প্রবৃদ্ধি ঘোষণা করে, ঋণ নিয়ে বা বাজেট করে অর্জন করা যায় না। এটি বিশ্বাসযোগ্যতা, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। সংস্কার ছাড়া প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সেলিম রায়হান
বাংলাদেশ সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে এবং সতর্ক করেছে যে রাজস্ব, ব্যাংকিং ও অন্যান্য কাঠামোগত সংস্কার স্থবির থাকলে মধ্য মেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে।
এই বিশাল পার্থক্যকে পূর্বাভাস-সংক্রান্ত একটি সাধারণ মতবিরোধ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি আরও একটি মৌলিক নীতিগত ধাঁধার জন্ম দেয়: যখন মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকে, বেসরকারি বিনিয়োগ মন্থর থাকে, ব্যাংকগুলো উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করতে অক্ষম থাকে এবং রাষ্ট্রের হাতে আর্থিক সংস্থানের সুযোগ খুব কম থাকে, তখন প্রবৃদ্ধিকে কী চালিত করবে?
পূর্বাভাসই নিয়তি নয়। আইএমএফ হয়তো অতিরিক্ত হতাশাবাদী প্রমাণিত হতে পারে, ঠিক যেমন সরকারি পূর্বাভাসগুলো প্রায়ই অতিরিক্ত আশাবাদী বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবু এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা যায় না। বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যার কারণ হিসেবে তারা ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং মন্থর বেসরকারি বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেছে।
আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ এখন সতর্ক করেছে যে সংস্কারের ধীরগতি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে এবং বাহ্যিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই সার্বভৌম রেটিং আউটলুক ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’-এ সংশোধনের সিদ্ধান্তকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থার মূল্যায়ন হিসেবে নয়; বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গতির প্রতি আস্থা হ্রাসের একটি সংকেত হিসেবে দেখা উচিত।
► বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরগুলোর উন্নয়নে হকারদের অধিকার রক্ষা অপরিহার্য। কারণ, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্থায়ী শহর গড়ে তোলার মূল ভিত্তি। ► ‘অবৈধ’ আসলে হকার নাকি ‘অবৈধ’ আসলে সেই ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে হকারকে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়? আর এই কাজগুলো যারা করে তাদের সামনে আনা হয় না কেন?
প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই মন্থরতা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ধাক্কাগুলোরও আগে থেকে বিদ্যমান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া পরিস্থিতিকে স্পষ্টতই আরও কঠিন করে তুলেছে। এগুলো আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে, ভর্তুকির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
কিন্তু এই ধাক্কাগুলো এমন একটি অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে, যা আগে থেকেই গতি হারাচ্ছিল। সরকারের নিজস্ব বাজেট দলিলেই স্বীকার করা হয়েছে যে প্রবৃদ্ধি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতিটি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে বাহ্যিক সংকটের ফল হিসেবে বিবেচনা করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
মূল্যস্ফীতিই সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবন্ধকতা। এটি প্রকৃত মজুরি কমিয়েছে, পারিবারিক ভোগ ব্যয় দুর্বল করেছে এবং মুদ্রানীতিকে কঠোর রাখতে বাধ্য করেছে। রেটিং সংস্থা ফিচ ধারণা করছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ থাকবে, যা সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যথেষ্ট বেশি। চাহিদা নিয়ন্ত্রণে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে উচ্চ সুদের হার প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু তা কার্যকরী মূলধনের ব্যয়ও বাড়ায় এবং বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে।
বাংলাদেশ এখন এই কঠিন নীতিগত ভারসাম্যের মুখোমুখি। সময়ের আগেই মুদ্রানীতি শিথিল করলে তা মূল্যস্ফীতি এবং টাকার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। খাদ্যবাজার, বিনিময় হারের বিকৃতি, জ্বালানিসংকট এবং আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবের মতো বিষয়গুলো সমাধান না করে অতিরিক্ত কঠোর নীতি গ্রহণ করলে তা মূল্যস্ফীতির মূল কারণগুলোর সমাধান না করেই উৎপাদনকে ব্যাহত করতে পারে।
এই বোঝা সমানভাবে বণ্টিত নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, অথচ নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে নিম্ন প্রবৃদ্ধি বিশেষভাবে ক্ষতিকর; কারণ, এটি ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত করে। যে প্রবৃদ্ধিকৌশল এই বণ্টনগত প্রভাবগুলোকে উপেক্ষা করে, তা হয়তো আকর্ষণীয় সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি সেসব পরিবারের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে না, যাদের জীবনযাত্রার মান অবনতি হয়েছে।
ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আর কোনো নির্বিচার পুনঃ তফসিল সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিয়মকানুন প্রয়োগ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বাধীনতাও থাকতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক ব্যর্থতার ব্যয় শেষ পর্যন্ত করদাতা, আমানতকারী ও দায়িত্বশীল ঋণগ্রহীতাদের ওপর বর্তাবে।
টেকসই পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত সম্ভবত দেশের সবচেয়ে বড় হুমকি। ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে জানুয়ারি ২০২৬-এ বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু আর্থিক খাতের সমস্যার চেয়েও বেশি কিছু নির্দেশ করে। এগুলো সঞ্চয় ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের মধ্যে একটি ত্রুটিপূর্ণ সঞ্চালনব্যবস্থা প্রকাশ করে।
আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা, দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, বারবার ঋণ পুনর্নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতা সেই টাকাকে লাভজনক ব্যবসায় দক্ষতার সঙ্গে প্রবাহিত হতে বাধা দেয়। উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয়বহুল ও দুষ্প্রাপ্য ঋণের সম্মুখীন হয়, অথচ খেলাপি ঋণগ্রহীতারা ক্রমাগত ছাড় পেতে থাকে। এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে না।
সুতরাং ব্যাংকিং সংস্কারকে অবশ্যই দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা বা তাদের নাম পরিবর্তনের বাইরে যেতে হবে। ব্যাংকগুলোর স্বচ্ছ সম্পদ-গুণমান মূল্যায়ন, বিশ্বাসযোগ্য প্রভিশনিং এবং সময়বদ্ধ পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রয়োজন। যেখানে অপরিহার্য, সেখানে মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের শর্তে সরকারি পুনর্মূলধনীকরণ করা উচিত।
ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আর কোনো নির্বিচার পুনঃ তফসিল সুবিধা দেওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিয়মকানুন প্রয়োগ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বাধীনতাও থাকতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক ব্যর্থতার ব্যয় শেষ পর্যন্ত করদাতা, আমানতকারী ও দায়িত্বশীল ঋণগ্রহীতাদের ওপর বর্তাবে।
রাজস্ব-সংকটও সমানভাবে গুরুতর। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে বর্তমান সংকটকালে প্রবেশ করেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তবু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে জিডিপির ১০ ঋণ ২ শতাংশের সমতুল্য রাজস্ব এবং মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের দুর্বল বাস্তবায়ন রেকর্ডের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ মনে করে যে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। এর অনুমেয় ফল হতে পারে ব্যয় সংকোচনের আরেকটি পর্যায়, যেখানে ঘাটতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখার জন্য মূলধনি ব্যয় কমানো হবে। এটি মূল ঘাটতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি অবকাঠামো, মানবসম্পদ গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে দেবে।
রাজস্ব সংস্কার মানে শুধু আনুষ্ঠানিক ব্যবসাগুলোর ওপর আরও বেশি উৎসে কর, উচ্চতর পরোক্ষ কর এবং অতিরিক্ত পরিপালন বোঝা চাপিয়ে দেওয়া নয়। এ পদ্ধতিতে হয়তো দ্রুত কিছু অর্থ সংগ্রহ করা যাবে, কিন্তু এটি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অনানুষ্ঠানিকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
উন্নত তথ্যব্যবস্থা, কম বিবেচনামূলক ছাড়, উন্নত সম্পত্তি ও আয়করব্যবস্থা এবং বড় আকারের কর ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে করভিত্তি প্রসারিত করতে হবে। রাজস্ব প্রশাসনের জন্যও প্রয়োজন পেশাগত স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা এবং উন্নত করদাতা পরিষেবা। প্রশ্নটি শুধু কত রাজস্ব সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা নয়; বরং কার কাছ থেকে, কোন উপকরণের মাধ্যমে এবং উৎপাদন ও সমতার কী মূল্যে তা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বহিস্থ খাত কিছুটা স্বস্তির সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু এটি কোনো টেকসই প্রবৃদ্ধির কৌশল নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়ে ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং তা রিজার্ভ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে সমর্থন করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু রেমিট্যান্সের এই বৃদ্ধি রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশ এখনো পোশাকশিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, অন্যদিকে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের গতি ধীর। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও কম এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি, ব্যয়বহুল পরিবহনব্যবস্থা, শুল্ক বিভাগের বিলম্ব এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হচ্ছে।
নীতিগত পদক্ষেপ একটি বাস্তবসম্মত দুই বছর মেয়াদি পুনরুদ্ধার কর্মসূচির মাধ্যমে শুরু হওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সমাধান, রাজস্ব সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং সামাজিক সুরক্ষাকে একটি একক কৌশলের সংযুক্ত অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সরকারের উচিত পরিমাপযোগ্য ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ করা, দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করা এবং প্রকাশ্যে অগ্রগতির প্রতিবেদন দেওয়া। শুল্ক আধুনিকীকরণ, জাতীয় একক জানালা এবং বাণিজ্য পরিবহনব্যবস্থায় বিদ্যমান সংস্কারগুলো বারবার ঘোষণা না করে বাস্তবায়ন করা উচিত। সরকারি বিনিয়োগ আরও কঠোরভাবে যাচাই করা উচিত, সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক প্রতিদান রয়েছে—এমন প্রকল্পগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় কিন্তু কম উৎপাদনশীল প্রকল্পগুলো স্থগিত করা উচিত।
সংস্কারের ক্রমবিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির মূল্য ও ভর্তুকি সংস্কার প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট সহায়তা ছাড়া আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি দুর্দশা বাড়াতে পারে এবং জনসমর্থন দুর্বল করে দিতে পারে। ব্যাংক বন্ধ বা একীভূতকরণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুগত ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও চাপ প্রয়োগের আগে ধনী ব্যক্তি, সম্পত্তি, কর অব্যাহতি এবং বড় কর ফাঁকিদাতাদের দিয়ে কর সংস্কার শুরু করা উচিত। সামাজিক সুরক্ষাকে খণ্ডিত ভাতা থেকে এমন একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে হবে, যা মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব আর বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম।
তবু পর্যায়ক্রমিক সংস্কার যেন বিলম্বের নাম না হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি সরকারই নীতিগতভাবে সংস্কারের সঙ্গে একমত। প্রতিরোধ শুরু হয় যখন সংস্কার প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা, সুরক্ষিত শিল্প, কর-সুবিধা, অস্বচ্ছ চুক্তি বা রাজনৈতিকভাবে বরাদ্দকৃত সরকারি ব্যয়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সমস্যা কেবল প্রযুক্তিগত নয়। এর মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষমতার বণ্টন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থেকে লাভবান হওয়া গোষ্ঠীগুলোর ওপর শৃঙ্খলা আরোপ করতে রাষ্ট্রের বারবার ব্যর্থতা।
৬ বা ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ফেরা এখনো সম্ভব। বাংলাদেশে এখনো একটি বিশাল কর্মশক্তি, একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা ভিত্তি, একটি প্রতিষ্ঠিত রপ্তানি খাত এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সস্তা শ্রম, সুরক্ষিত অভ্যন্তরীণ বাজার, দুর্বল ব্যাংক, স্বল্প কর এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পুরোনো প্রবৃদ্ধির মডেলটি তার সীমায় পৌঁছে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজন হবে উন্নততর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বৃহত্তর প্রতিযোগিতা, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, মানব মূলধনে বিনিয়োগ এবং এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যা রাজনৈতিক সংযোগের পরিবর্তে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডকে পুরস্কৃত করবে।
প্রশ্নটি এটা নয় যে বাংলাদেশের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করা উচিত কি না; তাকে তা করতেই হবে। আসল প্রশ্ন হলো, সরকার সেই সংস্কারগুলো গ্রহণ করতে প্রস্তুত কি না, যা ছাড়া এই প্রবৃদ্ধি বাজেট বক্তৃতার একটি সংখ্যা হয়েই থেকে যাবে। প্রবৃদ্ধি ঘোষণা করে, ঋণ নিয়ে বা বাজেট করে অর্জন করা যায় না। এটি বিশ্বাসযোগ্যতা, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
● সেলিম রায়হান অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম। ই–মেইল: selim.raihan@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব
[২৪ জুলাই ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকায় এ লেখা ‘সংস্কার ছাড়া কি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]