ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যদের একাংশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যদের একাংশ

মতামত

বিএনপি কেন একসঙ্গে তিন ফ্রন্ট খোলার ঝুঁকি নিচ্ছে

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথে যাত্রার একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় এই নির্বাচনে অনেক আসনেই জয়-পরাজয়ে ভূমিকা পালন করেন দলটির প্রথাগত ভোটাররা।

এ বাস্তবতায় নির্বাচনটিকে ‘বামে হেলে পড়ার’ নির্বাচন বলেও চিহ্নিত করা যায়। কেননা, নির্বাচনে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যডানপন্থী বিএনপির সঙ্গে ডানপন্থী জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের। নির্বাচনে কৌশলগতভাবেই নিজস্ব ভোটব্যাংকের সঙ্গে বিএনপি বাম, লিবারেল, সেক্যুলার এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট টানার চেষ্টা করে।

ফলে বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো অর্থনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, আইনের শাসন, সবার সমান নাগরিক অধিকারের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীকেও এবারের নির্বাচনে ইসলামিক দলের ঐতিহ্যবাহী অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে অর্থনৈতিক সংস্কারসহ ‘মূলধারার’ রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার একটি প্রচেষ্টা দেখা গেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসন ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। জামায়াতে ইসলামীও দলটির গোটা ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসন ও ভোট পেয়েছে। জুলাই অধ্যাদেশ, গণভোট ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে কি না—সেই প্রশ্ন ও সংশয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই দেখা গিয়েছিল।

যা-ই হোক, বিরোধী দলের কয়েক দফা ওয়াকআউট ছাড়া সরকারি দল ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে ইতিবাচক একটি সংসদের দেখা মিলল প্রথম অধিবেশনে। তবে ঘটনাবহুল প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার প্রশ্নে বেশ কিছু সংস্কার থমকে গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাসে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। অধ্যাদেশগুলোর ভাগ্যে কী ঘটবে তার জন্য ডেডলাইন ছিল ১০ এপ্রিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন এই অধ্যাদেশগুলো সংসদে তোলা হয়েছিল। সরকারি দল ও বিরোধী দল নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছিল অধ্যাদেশগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে।

১১০টি অধ্যাদেশ হুবহু ও সংশোধিত আকারে গ্রহণ করা হয়েছে। ৭টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে বাতিল করা হয়েছে। আর ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে তোলা না হওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিশেষ কমিটির ১৪ সদস্যের মধ্যে ১১ সদস্য বিএনপির ও তিনজন ছিলেন জামায়াতের। ফলে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারি দলের মতের প্রাধান্য থাকাটা স্বাভাবিক। বিরোধী দলের তিন সদস্য প্রতিবেদনে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন।

যে অধ্যাদেশগুলো হুবহু পাস হয়েছে তার মধ্যে কিছু অধ্যাদেশ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এর মধ্যে একটি জুলাই অভ্যুত্থানের দায়মুক্তি-সংক্রান্ত, অন্যটি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সংক্রান্ত। এ ছাড়া যে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়েছে ও কার্যকারিতা হারিয়েছে তার মধ্যে বিচার বিভাগ, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক, পুলিশ সংস্কারের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার প্রশ্নে অধ্যাদেশ রয়েছে।

এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়ায় ও কার্যকারিতা হারানোয়, বাংলাদেশের পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো যেখানে কোনো একটি দলের স্বৈরতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার সব আয়োজন রয়েছে, সেটা অনেকটাই অটুট থাকল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিচার বিভাগ, গুমসহ বাদ পড়া অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে আবারও বিল আকারে তোলা হবে। তবে মৌলিক সংস্কার প্রশ্নে সরকারি দলের অবস্থান বড় সংশয় ও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক মতামত ও জনমত তৈরিতে প্রভাব রাখেন এমন বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীও সংস্কার নিয়ে বিএনপির অবস্থানকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না। হাসিনার আমলে তাঁরা সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষে জনমত তৈরিতে তাঁদের একটি জোরালো ভূমিকা ছিল। তাঁদের সেই অবস্থান যে পাল্টাতে শুরু করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তার বড় প্রমাণ।

বিরোধী দল সরকারি দলের প্রতি ‘ওয়াদা ভঙ্গের’ অভিযোগ এনেছে এবং সরকারকে ‘পরিণতি’ ভোগের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে সংসদে অধ্যাদেশগুলো পাস-ফেলের ক্ষেত্রে জামায়াত-এনসিপির জোরালো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। বরং সময়মতো বিলের খসড়া না পাওয়া, প্রস্তুতি নিতে না পারার মতো কিছু যুক্তি তারা তুলে ধরেছে।

যা-ই হোক, গুম, দুদক সংস্কারের অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়া, মানবাধিকার পুরোনো আইনে ফিরে আসা, আদালত পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে আসা, পুলিশ কমিশন গঠনের আগেই বিলোপ হওয়ার মূল দায় অবশ্যই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির। এখানে সরকারি দলের কৌশলগত অবস্থান খুব বেশি পরিষ্কার নয়। এর মধ্য দিয়ে বিএনপিকে জনগণের সামনে আরও জোরালোভাবে সংস্কারবিরোধী দল হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পেল। বিরোধী দলকেও আন্দোলনে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হলো।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার পেছনে সরকারের কৌশলগত অবস্থান পরিষ্কার নয়। এর ফলেও একধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হলো। সরকারি দল একই সঙ্গে দুই রাজনৈতিক ফ্রন্টে অস্থিরতা তৈরির ও সামলানোর ঝুঁকি কেন নিচ্ছে, সেটা বোধগম্য নয়। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে সেই রাজনীতিকে শক্তিশালী করা ছাড়া আদৌ যে কোনো লাভ হয় না, আমাদের ইতিহাসে বহু নজির আছে।

যে জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশে দুইবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তারাই এখন সংসদে বড়সড় বিরোধী দল। জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ড, অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচারের সঙ্গে রাজনীতি দিয়েই আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করা প্রয়োজন ছিল। এই মুহূর্তে বিএনপির সেই রাজনৈতিক কৌশলটা কী, সেটা স্পষ্ট নয়।

সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই একটি ভেঙে পড়া অর্থনীতি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোও দলীয়করণের কারণে ভঙ্গুর। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অভাবনীয় এক যুদ্ধ পরিস্থিতির তৈরি করেছে। শুধু জ্বালানি তেল, এলএনজি, এলপিজির দাম বাড়েনি, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এর পাওয়াটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সারসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। রেমিট্যান্সের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়া, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমা, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার মতো শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি।

ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রথম দফা আলোচনায় সমঝোতা হয়নি। যুদ্ধবিরতির সীমা যদি বাড়ে তারপরও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হরমুজ প্রণালির শাসনকাঠামো যেভাবে বদলে গেছে, তার প্রভাব দীর্ঘদিনই থাকবে। এ রকম নাজুক অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন সরকারের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

শুধু রাজনৈতিক এই দুই ফ্রন্টই নয়, সংখ্যায় কম কিন্তু রাজনৈতিক মতামত ও জনমত তৈরিতে প্রভাব রাখেন এমন বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীও সংস্কার নিয়ে বিএনপির অবস্থানকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না। হাসিনার আমলে তাঁরা সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষে জনমত তৈরিতে তাঁদের একটি জোরালো ভূমিকা ছিল। তাঁদের সেই অবস্থান যে পাল্টাতে শুরু করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তার বড় প্রমাণ। ফলে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যেই একসঙ্গে তিনটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট খুলে সেটা কীভাবে সামাল দেবে সেটা মোটেও স্পষ্ট নয়।

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

    মতামত লেখকের নিজস্ব