্যবহার করে একদল বুদ্ধিজীবী কীভাবে স্তালিন অথবা হিটলারের মতো নির্মম স্বৈরশাসককেও অপরিহার্য প্রমাণ করতে পারেন।

রাজনৈতিক ভাষার একটা কাজ হচ্ছে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করা। এ কাজ সবচেয়ে ভালো করতে সক্ষম দেশের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা জনপ্রিয়, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা থাকে। ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজার পক্ষ নিয়ে তেমন কোনো বুদ্ধিজীবী যখন কলম ধরেন, তা তিনি কবি, সাংবাদিক বা অভিনেতা যা-ই হোন, তাঁর কথা লোকে মন দিয়ে শোনে, সে কথায় আস্থা স্থাপন করে। তাঁদের ওকালতিতে শুধু মিথ্যা নয়, ঠান্ডা মাথার গুম-খুনও পার পেয়ে যায়।

বুদ্ধিজীবী যখন স্বৈরাচারের লেজুড়

বাংলাদেশেও একদল বুদ্ধিজীবী তাঁদের আদর্শগত ভিত্তিভূমি থেকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের প্রতি আপসহীন সমর্থন জানাতে গিয়ে আওয়ামী স্বৈরতন্ত্রের সমর্থক বনে যান। দেশে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, বাক্‌স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। অন্য সবার মতো তাঁরাও সেসব লঙ্ঘনের প্রত্যক্ষদর্শী। শুধু তফাত এই যে এই লঙ্ঘনকে তাঁরা আদর্শগত কারণে প্রয়োজনীয় বিবেচনা করেছেন, ফলে তাঁরা সেই লঙ্ঘনের পক্ষে গীত গেয়েছেন বা নীরব থেকেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ বলতে এসব বুদ্ধিজীবীর কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে তিনটি বিষয়—একাত্তরের ইতিহাসের সংরক্ষণ, মৌলবাদের বিরুদ্ধাচরণ ও অসাম্প্রদায়িকতা। মূল্যবোধ হিসেবে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ তিন নীতি বা আদর্শের মধ্যে সীমিত নয়। আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, ভোটাধিকার, বাক্‌স্বাধীনতা ও বৈষম্যহীন সমাজ—সেসবও এই চেতনার অন্তর্গত।

আওয়ামী আমলে এই মূল্যবোধের প্রতিটি লঙ্ঘিত হয়েছে একদম গোড়া থেকেই। হাসিনার শেষ ষোলো বছরে এই লঙ্ঘন শত গুণ বেড়ে পুরোদস্তুর স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় পরিণত হয়। তবু আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের অন্ধ চোখ অন্ধই রয়ে যায়।

এমন অনেক বুদ্ধিজীবী আমরা দেখেছি, যাঁরা একাত্তরের ইতিহাস ও মূল্যবোধ প্রশ্নে আপসহীন। অথচ সেই তাঁরাই হাসিনা আমলের স্বৈরাচারকে প্রায় বিনা প্রশ্নে সমর্থন দিয়ে গেছেন। যখন দেশে বিনা ভোটের নির্বাচন হয়েছে, তখন তাঁদের অনেকে যুক্তি দিয়েছেন, বাংলাদেশের জন্য শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। হাসিনার পক্ষাবলম্বন করাকে তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করেছেন। কেউ যুক্তি দিয়েছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হাসিনার বিকল্প নেই। 

আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, যখন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রায় পাখির মতো মরছে ছাত্র ও নিরীহ জনতা, সে সময় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে তাঁর গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছিলেন দেশের প্রায় প্রতিটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা।

হাসিনার হাতে গণতন্ত্রের অবনমন ঘটেছে, অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তাদের গৃহীত ব্যবস্থা নিবর্তনমূলক, সে কথা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় অনেকেই নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন। তা সত্ত্বেও এসব নীতিমান বুদ্ধিজীবী হাসিনা ও আওয়ামী শাসনব্যবস্থাকে  মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র রক্ষাকবচ ভেবেছেন। ব্যাপারটার মধ্যে যে স্ববিরোধিতা রয়েছে, তা তাঁরা জানতেন না, তা নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে মন্ত্রের মতো পুনরাবৃত্তি করার পর তাঁরা নিজেরাই হয়ে পড়েন স্বৈরাচারের লেজুড়।

বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য নয়

সোভিয়েত আমলে এমন অনেক বুদ্ধিজীবী ও ত্যাগী কমিউনিস্ট ছিলেন, যাঁরা স্তালিনের স্বৈরশাসন বিষয়ে অবহিত থাকলেও তার প্রতি সমর্থন ত্যাগ করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের স্বার্থে স্তালিনের কোনো বিকল্প নেই। তাঁদের একজন ছিলেন নিকোলাই বুখারিন। সেই স্তালিনের হাতেই তাঁকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়।

বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের কথাও বলা যায়। তিনি জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্বে আস্থাবান ছিলেন, মনে করতেন, এই শ্রেষ্ঠত্বকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে হিটলারের কোনো বিকল্প নেই।

তাঁদের প্রত্যেকের যুক্তিপদ্ধতি ও প্রস্তাবনার সঙ্গে হাসিনার স্বৈরশাসনের পক্ষে বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীদের অবস্থানের অভিন্নতা চোখে পড়ার মতো। বুখারিন জানতেন, স্তালিনের হাত নিরপরাধ মানুষের রক্তে রাঙা; তা সত্ত্বেও তিনি বিপ্লবকে পার্টি থেকে কিংবা পার্টিকে তার নেতা থেকে পৃথক করে দেখতে পারেননি।

হাইডেগার হিটলারকে একজন সাধারণ রাজনৈতিক শাসকের অবস্থান থেকে তুলে জার্মানির ঐতিহাসিক নিয়তির মূর্ত প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। আর বাংলাদেশেও এই বুদ্ধিজীবীরা ধর্মনিরপেক্ষতা, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে মিলিয়ে একটি অভিন্ন নৈতিক সত্তা নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন।

বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন, বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁদের প্রধান কাজ ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে অনবরত আঘাত করা। তাঁরা ঠিক উল্টোটা করেছিলেন। শত্রুর অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সহজ, কিন্তু নিজের পক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই বুদ্ধিজীবীর সততার প্রকৃত পরীক্ষা। বুদ্ধিজীবী হিসেবে এই বড় পরীক্ষায় বাংলাদেশের আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

  • হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব