গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার রঘুনাথপুরে দেশি ছোট মাছের বাজার। এই বাজারে পাওয়া যায় তুরাগ নদ ও গোয়ালিয়া বিলের সুস্বাদু সব মাছ।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার রঘুনাথপুরে দেশি ছোট মাছের বাজার। এই বাজারে পাওয়া যায় তুরাগ নদ ও গোয়ালিয়া বিলের সুস্বাদু সব মাছ।

মতামত

দেশি মাছের আঁতুড়ঘর হারিয়ে গেলে মাছ ফিরবে কোথায়

একটি নদীর গভীর দহ হারিয়ে গেলে মানচিত্রে হয়তো বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। কিন্তু সেই ছোট জলাধারের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে মাছের আশ্রয়, জেলেদের জীবিকা এবং একটি জনপদের দীর্ঘদিনের সামাজিক স্মৃতি।

বগুড়ার শেরপুরে করতোয়া নদীর গোসাঁইয়ের দহ নিয়ে ৫ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সেই উদ্বেগই সামনে এনেছে।

প্রতিবেদনে স্থানীয় প্রবীণেরা জানিয়েছেন, একসময় দহটিতে সারা বছর পানি থাকত; বোয়াল, আইড়, চিতলসহ নানা মাছ পাওয়া যেত।

এখন এর বড় অংশ কচুরিপানায় ঢাকা। তাঁদের বর্ণনায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমা, দখল ও ভরাটের কথা এসেছে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো দহটির অতীত পরিবেশগত গুরুত্ব বোঝার মূল্যবান সূত্র।

একই সঙ্গে এগুলো একটি জরুরি প্রশ্ন তুলেছে: দেশি মাছের আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

মৎস্যসম্পদের অগ্রগতি মূল্যায়নে আমরা সাধারণত উৎপাদনের পরিমাণ দেখি। কিন্তু মোট মাছের উৎপাদনের পাশাপাশি জানতে হবে—নদী ও বিলের কোন মাছ টিকে আছে, কোথায় তাদের প্রজনন হচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে তারা কোথায় আশ্রয় পাচ্ছে।

চাষের মাছের উৎপাদন বাড়ানো খাদ্যের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ।

পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছের বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন আলাদা পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও পর্যবেক্ষণ।

দহ কেন গুরুত্বপূর্ণ

নদীর গভীর অংশ বা দহকে শুধু পানিভরা গর্ত হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। বর্ষায় নদী, খাল, বিল ও প্লাবনভূমির মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়।

অনেক মাছ সেই সংযোগপথে চলাচল করে এবং খাদ্য গ্রহণ, বেড়ে ওঠা ও প্রজননের জন্য বিভিন্ন আবাস ব্যবহার করে।

পানি নেমে গেলে স্থায়ী জলাশয় ও নদীর গভীর অংশ কিছু প্রজাতির টিকে থাকার আশ্রয় হয়ে ওঠে।

এফএওর এশীয় প্লাবনভূমির মৎস্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক নির্দেশিকায় এমন গভীর, স্থায়ী জলাশয়কে শুষ্ক মৌসুমের আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ, মাছের জীবনচক্রের জন্য শুধু একটি জলাশয়ে পানি থাকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত আবাসে পৌঁছানোর সুযোগ।

বাংলাদেশের প্লাবনভূমির মৎস্যসম্পদ নিয়ে এফএওর বিশ্লেষণেও নদী থেকে প্লাবনভূমিতে এবং পানি কমলে স্থায়ী জলাশয়ে মাছের চলাচলের গুরুত্ব উঠে এসেছে।

এখানে একটি বৈজ্ঞানিক পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। কোনো দহে প্রচুর মাছ পাওয়া গেলেই সেটিকে সব প্রজাতির প্রজননস্থল বলা যায় না।

সেটি প্রাপ্তবয়স্ক মাছের আশ্রয়, পোনার বিচরণক্ষেত্র কিংবা শুষ্ক মৌসুমে বেঁচে থাকার স্থানও হতে পারে।

গোসাঁইয়ের দহের প্রকৃত ভূমিকা নির্ধারণে মৌসুমভিত্তিক জরিপ দরকার। তবে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত এর অবশিষ্ট অংশ রক্ষার উদ্যোগ অপেক্ষায় রাখার যুক্তি নেই।

চলনবিলের দেশি মাছ

খননের সঙ্গে মাছের প্রয়োজনও বিবেচনায় আসুক

প্রতিবেদনে করতোয়ার পুরোনো গতিপথ ধরে খননের পরিকল্পনার কথা এসেছে। এই সুযোগে মৎস্যসম্পদের প্রয়োজনকে পরিকল্পনার শুরুতেই যুক্ত করা উচিত। খননের নকশা তৈরির আগে জানতে হবে—কোন অংশে কত দিন পানি থাকে, কোথা দিয়ে দহে পানি প্রবেশ করে এবং কোন প্রতিবন্ধকতায় সেই চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

আমার প্রস্তাব, পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৎস্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন করুক। প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা যেতে পারে। পুরোনো মানচিত্র, বর্তমান ভূমি ব্যবহার, নদীর প্রবাহ এবং স্থানীয় জেলেদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে পুনরুদ্ধারের নকশা তৈরি করতে হবে।

খননকাজে কিছু গভীর অংশ সংরক্ষণ, নদীর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ এবং পাড়ের স্থিতিশীলতা বিবেচনায় থাকা জরুরি। খনন করা মাটি কোথায় রাখা হবে, সেটাও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। সেই মাটি দিয়ে সংযোগপথ আবার বন্ধ হয়ে গেলে কাজের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজনও বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে জলপ্রবাহ ও মাছের চলাচলের সুযোগ বজায় থাকে।

নদী-বিলের সংযোগ পুনঃস্থাপনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশেই আছে। এফএওর নথিতে টাঙ্গাইলের সিনহারাগী বিল ও ধলেশ্বরী নদীর মধ্যে সংযোগখাল খননের একটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় পর্যবেক্ষণে মাছের মজুত ও আহরণ বৃদ্ধির কথা উঠে আসে; পরে শুষ্ক মৌসুমের অভয়াশ্রম এবং ছোট মাছ রক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। এই অভিজ্ঞতা সংযোগ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখায়। তবে গোসাঁইয়ের দহে কী ফল পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে এখানকার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ওপর।

পোনা ছাড়ার আগে আবাস ফিরিয়ে আনা

জলাশয় পুনরুদ্ধারের আলোচনায় প্রায়ই পোনা অবমুক্ত করার প্রস্তাব আসে। গোসাঁইয়ের দহে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পানির স্থায়িত্ব, গুণমান, প্রাকৃতিক খাদ্য এবং বিদ্যমান মাছের অবস্থা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আবাসস্থলের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রেখে পোনা ছাড়লে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া অনিশ্চিত।

কচুরিপানা অপসারণের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক ব্যবস্থা দরকার। অপসারিত উদ্ভিদ কোথায় রাখা হবে, আবার কত দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং আশপাশ থেকে বর্জ্য বা দূষিত পানি আসছে কি না—এসব দেখতে হবে। পানির গভীরতার পাশাপাশি দ্রবীভূত অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় সূচক পরীক্ষা করা উচিত। গোসাঁইয়ের দহের পানি পরীক্ষা ছাড়া সেখানে দূষণ বা অক্সিজেনস্বল্পতার মাত্রা সম্পর্কে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।

আমার মতে, প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অবশিষ্ট আবাস রক্ষা এবং স্বাভাবিক জলসংযোগ পুনরুদ্ধার। এরপর জরিপের ফল অনুযায়ী দেশি মাছের সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত প্রজাতির পোনা অবমুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

সংরক্ষণের সুফল ভবিষ্যতে পাওয়া গেলেও বিধিনিষেধের কারণে কোনো জেলে পরিবারের আয় তাৎক্ষণিকভাবে কমতে পারে। সেই পরিবারের জন্য সাময়িক সহায়তা ও বাস্তবসম্মত বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা পরিকল্পনায় রাখতে হবে। যাঁদের জীবিকা জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই ব্যবস্থাপনা কঠিন।

জেলেদের সঙ্গে নিয়ে সংরক্ষণ

দহের উপযুক্ত গভীর অংশে মৎস্য অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত। তবে সীমানা নির্ধারণ, মাছ ধরার নিয়ম এবং তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে আলোচনা করেই ঠিক করতে হবে। এফএওর ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকাও স্থানীয় পরিবেশ ও সামাজিক বাস্তবতা অনুযায়ী সরকার, জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেয়।

সংরক্ষণের সুফল ভবিষ্যতে পাওয়া গেলেও বিধিনিষেধের কারণে কোনো জেলে পরিবারের আয় তাৎক্ষণিকভাবে কমতে পারে। সেই পরিবারের জন্য সাময়িক সহায়তা ও বাস্তবসম্মত বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা পরিকল্পনায় রাখতে হবে। যাঁদের জীবিকা জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই ব্যবস্থাপনা কঠিন।

স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে প্রকৃত জেলে, নারী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন। কে সিদ্ধান্ত নেবেন, ব্যয় কীভাবে হবে এবং অভিযোগ কোথায় জানানো যাবে—এসব প্রকাশ্য রাখতে হবে। দহের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকেও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় সম্মান দিতে হবে।

সাফল্য মাপতে হবে মাছ ও মানুষের জীবনে

গোসাঁইয়ের দহ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রথমে একটি ভিত্তিগত তথ্যচিত্র তৈরি করা দরকার। এখন কত দিন পানি থাকে, কী কী মাছ পাওয়া যায় এবং জেলেদের আহরণ ও আয়ের অবস্থা কী—এসব নথিবদ্ধ করতে হবে। পরে একই মৌসুমে একই পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে পরিবর্তন যাচাই করা সম্ভব হবে।

কত ঘনমিটার মাটি সরানো হলো বা কত টাকা ব্যয় হলো, তার পাশাপাশি জানতে হবে—শুষ্ক মৌসুমে আশ্রয় টিকছে কি না, নদীর সংযোগ কার্যকর হয়েছে কি না এবং দেশি মাছের বৈচিত্র্য ও জেলেদের জীবিকায় উন্নতি হচ্ছে কি না। পুনরুদ্ধারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্তত কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

গোসাঁইয়ের দহকে ঘিরে উদ্বেগ আমাদের একটি বৃহত্তর কাজের দিকেও নির্দেশ করে। জেলা পর্যায়ে নদীর গভীর দহ, স্থায়ী বিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগখালের তালিকা তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় উন্নয়ন ও খনন পরিকল্পনায় মাছের আবাসস্থলের তথ্য ব্যবহার করা সহজ হবে।

গোসাঁইয়ের দহের অবশিষ্ট অংশ রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে পুনরুদ্ধারের কাজ এখনই শুরু করা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের স্মৃতি আমাদের অতীতের সন্ধান দিয়েছে। সেই স্মৃতির সঙ্গে গবেষণা, দায়িত্বশীল প্রশাসন এবং জেলেদের অংশগ্রহণ যুক্ত করতে পারলে দহটি আবার জীবন্ত জলজ আবাসে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে। করতোয়ায় দেশি মাছের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সেই সুযোগ কাজে লাগানোই হবে যথার্থ উদ্যোগ।

ড. মো. শরীফুল ইসলাম, সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা।