সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ঢাকার উপকণ্ঠে ময়লার স্তূপ

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চাই স্থায়ী সমাধান

সাভার ও গাজীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা, বিশেষ করে বংশী ও ধলেশ্বরী নদীর পাড় এবং ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশ এখন এক অঘোষিত ময়লার স্তূপে পরিণত হয়েছে। ঢাকার উপকণ্ঠ এবং দেশের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের এই চিত্র কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাই নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা চরম প্রশাসনিক ঔদাসীন্য।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সাভার পৌরসভায় দৈনিক ৩১০ টন এবং গাজীপুরে প্রায় চার হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ফেলার জন্য কোনো পরিকল্পিত ও আধুনিক ‘স্যানিটারি ল্যান্ডফিল’ নেই। ফলে রাতের আঁধারে এবং দিবালোকে নদীর পাড় ও মহাসড়কের পাশে টনকে টন বর্জ্য ফেলে তা বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্যের বিষাক্ত তরল বা ‘লিচেট’ মাটির নিচে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষিজমি ও উদ্ভিদকে স্থায়ীভাবে দূষিত করছে। এর ওপর আবার বর্জ্য পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে সাভারকে দেশের প্রথম ‘অবক্ষয়িত বায়ু অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নেওয়া সরকারি উদ্যোগগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার বর্জ্যের স্তূপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (ওয়েস্ট ইনসিনারেশন পাওয়ার প্ল্যান্ট) পরিকল্পনা পরিবেশ ছাড়পত্রের অভাবে স্থগিত রয়েছে। পরিবেশের সুরক্ষায় যে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজ করার কথা, তাদেরই ছাড়পত্রের জটিলতায় পরিবেশবান্ধব একটি প্রকল্প আটকে থাকা এক চরম বৈপরীত্য। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ বা বাজেটের অজুহাত দিয়ে দায় এড়ানোর চেনা সংস্কৃতি তো রয়েছেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করে মহাসড়কগুলোর উন্নয়ন করা হলেও, এর দুই পাশে ময়লার স্তূপ রেখে জনগণের ঠিক কতটুকু কল্যাণ হচ্ছে—সেই প্রশ্ন তোলা এখন জরুরি।

উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলা এবং তা পোড়ানো কেবল আইন পরিপন্থীই নয়, এটি একধরনের নাগরিক অপরাধ। কেমিক্যালমিশ্রিত এই বর্জ্যের দূষণ স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্যানসার, স্ট্রোক ও ফুসফুসের জটিলতার মতো মারাত্মক রোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা যেখানে বারবার সতর্ক করছেন, সেখানে কর্তৃপক্ষের এই ধীরগতির পরিকল্পনা এবং সাময়িক জোড়াতালির উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমরা মনে করি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই মহাসংকট দূর করতে অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। সাভার ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে দ্রুত সমন্বিত ডাম্পিং স্টেশন ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিসাইকেল) করার প্ল্যন্ট স্থাপনে মনোযোগ দিতে হবে।