নদীই শিল্পবর্জ্যের একমাত্র ভাগাড়?

হায় সুতাং, কে তোমাকে বাঁচাবে

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ভারতের ত্রিপুরায় জন্ম নিয়ে তিন-চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে সুতাং। হবিগঞ্জের দেওরগাছ দিয়ে ঢুকে তিন উপজেলা—চুনারুঘাট, সদর আর লাখাইয়ের ভেতর দিয়ে কুশিয়ারায় গিয়ে মিশেছে। বাংলাদেশে নদটির দৈর্ঘ্য ৮২ কিলোমিটার। আবহমানকাল ধরে এই তিন উপজেলার শতাধিক গ্রামের মানুষের জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে এই নদ। সুতাংয়ের মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছেন কত জেলে, পানি দিয়ে চাষাবাদ করেছেন কত চাষি। এ নদের জলে স্নান করে পুণ্য অর্জন করেছে সনাতন ধর্মের মানুষজন।

কিন্তু এসবকেই আজ মনে হয় গল্পগাছা। একদা টলমল করত যার পানি, তাই এখন কুচকুচে কালো, মনে হয় রং মেশানো হয়েছে। মাছ তো দূরের কথা, নদে এখন পোকামাকড়ও পাওয়া যায় কি না, সন্দেহ। পুণ্য অর্জনের লোভেও মানুষ আর এ নদে গোসল করে না। এমনকি পশুও আর এ জলে ধোয়া হয় না। পানির দুর্গন্ধে নদের পাড় দিয়ে পর্যন্ত হাঁটা যায় না। সুতাংয়ের পানি এখন সেচকাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তারপরও অনন্যোপায় হয়ে যাঁরা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদের চর্মরোগসহ নানা ধরনের অসুখ–বিসুখ হচ্ছে। কিন্তু এমন কেন হলো?

এই অবস্থার জন্য দায়ী আসলে নজরদারিহীন অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন। বছর পাঁচ-ছয় আগে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুর এলাকায় নানা ধরনের ১৪-১৫টি শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। শুরু থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান পাশের শৈলজুরা খালে শিল্পবর্জ্য ফেলতে থাকে। তাতেও সুতাংয়ের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। কারণ, খালটির সঙ্গে নদের কোনো সংযোগ তখন ছিল না। সর্বনাশটা করেছে আসলে প্রশাসন। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সুবিধা করে দিতেই মনে হয় তিন-চার বছর আগে খালটিকে আরও দুই কিলোমিটার বাড়িয়ে সুতাং নদে নিয়ে ফেলে জেলা প্রশাসন। তার পর থেকে কলকারখানার বর্জ্য খাল দিয়ে সোজা সুতাংয়ে গিয়ে পড়ছে। নদীকেই যেন শিল্পবর্জ্যের ভাগাড় হিসেবে ধরে নিয়েছে তারা।

আমরা শিল্পায়নের বিরোধী নই। কলকারখানা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু ন্যূনতম কিছু নিয়মনীতি তো অনুসরণ করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কারখানাগুলো যদি ইটিপি ব্যবহার করত, সুতাংয়ের এই দশা আজ হতো না। কিন্তু সেটা করতে গেলে লাভটা একটু কম হবে। আমাদের অধিকাংশ উদ্যোক্তাই কম লাভ করতে রাজি নন। তাঁদের লাগাম টেনে ধরতে পারত প্রশাসন। কিন্তু এখানে তো দেখা যাচ্ছে তারা উল্টো সহায়ক। প্রশাসনের কাজ যেখানে অনিয়ম বন্ধ করা, কেউ দূষণ করলে ঠেকানো, সেখানে ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে দূষণ করতে পারেন, প্রশাসনই যদি তার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়?