সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ডেঙ্গুর প্রকোপ

সংক্রমণ কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত কার্যক্রম

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৩ লাখ ১১ হাজার ১৪, মৃত ব্যক্তির সংখ্যা ১ হাজার ৬১৫। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কেবল হাসপাতালে আসা রোগীদের হিসাব রাখে। কিন্তু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরও যেসব রোগী হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেন, কিংবা চিকিৎসা নেওয়ার আগেই মারা যান, সেই হিসাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হাসপাতালের বাইরে অন্তত চার গুণ রোগী আছেন।

আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যেত প্রধানত বর্ষাকালে। সে সময় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে। বর্ষা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণও আর থাকত না। গত বছর থেকে শীতেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। 

দুঃখের বিষয় হলো, নীতিনির্ধারকেরা গতানুগতিক ধারায় রুটিন কাজে ডেঙ্গু সামাল দিতে চাইছেন। এর ফলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেওয়ার পরও এই রোগের ওপর সরকারের তেমন নজরদারি নেই। নজরদারি ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও সরকার বরাদ্দ দিচ্ছে না। শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে থাকে। কিন্তু এর বাইরেও যে বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁদের তথ্য কোথাও নেই। হাসপাতালের বাইরে থাকা রোগীদেরও শনাক্ত করে রোগের ধরন পরীক্ষা করা জরুরি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ ও মশার গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন। কিন্তু কাজটি ঠিকমতো হয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কাজ নজরদারি করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এর জন্য অর্থ চেয়েও পায়নি। অন্যদিকে সরকার যেহেতু ডেঙ্গুকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করেনি, সেহেতু দাতাদের সহায়তাও পাওয়া যায়নি।

রোগতত্ত্ববিদদের মতে, এডিস মশার ধরন বদলেছে। আগে যে ওষুধে মশা মারা যেত, এখন আর সেটি প্রয়োগ করলে কাজে আসছে না। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, মশা মারার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। সেই দায়িত্ব তারা সঠিকভাবে পালন না করলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব এড়াবে কীভাবে? যে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা করা প্রয়োজন, আমাদের অনেক হাসপাতালে সেই পরিবেশ নেই। আবার অনেক হাসপাতালে পরিবেশ থাকলেও যোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসক নেই।

সেই সঙ্গে আমরা এ কথাও বলব যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বরাবরের মতো মশা মারতে কামান দাগালেও মশা মরছে না। বাতাসে মশার ওষুধ না ছিটিয়ে মশার উৎসস্থল ধ্বংস করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তথা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো নাগরিক সচেতনতার কথা বলে। নাগরিকদের নিশ্চয়ই সচেতন, থাকতে হবে। তবে নাগরিকদের যারা সচেতন করবে, তারা কতটা সচেতন, সেটাও জরুরি প্রশ্ন। সবকিছু মিলিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। 

 স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একে অপরের ওপর দায় চাপালে ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এর জন্য সমন্বিত ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে। ডেঙ্গু রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও দপ্তরের সমন্বয়ে কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।

যে জাতি করোনার মতো মহামারি সফলভাবে সামাল দিতে পারে, সে জাতি কেন ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে পারবে না?