
যুক্তরাষ্ট্র এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যারা কেবল ধ্বংস করতেই জানে। কিউবার রাজধানী হাভানার ‘র্যামন গঞ্জালেজ করো’ নামক প্রসূতি হাসপাতালে আমি স্বচক্ষে দেখেছি, মানবিক মানদণ্ডে এই ধ্বংসলীলার চেহারা কতটা ভয়াবহ।
হাসপাতালের একটি বেডে শুয়ে আছেন পঞ্চাশ বছর বয়সী মারিয়া। পরনে তাঁর একটি গাঢ় নীল কম্বল এবং পাশে বসে আছেন তাঁর দুই বন্ধু। মারিয়া জরায়ুমুখের ক্যানসারের শেষ পর্যায়ে থাকলেও নিজের চিকিৎসকদের জন্য তাঁর মুখে অঢেল প্রশংসা। তবে তিনিও কয়েক দশক ধরে কিউবার ওপর চলতে থাকা মার্কিন অবরোধের শিকার।
এ বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন কিউবায় জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর চড়া শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেন, তখন থেকে এই অবরোধ আরও নিষ্ঠুর রূপ নিয়েছে। ফলস্বরূপ তিন মাস ধরে দেশটিতে জ্বালানি আমদানি প্রায় বন্ধ। এর ফলে দ্বীপদেশটির জ্বালানি ও ডিজেল রিজার্ভ ফুরিয়ে আসছে। পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার মুখে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মারিয়ার মতো রোগীদের পক্ষে এখন হাসপাতালে আসাই বড় এক সংগ্রামের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মারিয়া আমাকে বললেন, চিকিৎসকদের যথাযথ সেবা প্রদানের জন্য যা যা প্রয়োজন, হাসপাতালে এখন তার অনেক কিছুই নেই। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি এখন তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও এখন বন্ধ রয়েছে। রক্তক্ষরণ বন্ধে ব্যবহৃত অতি সাধারণ ‘ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড’ নামক ওষুধটিও সেখানে নেই। মারিয়ার রক্তক্ষরণ এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে তিনি এখন তীব্র রক্তাল্পতায় ভুগছেন।
যখন তাঁকে বললাম যে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী এই নিষেধাজ্ঞা মূলত কিউবার মানুষকে সাহায্যের জন্য দেওয়া হয়েছে, তখন তিনি এমন মন্তব্যকে চরম অবমাননাকর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ডা. লিলিঁয়ান পেরুয়েরা তুলে ধরলেন এ সংকটের আরও বৃহত্তর ও ভয়াবহ রূপ। তিনি জানান, যাতায়াত খরচের টাকা না থাকায় চিকিৎসাকর্মীরা ঠিকমতো কর্মস্থলে আসতে পারছেন না, যার ফলে প্রতিটি ওয়ার্ডে লোকবলসংকট দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালগুলো সচল না থাকায় মায়েরা ঘরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হচ্ছেন। আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের সংখ্যা এবং বহু রোগ দেরিতে শনাক্ত হওয়ার ফলে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। যখন মারিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম যে পশ্চিমাদের উদ্দেশে তাঁর কোনো বার্তা আছে কি না, তিনি চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি শুধু এটুকুই বললেন যে কিউবার মানুষও অন্য সবার মতোই সুখে ও শান্তিতে থাকতে চায়। মর্যাদা নিয়ে মানুষের মতো বাঁচার অধিকারটুকুই তাদের মূল চাওয়া।
কিউবার স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরে তাঁদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের গর্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হয়েও তারা উন্নত দেশগুলোর সমপর্যায়ের গড় আয়ু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এবং শিশুমৃত্যুর হার সর্বনিম্নে নামিয়ে এনেছিল। অথচ গত বছর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে সেই শিশুমৃত্যুর হার ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ট্রাম্প সম্ভবত মনে করেন যে নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তিনি মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পারবেন এবং বিশ্বকে ভীতি প্রদর্শন করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রতি বাড়ছে গভীর ক্ষোভ ও তীব্র ঘৃণা।
হাভানার ওপর হয়তো আকাশ থেকে মার্কিন মিসাইলের বর্ষণ হচ্ছে না, তবে বর্তমানে যা ঘটছে, তাকে যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। আমার অবস্থানের সময় পুরো শহর এক সপ্তাহের মধ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো গভীর অন্ধকারে ডুবে যায়। মানুষের কাছে রান্নার গ্যাস নেই বলে তারা কয়লার চুলায় রান্না করছে। জ্বালানিসংকটে আবর্জনা পরিষ্কারের ট্রাক চলতে পারছে না বলে পথে পথে উপচে পড়ছে নোংরা। এ ছাড়া পানি নিষ্কাশন ও পাম্পব্যবস্থা বিকল হওয়ার পথে।
ট্রাম্প যদিও কিউবাকে একটি স্থিতিশীল ও মুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে এটি সেখানকার নিরপরাধ মানুষের ওপর এক সরাসরি যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়। দীর্ঘ ছয় দশকের এই অবরোধ মূলত একটি দেশ ও তার ব্যবস্থার শ্বাসরোধ করার পরিকল্পনা। এখানকার একসময়ের চোখধাঁধানো ভবনগুলো আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কারণ সিমেন্ট, ইস্পাত কিংবা মেরামতের যন্ত্রপাতি পাওয়া দুষ্কর।
এখানকার গাড়িচালকেরা এখনো সেই পঞ্চাশের দশকের পুরোনো মডেলের গাড়ি নিয়ে টিকে থাকার যুদ্ধ করছেন। এক চালকের আক্ষেপ, তাঁরা যেন একুশ শতকে বাস করেও আসলে ঊনবিংশ শতাব্দীতেই রয়ে গেছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেছিলেন, তখন পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আশার আলো দেখা গিয়েছিল। তবে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তাঁর প্রথম মেয়াদে সবকিছু ধূলিসাৎ করে দেন। বর্তমানে মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলা থেকে আসা জ্বালানি তেল সরবরাহের পথগুলোও বন্ধ করে দিয়ে এই দ্বীপকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
গণতান্ত্রিক উত্তরণের নামে এসব বললেও ট্রাম্প নিজেই একসময় দাম্ভিকতা নিয়ে বলেছিলেন যে তিনি কিউবাকে কবজায় নিতে পারেন। এমনকি নিজের মর্জিমাফিক যা ইচ্ছা কিউবাকে নিয়ে করতে পারেন বলেও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলেন তিনি। একসময় কিউবার পর্যটন ছিল তাঁদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। কিন্তু এখন সেখানে পর্যটক আসা শূন্যের কোঠায় নেমেছে। একের পর এক হোটেল ও ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। মানুষ চরমভাবে নিঃস্ব ও আশাহীন হয়ে পড়ছে।
ড্যানিয়েল নামের এক তরুণ নির্মাতা বলছেন, অবরোধ হয়তো সরকারের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু এটি মূলত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ট্রাম্প যে কিউবানদের স্বার্থে এসব করছেন, সেটি পুরোপুরি মিথ্যাচার বলে তিনি মনে করেন।
গত বছর আমি বাগদাদের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মানুষের মুখে দেশ ধ্বংসের করুণ আর্তি শুনেছিলাম। কয়েক সপ্তাহ পরে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে গিয়ে দেখেছি, মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে কীভাবে সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করছে ইসরায়েল।
এ ছাড়া মার্কিন মদদে গাজাকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার যে আয়োজন চলছে এবং ইরানের ওপর যে সামরিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বের কাছে আমেরিকা এখন ধ্বংস ও বিভীষিকার সমার্থক শব্দ।
ট্রাম্প সম্ভবত মনে করেন যে নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তিনি মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পারবেন এবং বিশ্বকে ভীতি প্রদর্শন করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রতি বাড়ছে গভীর ক্ষোভ ও তীব্র ঘৃণা।
ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ফিলিস্তিন ও কিউবা এখন মার্কিন ধ্বংসাত্মক রাজনীতির নগ্ন উদাহরণ। বিশ্ববাসী এখন আর এই একমুখী প্রভাববলয়ের ওপর ভরসা করতে পারছে না এবং মুক্তির নতুন কোনো পথ খুঁজছে।
আগামী মাসগুলোয় কিউবার মানুষ কীভাবে টিকে থাকবে, তা অনিশ্চিত। তবে এটি এখন পরিষ্কার যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন তার এক বিকৃত ও নিষ্ঠুর অন্তিম সময়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ওভেন জোন্স ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষপ্তাকারে অনূদিত