সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

এমপি-পুত্রের দাপট

ফৌজদারি অপরাধে শাস্তি কি মুচলেকা

বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে চাঁদাবাজি, বাড়ি দখল ও মামলা-বাণিজ্য, সরকারদলীয় রাজনৈতিক কার্যালয় দখল, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, বালুবাণিজ্যসহ অসংখ্য অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও একজন ব্যক্তিকে মুচলেকা নিয়ে মুক্তি দেওয়ার ঘটনাটি যারপরনাই উদ্বেগজনক। এর মধ্য দিয়ে জনমনে ও সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে এমন বার্তা যায় যে ক্ষমতার বলয়ে থেকে শত অপরাধ করলেও পার পাওয়া যায়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খাইরুল ইসলাম সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে কার্যত ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। ‘ছায়া এমপি’ হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তি এবং ও নিজ দলের নেতা-কর্মীরা তাঁর দাপটে তটস্থ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই অনুসারী দল তৈরি করে বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকেন খাইরুল ইসলাম। মেঘনা টোল প্লাজার নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এ সময় সাবেক সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যদের বাড়ি ও জমি দখলে নেন তাঁর অনুসারীরা। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাবা আজহারুল ইসলাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন খাইরুল ইসলাম।

স্থানীয় শিল্পমালিকদের ভাষ্যেও এর সত্যতা মিলছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কাঁচপুর থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর এমপি-পুত্রের অনুসারীদের চাঁদাবাজির চাপ বাড়তে থাকে। চাঁদা না দেওয়ায় কোনো কোনো কারখানার পণ্যবাহী ট্রাক আটকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি হামলার ভয় দেখিয়েও চাঁদা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্প এলাকায় জুট ব্যবসা, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহকাজকে কেন্দ্র করে যেসব চক্র গড়ে উঠেছে, তার পৃষ্ঠপোষকতা দেন এমপি-পুত্র, এমন অভিযোগও রয়েছে। মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং নৌযান থেকে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তাতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও শিল্পমালিকেরা আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকারের আমলে এর অবসান হবে। সরকারও ব্যবসা-বিনিয়োগের গতি বাড়াতে আর্থিক প্রণোদনাসহ নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। অথচ দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণহীন একজন এমপি-পুত্রের কারণে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে।

খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সব কটিই গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এমন একজন ব্যক্তিকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর পুলিশ বলছে, কেউ লিখিত অভিযোগ ও মামলা করেনি বলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। এই ভাষ্য কতটা যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য? নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা সরকারি পদে না থেকেও তিনি কীভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা ও উন্নয়ন সমন্বয় সমন্বয় সভায় অংশ নিতে পারেন? এ ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভাষ্যও গ্রহণযোগ্য নয়।

বিগত সরকারের আমলে আমরা দেখেছি অনেক সংসদীয় এলাকায় কীভাবে সংসদ সদস্য, তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও অনুসারী মিলিয়ে একটি ‘এমপিরাজ’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। সরকারকে মনে রাখা প্রয়োজন যে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এ ধরনের গণতন্ত্রবিরোধী প্রবণতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা প্রয়োজন। এমপি-পুত্র খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না।