বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ১২ বছরের শিশু
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ১২ বছরের শিশু

মতামত

অস্ট্রেলিয়ায় ডেঙ্গুর টিকা, বাংলাদেশ কবে পাবে

১ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে মারা গেল ৮ বছর ১০ মাস বয়সী এক ফুটফুটে শিশু, আদরের রুমাইসা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সে। জ্বর এসেছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। কোনো তীব্র পূর্বলক্ষণ বোঝার আগেই মাত্র তিন দিনের মাথায় সব শেষ হয়ে গেল।

১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্তও মেয়েটি স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া আর খেলাধুলা করেছে। শরীরে কোনো র‍্যাশ বা দৃশ্যমান রক্তক্ষরণ ছিল না। রক্তে প্লাটিলেটও ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার। দুপুরে হঠাৎ কাঁপুনি ও খিঁচুনির পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) নেওয়ার মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে সব ওলটপালট হয়ে যায়। বাবা নিজে একজন নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ হয়েও ডেঙ্গুর এই আকস্মিক ছোবল আটকানোর কোনো সুযোগ পাননি।

ঢাকা থেকে যখন এই দুঃসংবাদ এল, জানতে পারলাম তাঁরা আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু। আমার স্ত্রী অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক; বাংলাদেশে তাঁরা একসঙ্গে পড়েছেন, কাজ করেছেন। মেয়েটির বাবা-মা দুজনই চিকিৎসক—বাবা আইসিইউ বিশেষজ্ঞ, মা চক্ষুবিশেষজ্ঞ। সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গা হলো, আমাদের ঘরেও একই বয়সী একটি কন্যাসন্তান আছে।

তাই এই মৃত্যুতে আমরা এতটাই স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলাম যে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার মতো সাহসও পাচ্ছিলাম না। চোখের সামনে কেবল ভেসে উঠছিল এক অসহায় মা–বাবার মুখ, যাঁরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়েও নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারলেন না।

ঠিক এই শোকের মধ্যেই সিডনিতে এল এক আশার খবর। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে জাপানি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাকেদার তৈরি কার্যকর ডেঙ্গু টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga)। চার বছর বা তার বেশি বয়সী যে কেউ পারিবারিক চিকিৎসকের (জিপি) ব্যবস্থাপত্র নিয়ে দুই ডোজে এই টিকা নিতে পারছেন। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ভূখণ্ডে ডেঙ্গুর কোনো স্থানীয় বিস্তার নেই; দেশটির বার্ষিক শনাক্ত হওয়া প্রায় আড়াই হাজার রোগীর প্রায় শতভাগই বিদেশ ভ্রমণ থেকে ফেরা।

তবু নাগরিকদের আগাম সুরক্ষায় অস্ট্রেলিয়া সরকার এই টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে; সামনে লম্বা ছুটিতে দেশে যাওয়ার আগে অনেকেই সন্তানদের এই টিকা দিয়ে নেবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এই খবর অস্ট্রেলিয়ার কাছে ছোট, বাংলাদেশের কাছে বড়

অস্ট্রেলিয়ায় এটি খুব বড় খবর নয়। সরকারি তথ্যে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে দেশটিতে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ২ হাজার ৬৪১ জনের, যার ৯৪ শতাংশের বেশি বিদেশে গিয়ে সংক্রমিত হয়ে ফিরেছিলেন। অর্থাৎ এখানে ডেঙ্গু মূলত ভ্রমণকারীর রোগ। কেউ ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত বা বাংলাদেশ ঘুরে এলেন, সঙ্গে ডেঙ্গুও নিয়ে এলেন। টিকাটি এখানে সরকারি ভর্তুকি তালিকায় নেই, ব্যক্তিগত খরচে কিনতে হয় এবং এর দামও বেশ চড়া।

অথচ যেখানে ডেঙ্গুতে প্রতিদিন মানুষ মরছে, সেখানে এই টিকা নেই। আর যেখানে রোগটির ঝুঁকি নেই বললেই চলে, সেখানে টিকা মজুত আছে। এই বৈপরীত্যই আমাকে লেখাটি লিখতে তাগিদ দিয়েছে।

ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়ে থাকে। এরপরও বছরের পর বছর এই রোগে ভুগতে হচ্ছে ঢাকাবাসীকে

বাংলাদেশের হিসাব

চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। সেপ্টেম্বর মাসেই মারা গেছেন বহু মানুষ, আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে হাজারো। এর পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার গল্প। ৯ বছরের আরফা জন্মের তিন দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছিল, এবার সে বাবাকেও হারাল। রুমাইসার পাঁচ বছর বয়সী ছোট বোন ফারজিন এখনো বুঝতেই পারছে না তার আপু কোথায় হারিয়ে গেল।

কমিটি আছে, কাজ নেই

মশা মারার মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউনিয়ন থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ৪৮ হাজার কমিটি থাকার কথা থাকলেও জাতীয় কমিটি আর সিটি করপোরেশনের গুটিকয়েক ছাড়া বাকিগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়। বহু উপজেলায় বা পৌরসভায় ওয়ার্ড কমিটিই নেই। কাগজে ব্যবস্থা আছে, কিন্তু মাঠে নেই। আর এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের।

টিকা সব সমাধান নয়, তবে বড় এক সুযোগ

আমি বলছি না টিকা এলেই রাতারাতি সব ঠিক হয়ে যাবে। রুমাইসার ক্ষেত্রে টিকা থাকলে কী হতো, তা-ও নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা এবং জেলা পর্যায়ে শিশুদের বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

তবে টিকার বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতাও প্রমাণিত। ২০ হাজারের বেশি শিশু-কিশোরের ওপর করা আন্তর্জাতিক ট্রায়ালে দেখা গেছে, টিকাটি নিশ্চিত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে ৮০ শতাংশের বেশি কার্যকর এবং হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমায় প্রায় ৯৫ শতাংশ। আমাদের হাসপাতাল ও আইসিইউর যে সীমিত সক্ষমতা, তাতে হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমানোটাই এক বিরাট রক্ষাকবচ। কিউডেঙ্গার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—আগে কারও ডেঙ্গু না হয়ে থাকলেও সে নিরাপদে এই টিকা নিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী বলছে

২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দল (SAGE) সুপারিশ করে, ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণ এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের এই টিকা দেওয়া যেতে পারে (তিন মাসের ব্যবধানে দুই ডোজ)। ২০২৪ সালের মে মাসে সংস্থাটি কিউডেঙ্গাকে ‘প্রিকোয়ালিফিকেশন’ বা পূর্বযোগ্যতার স্বীকৃতি দেয়, যার ফলে ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন এটি সংগ্রহ করতে পারে। চল্লিশটির বেশি দেশে এটি ইতিমধ্যে অনুমোদিত।

প্রতিবেশী ভারতও চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের জন্য কিউডেঙ্গার অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্ব এগোলেও বাংলাদেশে কিউডেঙ্গার নিবন্ধন বা নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট বার্তা মেলেনি।

ডেঙ্গু

সরকারের কাছে নাগরিক দাবি

প্রথম আলোর সামাজিক মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় টিকা পাওয়ার খবরের নিচে শত শত মানুষের মন্তব্য দেখলাম। তাঁদের একটাই আকুতি—‘বাংলাদেশে এই টিকা কবে আসবে?’ একজন লিখেছেন, ‘টিকা পেলে তো প্রবাসীরাই পাবেন, দেশের মানুষের কী লাভ?’

এ প্রশ্নটি বুকে বিঁধেছে। আমরা প্রবাসীরা হয়তো বিদেশে বসেই সন্তানদের টিকা দিতে পারব, কিন্তু দেশে থাকা লাখ লাখ সাধারণ শিশুর কী হবে? তাই সরকারের প্রতি কয়েকটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাখছি—

১. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে টিকাটির দ্রুত ও কার্যকর মূল্যায়ন করুক।

২. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে শিশু-কিশোর ও ফ্রন্টলাইনারদের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও পরীক্ষামূলক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হোক।

৩. প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং জাতিসংঘের সহায়তা নিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে সরকারিভাবে টিকা আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হোক।

৪. পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রেখে জনসচেতনতা বাড়ানো হোক।

অবশ্যই মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান বন্ধ করা যাবে না। টিকা আনা এবং মশা মারা—দুটোই চলতে হবে সমান্তরালে।

রুমাইসার বাবা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বাসার পাশেই ময়লার ভাগাড় আর জমে থাকা পানি, যা দেখার কেউ নেই। সিডনির ফার্মেসিতে টিকা সহজলভ্য, অথচ ঢাকার হাসপাতালে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার শয্যা পাওয়া যায় না। এই বৈষম্য আর কত দিন? রুমাইসার জন্মদিনের নতুন জামাটি আলমারিতেই তোলা রইল; আর কোনো অভিভাবককে যেন সন্তানের জামা এভাবে আলমারিতে তুলে রাখতে না হয়, রাষ্ট্রের কাছে আজ এটুকুই দাবি।

  • কাউসার খান প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অস্ট্রেলিয়ার নিবন্ধিত অভিবাসন পরামর্শক