সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

খুচরা বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি

প্রথাগত বাজারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে

বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চালের মূল্যবৃদ্ধি জনসাধারণের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করায় সীমিত ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় বৈপরীত্য হলো, ভোক্তা যেমন বেশি দামে চাল কিনছেন, তেমনি উৎপাদক কৃষকও তাঁর উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অর্থাৎ একই বাজারব্যবস্থায় কৃষক ও ভোক্তা—উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত, অথচ সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে মধ্যবর্তী কোনো অংশ।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে বিক্রি হয় ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা। কিন্তু ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে একই চাল ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে দাম দাঁড়ায় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। অর্থাৎ উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে আসতে চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। শুধু চাল নয়; মসুর ডালের দাম বেড়েছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজের ৮৭ শতাংশ, আলুর ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচের ১১৬ শতাংশ, বেগুনের ৭২ শতাংশ, ডিমের ২৫ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগির ২২ শতাংশ, গরুর মাংসের ১৩ শতাংশ ও মাছের ১০ শতাংশ। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খলে ব্যয়ের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অস্বাভাবিক মুনাফাও যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের কৃষক বরাবরই বাজারের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। ঘাম ঝরানো উৎপাদিত ফসলের মূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা দিন দিন কৃষিবিমুখ হয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে কমছে কৃষিজমিও। এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমাদের কোনো সরকারই উপলব্ধি করতে চায় না। উৎপাদনের সময় কৃষককে আবহাওয়া, রোগবালাই, সারের দাম, শ্রমিকের মজুরি ও ঋণের চাপ সামলাতে হয়; কিন্তু ফসল বাজারে তোলার পর দর নির্ধারণের ক্ষমতা তাঁর হাতে থাকে না। সংরক্ষণব্যবস্থা ও সহজ বিপণন-সুবিধার অভাবে অনেক সময় তাঁকে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। অন্যদিকে একই পণ্য কয়েক ধাপ হাতবদল হওয়ার পর তার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে কৃষকের পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য অন্যরা ভোগ করেন।

সিপিডির সংলাপে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়ের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বে যেখানে লজিস্টিক ব্যয় সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের সমান, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। এ তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দুর্বল সড়কব্যবস্থা, যানজট, পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজের অভাব, অদক্ষ সরবরাহব্যবস্থা ও পরিবহন ব্যয়—সব মিলিয়ে পণ্যের দাম বাড়ে। তবে এটিও সত্য, কেবল লজিস্টিক ব্যয় দিয়ে চালের মতো পণ্যের মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। সরবরাহশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে অস্বচ্ছতা, অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর আধিক্য, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব এবং বিভিন্ন ধরনের হিসাববহির্ভূত ব্যয়ও এর জন্য দায়ী।

মন্ত্রী যে ‘আনঅ্যাকাউন্ট্যান্ট’ বা হিসাববহির্ভূত খরচের কথা বলেছেন, সেটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাজারে এমন নানা ব্যয় রয়েছে, যার কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও অঘোষিত পরিবহন ব্যয়, কোথাও অপ্রয়োজনীয় কমিশন—এসব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভোক্তার ঘাড়েই চাপানো হয়। তাই উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের ব্যয় ও মুনাফা নিরীক্ষার আওতায় আনা জরুরি।

খাদ্যবাজারে স্থিতিশীলতা কেবল উৎপাদন বাড়িয়ে নিশ্চিত করা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাজারব্যবস্থা। এমন একটি মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৃষক তাঁর ন্যায্যমূল্য পাবেন, ভোক্তা সহনীয় দামে খাদ্য কিনতে পারবেন এবং মধ্যবর্তী প্রতিটি স্তরের ব্যয় ও মুনাফা হবে যৌক্তিক ও স্বচ্ছ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের টেকসই পথও সেখানেই নিহিত। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং বাজার সংস্কারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ।